...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ৫৬ উপজেলায় দুগ্ধ খাতে নতুন দিগন্ত

আল জুবায়ের বাদশা
প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৫:২৩ | আপডেট: ৬ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৫:২৫
Shares
প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তির ছোঁয়ায় ৫৬ উপজেলায় দুগ্ধ খাতে নতুন দিগন্ত

ছবি: এআই জেনারেটেড

দেশের দুগ্ধ ঘাটতি এলাকাগুলোতে স্বাবলম্বিতা ও পুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০২২ সালের জুলাইতে  শুরু হয়েছিল ‘দুগ্ধ ঘাটতি উপজেলায় দুগ্ধ সমবায়ের কার্যক্রম সম্প্রসারণ’ প্রকল্প। উন্নত গো-পালন, নারী ক্ষমতায়ন এবং দারিদ্র্য বিমোচনে প্রকল্পটি এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করেছে। এতে স্বাবলম্বী হয়েছে হাজার হাজার পরিবার, বদলেছে গ্রামীণ অর্থনীতির চিত্র।

জানা যায়, দেশের ৮টি বিভাগের ৩৭টি জেলার ৫৬টি দুগ্ধ ঘাটতি উপজেলায় সমবায় অধিদপ্তরের অধীনে এই কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। চলতি বছরের এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৭৮ শতাংশ এবং ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক অগ্রগতি পৌছেছে ৭৭.৬৭ শতাংশে। আর প্রকল্পটির (১ম সংশোধিত) মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত।

প্রশিক্ষণ ও গাভী পালন

মাঠপর্যায়ের জরিপে দেখা গেছে, প্রকল্পভুক্ত ৫০টি প্রাথমিক দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির ২ হাজার ৪৫২ জন সদস্যের মধ্যে ২ হাজার ৪৫১ জনকেই আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে গাভী পালনের ওপর নিবিড় প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এই প্রশিক্ষণের সুফল মিলছে হাতেনাতেই। দেখা গেছে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্যদের প্রায় ৯৮ শতাংশ সরাসরি উন্নত জাতের গাভী ক্রয় করে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে খামার পরিচালনায় যুক্ত হয়েছেন।

দুগ্ধ উৎপাদনে নতুন রেকর্ড

প্রকল্পের সঠিক দিকনির্দেশনা ও পরিচর্যার ফলে খামারগুলোতে দুধের উৎপাদন লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি খামারে গড়ে দৈনিক ২০.০৩ লিটার দুধ উৎপাদিত হচ্ছে। খামারিদের এই সাফল্য স্থানীয় বাজারের দুধের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি পুষ্টির চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এদিকে খামারিদের দুধের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে মিল্ক কুলিং ট্যাংক ব্যবহার হচ্ছে। এতে, দুধ ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সংরক্ষণ করলে ২ থেকে ৪ দিন পর্যন্ত ভালো থাকে, যা খামারিদের কম দামে দুধ ছেড়ে দেওয়ার লোকসান থেকে বাঁচাবে। পাশাপাশি দুধ বিক্রি না হলে তা দিয়ে দই, ঘি, মাখন বা মিষ্টির মতো দুগ্ধজাত পণ্য তৈরি করে বাজারে বিক্রি করার জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে।।

প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, প্রান্তিক খামারীদের সহায়তায় ‘টু-কাউ’ মডেল চালু করা হয়েছে, যেখানে দুটি গাভী কেনার জন্য ১ লাখ ৬০ হাজার এবং লালন-পালনে ৪০ হাজারসহ মোট ২ লাখ টাকা ঋণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ২৫টি উপজেলায় ১৫ মাসের গ্রেস পিরিয়ডে দেওয়া এই রিভলভিং লোন পরিশোধের পর তা নতুন খামারীদের মাঝে বণ্টন করে পরিধি আরও বাড়ানো হবে। বর্তমানে প্রকল্পে ৯-১০ হাজার গরু থাকলেও আড়াই বছরে মাত্র ২১টি গরু মারা গেছে যা অত্যন্ত ইতিবাচক সাফল্য। প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়নে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপকের নেতৃত্বে গবেষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নারী ক্ষমতায়ন ও আত্মকর্মসংস্থান

গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে প্রকল্পটি এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, সুবিধাভোগী ২২২০ জন নারী সমবায়ী সদস্যের মধ্যে ১৩৬ জন নারী সরাসরি গো-খামার পরিচালনায় নিজেদের আত্মনিয়োগ করেছেন। নিজেদের উৎপাদিত দুধ বিক্রি করে তারা পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরাতে সক্ষম হয়েছেন।

স্বাস্থ্য সচেতনতা ও আর্থিক শৃঙ্খলা

প্রকল্পভুক্ত খামারিদের মধ্যে গো-সম্পদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ক্রয়কৃত বকনা ও গাভীর ৯২ শতাংশেরই নিয়মিত রোগ প্রতিরোধক প্রতিষেধক টিকা নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি শতভাগ খামারি সদস্যই নিয়মিতভাবে নিজস্ব সঞ্চয় আমানত জমা করছেন যা তাদের মধ্যে একটি স্থায়ী আর্থিক শৃঙ্খলা গড়ে তুলেছে।

প্রকল্প পরিচালক তোফায়েল আহমেদ টাইমস টুডেকে বলেন, প্রকল্পের মূল ডিপিপিতে অপ্রয়োজনীয় সুযোগ বাদ দিয়ে এবং মন্ত্রণালয়ের কমিটির পর্যালোচনার মাধ্যমে বরাদ্দ ১৫৭ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ১৩৩ কোটি টাকায় এনে সরকারের ২৪ কোটি টাকা সাশ্রয় করা হয়েছে।

তিনি বলেন, প্রকৃত খামারীদের সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক যন্ত্রপাতি প্রদান করা হচ্ছে। কাঁচা দুধের স্থায়িত্ব কম হওয়ায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপট থেকে খামারীদের বাঁচাতে ব্র্যাকের ‘আড়ং’ ও ‘মিল্ক ভিটা’র সাথে চুক্তি করা হয়েছে, পাশাপাশি ঘি ও দুগ্ধজাত পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, খামারীদের সমবায় সমিতির মাধ্যমে প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা সঞ্চয় থেকে ইতোমধ্যে সাড়ে ৬ কোটি টাকার নিরাপত্তা ফান্ড গঠিত হয়েছে। এছাড়া দৈনিক ৫০০ টাকা ভাটায় আবাসিক ও অনাবাসিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বায়োগ্যাস প্রকল্পের জৈব সার ও নিমপাতা ব্যবহার করে তৈরি অর্গানিক সূর্যমুখী তেল দুবাইতে রপ্তানি করা সম্ভব হয়েছে এবং অতিরিক্ত ৮টি বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপিত হয়েছে। ১২ সদস্যের সমবায় পরিচালনা কমিটিতে চারজন সরকারি কর্মকর্তা অন্তর্ভুক্ত থাকায় খামারীরা কৃষি, মৎস্য, যুব উন্নয়ন ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের যাবতীয় সেবা এক ছাতার নিচে পাচ্ছেন।