একসময় ক্রিকেটের সূত্রে গড়ে উঠেছিল বন্ধুত্ব। একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন। এমনকি রাজনীতিতে আসার আগেই নওয়াজ শরীফ চেয়েছিলেন ইমরান খান তার দলে যোগ দিন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সম্পর্কই বদলে যায়। পাকিস্তানের রাজনীতিতে ইমরান খান ও নওয়াজ শরীফ হয়ে ওঠেন একে অপরের চরম প্রতিদ্বন্দ্বী।
১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে লাহোর জিমখানা ক্রিকেট ক্লাবেই তাদের পরিচয়। তখন ইমরান খান ছিলেন উদীয়মান ক্রিকেটার, আর নওয়াজ শরীফ রাজনীতিতে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ক্রিকেটের প্রতি দুজনের আগ্রহই তাদের সম্পর্ককে ঘনিষ্ঠ করে।
১৯৮০-এর দশকে দুজনই নিজেদের জায়গায় শীর্ষে উঠতে থাকেন। ইমরান হন পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অধিনায়ক, আর নওয়াজ শরীফ হন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী। ক্রিকেটের সূত্রে তাদের যোগাযোগও তখন অব্যাহত ছিল।
১৯৯২ বিশ্বকাপের সময় তাদের সম্পর্ক ছিল আরও ঘনিষ্ঠ। ইমরান খানের নেতৃত্বে পাকিস্তান বিশ্বকাপ জেতে। একই সময়ে শওকত খানম হাসপাতাল নির্মাণেও নওয়াজ শরীফ সহযোগিতা করেন। হাসপাতালের জন্য জমি পেতে সহায়তার পাশাপাশি তহবিল দেওয়ার ঘোষণাও দেন তিনি।
বিশ্বকাপ জয়ের পর নওয়াজ প্রকাশ করেন, ইমরানকে তিনি আগেই রাজনীতিতে আসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু ইমরান তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরে ১৯৯৬ সালে তেহরিক-ই-ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেই রাজনীতিতে নামেন। তখনও নওয়াজ তাকে নিজের দলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ইমরান সেই প্রস্তাবও ফিরিয়ে দেন।
এরপরও দুজনের রাজনৈতিক পথ কয়েকবার কাছাকাছি এসেছে। ২০০৭ সালে লন্ডনে তারা একসঙ্গে পারভেজ মুশাররফের শাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। কিন্তু সেই ঐক্য বেশিদিন টেকেনি।
২০১১ সালের পর ইমরান খানের রাজনৈতিক উত্থান শুরু হলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলায়। ২০১৩ সালের নির্বাচনের পর নওয়াজ ও ইমরানের রাজনৈতিক সংঘাত আরও তীব্র হয়। ক্ষমতার লড়াই যত বাড়তে থাকে, তাদের ভাষা ও অবস্থানও তত কঠোর হয়।
২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে নওয়াজ শরীফ কারাগারে যান। আর ইমরান খান প্রথমবারের মতো সেই প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে ওঠেন, যেখানে একসময় নওয়াজ তাকে রাজনীতিতে আসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই ইমরান সরকারেরও পতন হয়।
বর্তমানে সেই রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব আরও জটিল। ইমরান খান ২০২৩ সাল থেকে কারাগারে আছেন। ২০২৬ সালের অক্টোবরেও তিনি কারাগারেই রয়েছেন। তার মুক্তির দাবিতে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের হাজারো সমর্থক ইসলামাবাদের দিকে দীর্ঘ পদযাত্রা শুরু করেছে। সরকার ও ইমরানের দলের মধ্যে উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে।
অর্থাৎ, যে সম্পর্কের শুরু হয়েছিল ক্রিকেটের মাঠে, সেটিই সময়ের সঙ্গে রূপ নিয়েছে পাকিস্তানের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে। একসময় ইমরানকে রাজনীতিতে আনতে চাওয়া নওয়াজ আর ইমরান—আজ দুজনই পাকিস্তানের রাজনীতির দুই ভিন্ন মেরুর গুরুত্বপূর্ণ মুখ।
তাদের সম্পর্ক আবার কখনো রাজনৈতিক সমঝোতায় ফিরবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে ইমরান খানের কারাবাস ও তার মুক্তির দাবিকে ঘিরে আন্দোলনই প্রমাণ করছে, নওয়াজ-ইমরানের সেই পুরোনো সম্পর্কের রাজনৈতিক অধ্যায় এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
সূত্র: বিবিসি বাংলা


