পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এমন ইটভাটাও ২০২৯ সাল পর্যন্ত ইট পোড়ানোর জন্য ঢাকা জেলা প্রশাসনের অনুমতি পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নানা কারণে পরিবেশ ছাড়পত্র বাতিল করে দিয়েছে এমন অবৈধ ইটভাটাও তিন বছরের জন্য লাইসেন্স দেওয়ার নজিরও স্থাপন করেছে জেলা প্রশাসন। বাতিল কিংবা হালনাগাদ কোনো তালিকাতেই নাম নেই এমন ইটভাটাও পেয়েছে তিন বছরের জন্য লাইসেন্স। জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদফতর একে অপরকে দোষারোপের মাধ্যমে দায় এড়িয়ে যাওয়ার ফাঁকফোকর গলে অবৈধভাবে ইটভাটা পরিচালনা করছে কতিপয় অসাধু ব্যক্তি।
তথ্যমতে, নিয়মানুযায়ী রাজধানীর অদূরে অবস্থিত ধামরাই উপজেলায় ইটভাটার লাইসেন্স প্রদান করে ঢাকা জেলা প্রশাসন। ইটভাটার লাইসেন্স প্রাপ্তির আবেদনের সাথে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র থাকা প্রত্যেকের জন্য বাধ্যতামূলক। তবে সম্প্রতি ঢাকা জেলা প্রশাসনের দেওয়া ১৪৩টি ইটভাটার লাইসেন্সের মধ্যে অন্তত অর্ধশতাধিক ইটভাটার লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে লাইসেন্স দেওয়ার পূর্বেই। এমনকি আগামী বছরগুলোতে ইট পোড়ানোর জন্য লাইসেন্স এমন কয়েক ডজন ইটভাটাকে দেওয়া হয়েছে, যেগুলোর পরিবেশ ছাড়পত্র ২০২৫ সালে বাতিল হয়ে গেছে। হালনাগাদ পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানকেই ইট পোড়ানোর লাইসেন্স দেওয়ার নিয়ম না থাকলেও ধামরাইয়ে এই ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটেছে। তবে এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরকে দোষারোপ করে দায়মুক্ত হতে চায় ঢাকা জেলা প্রশাসন।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) মো. মাহাবুব উল্লাহ মজুমদার টাইমস টুডেকে বলেন, হালনাগাদ পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া ইটভাটার লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ নেই। পরিবেশ ছাড়পত্রের ভিত্তিতেই জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিন বছরের জন্য ইট পোড়ানোর লাইসেন্স দেওয়া হয়। তাছাড়া গত কয়েকবছর ইটের ভাটার লাইসেন্স প্রদান বন্ধ ছিল, ফলে পূর্বের পরিবেশ ছাড়পত্র দিয়ে কেউ আবেদন করলে তাকেও লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে এবং তা আবেদনের দিন থেকে পরবর্তী তিন বছরের জন্য।
পরিবেশ অধিদফতরের ওপর দায় চাপিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আরও বলেন, হালনাগাদ তালিকা পরিবেশ অধিদফতরের দেওয়ার কথা থাকলেও তারা সেটা দেয়নি। যদি পরিবেশ ছাড়পত্র বাতিল হয়ে যাওয়া কোনো ভাটা লাইসেন্স পেয়ে থাকে তবে সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসনের তালিকা থেকে দেখা গেছে, সম্প্রতি ধামরাই উপজেলার জন্য ১৪৩ ইট ভাটার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। এর সাথে পরিবেশ অধিদফতরের তালিকা মিলিয়ে দেখা গেছে প্রায় দুই ডজন ইটভাটাকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে যেগুলোর পরিবেশ ছাড়পত্র বাতিল করা হয়েছে ২০২৫ সালে। কীভাবে পরিবেশ ছাড়পত্র ছাড়া ২০২৬ সালের জুন মাসে জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে তিন বছরের জন্য ইট পোড়ানোর লাইসেন্স পেল তা নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে জনমনে। একই সাথে এসব ক্ষেত্রে আর্থিক কোনো লেনদেন হয়েছে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন জেগেছে। ফলে, অবৈধ উপায়ে পাওয়া লাইসেন্সধারী ইটভাটাগুলো পরিবেশসম্মত উপায় কতটা প্রতিপালন করবে তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
পরিবেশ অধিদফতরের নথি বলছে, বালিয়া ব্রিকস, এসটিআইএন ব্রিকস, ফারুক ব্রিকস্, মদিনা ব্রিকস এন্ড কোং, মারিয়াম ব্রিকস (এম.বি), ঈগল ব্রিকস, লামিয়া ব্রিকস-৩, পিউর ব্রিকস, কাজী আজিজুল এন্ড ব্রাদার্স ব্রিকস কোং, তুহিন ব্রিকস, আইরিন ব্রিকস, বাংলা ব্রিকস, মার্ক ব্রিকস, মাদারপুর ব্রিকস, সোহাগ ব্রিকস, লায়ন ব্রিকস, শাপলা ব্রিকস, তুহিন সুপার ব্রিকস, মক্কা মদিনা ব্রিকস, মাদারপুর ব্রিকস-১, আশা ব্রিকস ও ধামরাই ব্রিকসের পরিবেশ ছাড়পত্র বাতিল করে দেওয়া হয়েছে ২০২৫সালে। অন্যদিকে, ২০২৬ সালে লাইসেন্স প্রাপ্ত মক্কা ব্রিকস, এমবিএল ব্রিক্স-১ ও জামান জাফনা ব্রিকসের পরিবেশ ছাড়পত্র নামঞ্জুর বা বাতিল করা হয়েছে ২০২৪ সালে। ফলে জেলা প্রশাসন আইনিভাবে অবৈধ ইটভাটাগুলোকে তিন বছরের জন্য ইট পোড়ানোর অনুমোদন দিয়েছে।
পরিবেশ ছাড়পত্রের বাতিল কিংবা হালনাগাদ কোনো তালিকাতেই খুঁজে পাওয়া যায়নি এমন ইটভাটার সংখ্যাও কম নয়। নথি থেকে দেখা যায়, এস এন বি ব্রিকস, এম জে আর ব্রিকস, কাকা ব্রিকস, আব্দুল্লাহ ব্রিকস, আই এন সি ব্রিকস, মেট্রো ব্রিকস, মামুন ব্রিকস, হিরা ব্রিকস, রাহাত ব্রিকস, লুৎফর এন্টারপ্রাইজ ইউনিট-১, কে বি এন্ড কোম্পানী-৩, নাছিমা ব্রিকস, বলাকা ব্রিকস, আল মদিনা ব্রিকস, মোহাম্মদ আলী ব্রিকস, নাম্বার ওয়ান ব্রিকস, এস এ ব্রিকস, রাজ ব্রিকস, মেম্বার ব্রিকস, নাহার ব্রিকস, একতা ব্রিকস (এবিসি), মা ব্রিকস, এফ টু এফ ব্রিকস, পিউর ব্রিকস, ইউএসএ ব্রিকস, আলিফ ব্রিকস, ভাই ভাই ব্রিকস, নুর ব্রিকস ও প্রিয়াংকা ব্রিকসসহ অন্তত দুই ডজন ইটাভাটাকে তিনবছরের জন্য লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে।
ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী লাইসেন্স ব্যতীত ইটভাটা স্থাপন এবং ইট প্রস্তুত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইটভাটা যে জেলায় অবস্থিত সেই জেলার জেলা প্রশাসকের নিকট হইতে লাইসেন্স গ্রহণ ব্যতিরেকে, কোনো ব্যক্তি ইটভাটা স্থাপন ও ইট প্রস্তুত করতে পারবে না। এমনকি পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীন ইস্যুকৃত পরিবেশগত ছাড়পত্র ব্যতীত, কোন ব্যক্তি ইটভাটার জন্য দরখাস্ত দাখিল করতে পারবে না। অন্যদিকে, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ইট ভাটার বর্তমান মেয়াদ পর্যন্ত লাইসেন্স এবং পরিবেশ ছাড়পত্র না থাকলে যেকোনো ইটভাটা সম্পূর্ণ অবৈধ বলে গণ্য হবে।
পরিবেশ অধিদফতরের ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক মো. ফেরদৌস আনোয়ার টাইমস টুডেকে বলেন, আইনে স্পষ্ট উল্লেখ আছে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ব্যতীত কোনো ইটভাটা লাইসেন্স তো পাবেই না, আবেদনই করতে পারবে না। কীভাবে অবৈধ ইটভাটা লাইসেন্স পেয়েছে সেটা জেলাপ্রশাসন বলতে পারবে। আমাদের কাছে জেলা প্রশাসন পরিবেশ ছাড়পত্র আছে এমন ইটভাটার তালিকা চায় তখন আমরা তা সরবরাহ করি।

