...|...|...

বিশ্ব

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন

ব্রিটিশ মুসলিমদের অগ্রগতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশিরা

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:৩৩
Shares
ব্রিটিশ মুসলিমদের অগ্রগতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশিরা

ছবি: সংগৃহীত

সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ব্রিটিশ মুসলিমরা কতটা ভালোভাবে মূলধারার সাথে মিশে গেছে? এর একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হতে পারে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বসবাসকারী প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি। এই জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশের বেশি মুসলমান।

সম্প্রতি প্রকাশিত দ্য ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ১৯৮৭ সালে তৎকালীন প্রিন্স (বর্তমানে রাজা) চার্লস পূর্ব লন্ডনের স্পিটালফিল্ডস সফর করেন, যেখানে ১৯৪৫ সালের পর থেকে বহু বাংলাদেশি বসতি স্থাপন করেছিলেন। তখনকার পরিস্থিতি দেখে তিনি শিউরে ওঠেন। তিনি বলেছিলেন, তারা এমন সব শর্তে কাজ করছে এবং বসবাস করছে যা ভারতীয় উপমহাদেশের চেয়েও খারাপ। এটি সত্যিই গ্রহণযোগ্য নয়। পরবর্তীতে সরকারি সংস্থা ‘কমিশন ফর রেশিয়াল ইকুয়ালিটি’ উল্লেখ করেছিল যে বাংলাদেশিদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির অবনতি এবং কর্মসংস্থানের হার অত্যন্ত কম ছিল।

১৯৮৫ সালের একটি সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষায় তাদের কৃতিত্ব ছিল সত্যিই অত্যন্ত কম। সে সময় অনেক শিশুই সামান্য শিক্ষা নিয়ে গ্রামীণ বাংলাদেশ থেকে অভিবাসী হিসেবে এসেছিল এবং তারা খুব একটা ইংরেজি জানত না। কিছু শিক্ষকও তাদের কাছ থেকে খুব বেশি কিছু প্রত্যাশা করতেন না। আবার শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীদের হামলার আশঙ্কায় অভিভাবকরা তাদের স্থানীয় স্কুলগুলোতে পাঠাতেন।

বর্তমানেও অনেক বাংলাদেশি দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। আবাসন খরচ বাদ দেওয়ার পর প্রতি দুই জনের মধ্যে একজনের আয় জাতীয়ভাবে সর্বনিম্ন পঞ্চম বা কুইন্টাইলে রয়েছে। একটি মাঝারি আয়ের পরিবারের মোট সম্পদের পরিমাণ ১ লাখ পাউন্ডেরও (১ লাখ ৩৫ হাজার ডলার) কম, যেখানে সব জাতিগত গোষ্ঠীর গড়ের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ পাউন্ড। বাংলাদেশিরা এখনও মূলত পূর্ব লন্ডনেই বেশি কেন্দ্রীভূত। তবে তাদের এই স্থবিরতা কেবলই একটি অবভাস বা বিভ্রম মাত্র।

আজকের দিনে তরুণ প্রজন্মের বাংলাদেশিরা পড়াশোনায় অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করছে। ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকে তারা ১৬ বছর বয়সে অনুষ্ঠিত জিসিএসই পরীক্ষায় শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের সমকক্ষ ফল করা শুরু করে। আর বর্তমানে তারা শ্বেতাঙ্গদের চেয়েও অনেক ভালো করছে। ২০২১ সালে জিসিএসই পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৬৭ শতাংশ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ১৯ বছর বয়সের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে, যেখানে শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ৩৮ শতাংশ। ক্রমবর্ধমান হারে তরুণরা প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হচ্ছে এবং ভালো চাকরি পাওয়ার উপযোগী বিষয়গুলোতে পড়াশোনা করছে। গত এক দশকে প্রকৌশল ও প্রযুক্তিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে এবং চিকিৎসা ও দন্তচিকিৎসায় এই সংখ্যা তিনগুণ হয়েছে।

বাংলাদেশি পরিবারগুলোর অতীতে ও বর্তমানে দরিদ্র থাকার একটি বড় কারণ হলো, অনেক নারী অর্থনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয়। তবে সে চিত্রও বদলে যাচ্ছে। ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া ৬৭ শতাংশ বাংলাদেশি নারী কর্মসংস্থানে যুক্ত রয়েছেন, যা শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশ নারীদের ৭৯ শতাংশের কাছাকাছি। মূলত অভিবাসী নারীদের কারণে সার্বিক বাংলাদেশি নারীর কর্মসংস্থানের হার কিছুটা কমেছে, কারণ ওই বয়সের মাত্র ৩২ শতাংশ অভিবাসী নারী কর্মে নিয়োজিত রয়েছেন।

শিক্ষা ক্ষেত্রে এত চমৎকার নৈপুণ্য প্রদর্শনের পরেও বাংলাদেশিরা যতটা ভালো চাকরি পাওয়ার কথা, সবসময় ততটা হয়তো পান না। তবে যুক্তরাজ্যে জন্ম নেওয়া তরুণরা খুব একটা পিছিয়ে নেই। সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের ১৪ শতাংশ পেশাদার বা ব্যবস্থাপনা পদে চাকরি করছেন, যা শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের হারের প্রায় সমান। ২০১০-১১ সাল থেকে ইংরেজি স্কুলগুলোতে বাংলাদেশি শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় তিনগুণ হয়েছে।

ব্রিটেনের সবচেয়ে গতিশীল শহরটিতে বসবাস করা তাদের জন্য সহায়ক হয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের অভিবাসীরা যুক্তরাজ্যের উত্তর অংশের শিল্পোত্তর শহরগুলোতে বেশি বসবাস করায় শিক্ষায় তারা কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। তবে তারাও শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ছাড়িয়ে গেছে। থিংক ট্যাংক ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল রিসার্চ’-এর আনিসা বাট বলেন যে, শিক্ষিত বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি নারীরা বিয়ের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন, আপনি যত বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন হবেন, আপনার চাহিদা তত বেশি হবে।

যখন কোনো জনগোষ্ঠী হুট করে এসে একসময় অভিবাসন প্রায় বন্ধ করে দেয়, তখন তাদের অগ্রগতি সহজে চোখে পড়ে। সত্তরের দশকে পূর্ব আফ্রিকা থেকে নির্মমভাবে তাড়িয়ে দেওয়া এশীয়রা ব্রিটেনে তাদের অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য যথাযথভাবেই প্রশংসিত। ২০০০-এর দশকে আসা অনেক পূর্ব ইউরোপীয়দেরও প্রশংসা করা উচিত। পোলিশরা সবচেয়ে বড় দল হিসেবে মূলত শ্রমিক শ্রেণির কাজ দিয়ে শুরু করলেও এখন তারা জন্মসূত্রে ব্রিটিশদের চেয়ে সামান্য হলেও বেশি আয় করে।

বাংলাদেশিরা মূলত নতুন আগত এবং দীর্ঘকাল ধরে বসবাসকারীদের একটি মিশ্রণ। তাদের প্রায় অর্ধেকই ব্রিটেনের বাইরে জন্মগ্রহণ করেছেন—যেটি ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের সমগ্র মুসলিম জনসংখ্যার ক্ষেত্রেও সত্য। ঘন ঘন নতুন অভিবাসী আসার কারণে বাংলাদেশিদের এই জনসংখ্যার অর্থনৈতিক ইন্টিগ্রেশন বা সংমিশ্রণটি সহজে ধরা পড়ে না। কিন্তু বাস্তবিক অর্থেই এই পরিবর্তন ঘটছে।