...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

উত্তরা পয়ঃশোধনাগার প্রকল্প

ওয়াসার ২ বছরের কাজ ৭ বছরে, গচ্চা ৫০০ কোটি টাকা

নাজমুল হাসান রাজ
প্রকাশ: ৪ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১:৩৩ | আপডেট: ৪ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৪:১৬
Shares
ওয়াসার ২ বছরের কাজ ৭ বছরে, গচ্চা ৫০০ কোটি টাকা

দুই বছরের কাজ সাত বছরেও শেষ হয়নি, অথচ গচ্চা গেছে ৫০০ কোটি টাকা। ঢাকা ওয়াসার উত্তরা পয়ঃশোধনাগার প্রকল্পে দফায় দফায় মেয়াদের সাথে বেড়েছে ব্যয়ও। এখনও জমি অধিগ্রহণ ও সীমানাপ্রাচীরের কাজ অসম্পূর্ণ। এর মধ্যেই কাজ শেষ না করে শতভাগ বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক এই প্রকল্পে অনিয়মের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে টাইমস টুডের অনুসন্ধানে।

ওয়াসার অভ্যন্তরীণ নথিপত্র বলছে, ২০১৯ সালে সরকারি অর্থায়নে ১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকার এই প্রকল্প হাতে নেয় ঢাকা ওয়াসা। চুক্তি অনুযায়ী, কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২১ সালের জুনে। অথচ নানা অজুহাতে দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্পের ব্যয় নেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, মেয়াদ বাড়ানোর সাথে ব্যয়ও বেড়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। এরই মধ্যে সরকার ১ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা ছাড় দিয়েছে, যার পুরোটাই খরচ হিসেবে দেখিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৯৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। তবে ওয়াসার নিজস্ব অডিটের হিসাব অনুযায়ী, বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৮২ দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ, দেখানো অগ্রগতির সাথে বাস্তব অগ্রগতির ব্যবধান ১৪ দশমিক ০৮ শতাংশ পয়েন্ট। এই অংশের কাজ না করেই বিল পরিশোধ দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। টাকার অঙ্কে এর পরিমাণ প্রায় ২৫০ থেকে ২৭০ কোটি টাকা। 

অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রকল্পের ৫৩ একর জমি ঘিরে ২ হাজার ২০০ মিটার দীর্ঘ সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কথা ছিল। শতভাগ কাজ শেষ দেখিয়ে বিল তুলে নেওয়া হলেও সরেজমিনে দেখা যায়, সীমানাপ্রাচীরের অনেক অংশের নির্মাণকাজ এখনও অসমাপ্ত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওয়াসার হিসাব শাখার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা টাইমস টুডেকে বলেন, অনেক সময় ভুয়া বিল পাস করিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা তুলে নেওয়া হয়। কাজ না করেই বিল পরিশোধের বিষয়টি সাধারণ কোনো ভুল নয়। কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে সংঘবদ্ধভাবে লুটপাটের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট। 

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. নুরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট কোনো জবাব দিতে পারেননি। তিনি বলেন, আমি অল্প কিছুদিন আগে প্রকল্পের দায়িত্বে এসেছি। নথির বাইরে আমার কিছু বলার নেই। 

কাজের বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, জমির বিষয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসন ভালো জানে। এরপর ব্যস্ততার কথা বলে তিনি ফোন কেটে দেন।

অন্যদিকে, এত বড় পুকুরচুরির বিষয়ে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের (এলজিআরডি) সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও কোনো সাড়া দেননি।

পিডি নুরুল ইসলাম জমির বিষয়ে যে দাবি করেছেন, তা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন ঢাকা জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার এক কর্মকর্তা। তিনি জানান, অনেক আগেই জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে ওয়াসাকে পুরো জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিজেদের ব্যর্থতা ও দুর্নীতি ঢাকতেই ওয়াসা ভিত্তিহীন অভিযোগ করছে।

এর আগে এই প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা সাবেক এক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার সময়ে জমি নিয়ে কিছুটা জটিলতায় পড়েছিলাম। তখন প্রকল্পের ভেতর দিয়ে একটি রাস্তা চলে যাওয়ায় কাজ এগোতে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। তবে তার সময়ে কোনো আর্থিক দুর্নীতি হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, প্রকল্পটির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অডিট হওয়া প্রয়োজন। কাজ বাকি থাকতেই পুরো টাকা খরচ দেখানো স্পষ্ট জালিয়াতি ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কাজ না করে টাকা তুলে নেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বহিঃপ্রকাশ। এর নেপথ্যে জড়িতদের চিহ্নিত করতে হবে।

এদিকে বছরের পর বছর প্রকল্প ঝুলে থাকায় চরম ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। তুরাগতীরের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, আধুনিক শোধনাগার হলে এলাকার মশার উপদ্রব ও দুর্গন্ধ দূর হবে বলে আশা করেছিলেন তারা। কিন্তু কাজও শেষ হয় না, ভোগান্তিও কমে না। সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাচ্ছেন না তারা।

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তুরাগ নদের দূষণ অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হয়েছিল। পাশাপাশি উত্তরাসহ আশপাশের এলাকার মানুষের দুর্গন্ধ, মশার উপদ্রব ও পানিবাহিত রোগের ভোগান্তি কমার কথা ছিল। এ ছাড়া বর্জ্য থেকে জৈব সার ও গ্যাস উৎপাদনের পরিকল্পনাও ছিল। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ওয়াসার অসাধু চক্র ও ঠিকাদারের দুর্নীতির কারণে এসব প্রত্যাশা মুখ থুবড়ে পড়েছে।