প্রেম কিংবা দাম্পত্য জীবন, সম্পর্ক ভেঙে গেলে বেশি ভেঙে পড়েন নারীরাই, এই ধারণা আমাদের সমাজে বহুদিনের। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। বিচ্ছেদের পর পুরুষেরা প্রায়ই নারীদের চেয়ে বেশি মানসিক ও আবেগগত যন্ত্রণায় ভোগেন, অথচ সেই কষ্টের কথা তারা সবার সামনে বলতে পারেন না, কিংবা চান না।
যুক্তরাজ্যের ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির নেতৃত্বে একদল আন্তর্জাতিক মনোবিজ্ঞানী এই গবেষণা চালান। গবেষণাটি ছাপা হয়েছে জার্নাল অব সোশ্যাল অ্যান্ড পার্সোনাল রিলেশনশিপস-এ, আর এতে ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং পদ্ধতিতে ১ লাখ ৮৪ হাজারের বেশি মানুষের অনলাইন পোস্ট বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পোস্টগুলো একটি বেনামি রেডিট ফোরামের। প্রকল্পের প্রধান গবেষক ডা. রায়ান বয়েড।
গবেষণার মূল প্রশ্নে গবেষকেরা জানতে চেয়েছিলেন, পুরুষেরা কি সত্যিই সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারীদের চেয়ে কম আবেগী? নাকি সমাজের চাপে তারা কেবল অনুভূতি লুকিয়ে রাখেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তারা প্রেম, সম্পর্ক ও বিচ্ছেদ নিয়ে লেখা পোস্টগুলো লিঙ্গভেদে আলাদা করে যাচাই করেন।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, হৃদয় ভাঙার ব্যথা, অনুশোচনা, ব্রেকআপ ও কান্নার মতো শব্দই সবচেয়ে বেশি ঘুরেফিরে এসেছে। গবেষকদের প্রত্যাশার বিপরীতে এসব শব্দ ব্যবহার করেছেন পুরুষেরাই বেশি। তুলনায় নারীরা বিচ্ছেদ নিয়ে কম কথা বলেছেন। এ থেকে গবেষকেরা সিদ্ধান্তে এসেছেন, বিচ্ছেদের যন্ত্রণা পুরুষদের মধ্যে বেশি গভীর।
আরও দেখা গেছে, নিজের ভাঙা সম্পর্কের কথা অনলাইনে জানাতে পুরুষেরা দ্বিধা করেন না। হতাশা কাটিয়ে ওঠার পথ খুঁজতে তারা অন্যের পরামর্শও চান। এ ক্ষেত্রে নারীরা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে। এর কারণ হতে পারে, বেনামি ফোরামে পুরুষেরা সামাজিক লজ্জা বা কটাক্ষের ভয় ছাড়াই মন খুলে কথা বলার সুযোগ পান। ডা. বয়েডের ভাষায়, পুরুষদের সাহায্য চাওয়া বা আবেগ প্রকাশের ওপর থেকে সামাজিক কলঙ্কের বোঝা সরে গেলে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় তারা নারীদের মতোই আন্তরিক।
নারীরা কি তবে কম কষ্ট পান?
তা নয়। হয়তো বিচ্ছেদের পর নারীরা বিষয়টি নিয়ে কম ভাবেন, কিংবা নতুন জীবনে এগিয়ে যেতে ব্যস্ত থাকেন। আবার এমনও হতে পারে, মান-সম্মান হারানোর ভয়ে অনেক নারী নিজের দুঃখ-কষ্ট অনলাইনে প্রকাশ করেন না। তারা আবেগহীন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। গবেষকেরাও বলছেন, এ বিষয়ে আরও গবেষণা দরকার।
কেন নীরবে বেশি পোড়েন পুরুষ?
গবেষক ও সমাজবিজ্ঞানীরা এর পেছনে মূলত তিনটি কারণের কথা বলেন-
প্রথমত, আবেগ প্রকাশের সংকট। ছোটবেলা থেকেই পুরুষেরা দুঃখ ও দুর্বলতা লুকিয়ে রাখতে শেখেন। নারীরা যেখানে বন্ধু বা পরিবারের সঙ্গে কথা বলে মন হালকা করতে পারেন, পুরুষেরা সেখানে প্রায়ই নীরব থাকেন। চেপে রাখা এই আবেগ ধীরে ধীরে মানসিক চাপ বাড়ায়।
দ্বিতীয়ত, সহায়তার বলয় দুর্বল। ব্রেকআপের পর নারীদের পাশে সাধারণত বন্ধু ও পরিবারের একটি শক্ত বলয় থাকে। পুরুষেরা অনেক সময় একা একাই পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। এতে একাকিত্ব ও বিষণ্ণতা গভীর হয়।
এবং তৃতীয়ত, আঘাতের প্রভাব দেরিতে আসে। কোনো কোনো বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নারীরা বিচ্ছেদের সঙ্গে সঙ্গে তীব্র কষ্ট পান, আবার দ্রুত সামলেও ওঠেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে সেই যন্ত্রণা আসে কিছুটা দেরিতে, তবে থাকে দীর্ঘদিন।
গবেষণাটি আমাদের চেনা ধারণাকে নাড়া দিয়ে যায়। কষ্ট সবার বুকেই সমান সত্য, শুধু প্রকাশের ভঙ্গি আলাদা। তাই বিচ্ছেদের পর কেউ চুপ করে থাকলে তাকে নির্লিপ্ত ভাবা ঠিক নয়। হয়তো তিনি নীরবে অনেক কিছু বয়ে বেড়াচ্ছেন। পাশে থাকা, মন খুলে কথা বলার সুযোগ দেওয়া আর সমাজের গড়ে দেওয়া ‘পুরুষ কাঁদে না’ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসাই হতে পারে এই যন্ত্রণা কমানোর প্রথম পদক্ষেপ।


