পাকিস্তানে কারাগারে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই দেশটির প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের আলোচনা নতুন করে সামনে এসেছে। বর্তমান চার প্রদেশকে ভেঙে আরও ছোট প্রদেশ বা প্রশাসনিক ইউনিট তৈরির প্রস্তাব নিয়ে চলছে রাজনৈতিক বিতর্ক।
আলোচনাটি শুধু প্রশাসনিক সংস্কারে সীমাবদ্ধ নেই। পাঞ্জাব ও সিন্ধুর মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশের ক্ষমতার কাঠামো, কেন্দ্র-প্রদেশ সম্পর্ক এবং সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
ইমরানকে ঘিরে উত্তেজনা
কারাগারে থাকা ইমরান খানকে মুক্ত করার দাবিতে তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) কর্মী-সমর্থকদের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে উত্তেজনা বেড়েছে।
ইসলামাবাদমুখী বিক্ষোভ ঠেকাতে পাকিস্তান সরকার রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে বিপুলসংখ্যক কনটেইনার বসিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করার ব্যবস্থা নেয়। ৪ অক্টোবর পিটিআই সমর্থকেরা নতুন করে মিছিল শুরু করেন।
এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেই দেশের প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের বিতর্ক নতুন গতি পেয়েছে।
চার প্রদেশ ভেঙে নতুন ইউনিট?
পাকিস্তানের বর্তমান চার প্রদেশকে আরও ছোট কয়েকটি প্রদেশ বা প্রশাসনিক ইউনিটে ভাগ করার ধারণা নতুন নয়। তবে ২০২৬ সালে সরকারি পর্যায়ের একাধিক বক্তব্যের পর বিষয়টি আবার জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় এসেছে।
জুলাইয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করে নতুন প্রদেশ বা প্রশাসনিক ইউনিট তৈরির পক্ষে মত দেন। পরে পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল ১২ থেকে ১৫টি নতুন প্রশাসনিক ইউনিট তৈরির প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার কথা বলেন।
তবে এখন পর্যন্ত নতুন প্রদেশ তৈরির কোনো চূড়ান্ত মানচিত্র বা অনুমোদিত পরিকল্পনা প্রকাশ হয়নি। বিভিন্ন মহলে পাঞ্জাব, সিন্ধু, খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানকে একাধিক ইউনিটে ভাগ করার নানা প্রস্তাব ঘুরছে।
পাঞ্জাব-সিন্ধুতেই বড় রাজনৈতিক হিসাব
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রভাব পড়তে পারে পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে।
পাকিস্তানের সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ পাঞ্জাব দীর্ঘদিন ধরে শরীফ পরিবারের রাজনৈতিক ঘাঁটি। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ ও পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজ- দুজনই এই পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ নেতা।
অন্যদিকে সিন্ধু দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) শক্তিশালী রাজনৈতিক ভিত্তি। ভুট্টো-জারদারি পরিবারের সঙ্গে দলটির গভীর রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
ফলে প্রদেশের সীমানা বদলানো বা নতুন প্রদেশ তৈরির উদ্যোগ কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এর সঙ্গে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ক্ষমতার সমীকরণও জড়িয়ে আছে।
কেন প্রদেশ ছোট করার কথা উঠছে?
সমর্থকদের যুক্তি, পাকিস্তানের বর্তমান প্রদেশগুলোর আয়তন ও জনসংখ্যা এত বড় যে কার্যকর প্রশাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ছোট প্রশাসনিক ইউনিট তৈরি হলে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি সেবা পৌঁছানো এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
তবে বিরোধীরা বলছেন, নতুন প্রদেশ তৈরি করলেই প্রশাসনিক দুর্বলতা বা দুর্নীতির সমস্যার সমাধান হবে- এমন নিশ্চয়তা নেই।
বরং নতুন প্রদেশ মানে নতুন প্রশাসন, নতুন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অতিরিক্ত ব্যয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরির সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
আসিম মুনিরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
এই বিতর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিক হলো পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ভূমিকা।
ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের নেতৃত্বে দেশটির সামরিক প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আগে থেকেই বিতর্ক রয়েছে। নতুন প্রদেশের আলোচনা সেই বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
তবে প্রকাশ্য সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নতুন প্রদেশ তৈরির আলোচনা মূলত মন্ত্রীদের বক্তব্য ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। এটিকে সরাসরি আসিম মুনিরের অনুমোদিত বা চূড়ান্ত পরিকল্পনা হিসেবে দেখানোর মতো আনুষ্ঠানিক নথি এখনো প্রকাশ্যে নেই।
সিন্ধুর স্পষ্ট আপত্তি
নতুন প্রদেশের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সিন্ধু বিধানসভা ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানিয়েছে।
সেপ্টেম্বরে সিন্ধু বিধানসভা প্রদেশের সীমানা পরিবর্তন বা সিন্ধুকে ভাগ করে নতুন প্রদেশ তৈরির যেকোনো উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করে সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস করে। প্রস্তাবে বলা হয়, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক পরিষদের অনুমতি ছাড়া এমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়।
পিটিআইও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। দলটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গোহর আলী খান বলেছেন, নতুন প্রদেশ গঠনের আগে ব্যাপক রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন।
সংবিধানই বড় বাধা
পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী কোনো প্রদেশের সীমানা পরিবর্তন করতে হলে সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক পরিষদের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। এরপর জাতীয় পরিষদ ও সিনেটেও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
ফলে কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেই একতরফাভাবে প্রদেশ ভেঙে দিতে পারবে না। বিশেষ করে সিন্ধুর মতো প্রদেশে যেখানে ক্ষমতাসীন দল ইতোমধ্যে বিভাজনের বিরোধিতা করেছে, সেখানে প্রস্তাবটি বাস্তবায়ন রাজনৈতিকভাবে কঠিন।
ইমরানই বড় অনিশ্চয়তা
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইমরান খানের জনপ্রিয়তা ও পিটিআইয়ের রাজনৈতিক অবস্থান।
ইমরান কারাগারে থাকলেও তার দল এখনো পাকিস্তানের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। নতুন প্রদেশ তৈরির মতো বড় সাংবিধানিক পরিবর্তন যদি রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া এগোয়, তাহলে তা নতুন করে বিরোধ ও আন্দোলনের জন্ম দিতে পারে।
অন্যদিকে সরকারপক্ষ বলছে, জনসংখ্যা ও প্রশাসনিক চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাষ্ট্রের কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখবাজ শরীফের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রানা সানাউল্লাহও বলেছেন, নতুন প্রদেশের বিষয়টি শেষ পর্যন্ত পার্লামেন্টেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়।
ফলে পাকিস্তানে এখন প্রশ্ন শুধু প্রদেশ ভাঙা হবে কি না- তা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে গেছে কেন্দ্র ও প্রদেশের ক্ষমতার ভারসাম্য, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব এবং সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ।
পরিকল্পনাটি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে চার প্রদেশের কাঠামো বদলের আলোচনা পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন একটি বড় ক্ষমতার সমীকরণ তৈরি করেছে।


