ডায়াবেটিস হলো একটি দীর্ঘমেয়াদি বা দীর্ঘস্থায়ী স্বাস্থ্যসমস্যা, যা মানবদেহে রক্তের শর্করা বা গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। সঠিক সময়ে এর চিকিৎসা বা নিয়ন্ত্রণ না করা হলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনির ক্ষতি, দৃষ্টিশক্তি লোপ এবং স্নায়ুর জটিলতার মতো প্রাণঘাতী সমস্যা দেখা দিতে পারে। সাধারণত ডায়াবেটিস বলতে আমরা ‘টাইপ ১’ ও ‘টাইপ ২’ রূপটিকেই চিনে থাকি। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণায় মস্তিষ্কে ইনসুলিনের কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে আলঝেইমারস (স্মৃতিভ্রংশ) রোগের সম্ভাব্য সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে, যাকে গবেষকরা ‘টাইপ ৩ ডায়াবেটিস’ বলে অভিহিত করছেন। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম সামা টিভির এক স্বাস্থ্য বিষয়ক প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে, আলঝেইমারস রোগের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘টাইপ ৩ ডায়াবেটিস’ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো স্বীকৃত বা ডায়াগনস্টিক ক্যাটাগরি নয়। তবে মস্তিষ্কে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স (ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতা) এবং এর গঠনগত পরিবর্তনের সম্পর্ক নিয়ে বিজ্ঞানীরা নিবিড় গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
‘টাইপ ৩ ডায়াবেটিস’ মূলত কী?
মস্তিষ্কে ইনসুলিনের সিগন্যালিং বা কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়া এবং ইনসুলিন প্রতিরোধ গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে গবেষকদের একটি দল ‘টাইপ ৩ ডায়াবেটিস’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন, যা মূলত আলঝেইমারস রোগের সাথে যুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েক ফরেস্ট ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের জেরোন্টোলজি অ্যান্ড জেরিয়াট্রিক মেডিসিনের অধ্যাপক এবং প্রতিষ্ঠানটির আলঝেইমারস ডিজিজ রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ডা. সুজান ক্রাফট মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতায় ইনসুলিনের ভূমিকা এবং আলঝেইমারসের সাথে এর সংযোগ নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করেছেন।
তিনি জানান, ইনসুলিন কেবল রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে না; মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে এটি নিউরনের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি ও শেখার প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি জড়িত। এই যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে তা আলঝেইমারস রোগ সৃষ্টি বা এর তীব্রতা বাড়ায় কি না, বিজ্ঞানীরা তা খতিয়ে দেখছেন। তবে এই সম্পর্কটি অত্যন্ত জটিল এবং মস্তিষ্কে ইনসুলিনের বাধাগ্রস্ততাকে কোনোভাবেই আলঝেইমারস যে ডায়াবেটিসেরই একটি রূপ—তার সরাসরি প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যাবে না।
টাইপ ১ ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের সাথে এটি কতটা আলাদা?
চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই তিনটি ভিন্ন ধারণাকে নির্দেশ করে:
টাইপ ১ ডায়াবেটিস: এটি একটি অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে শরীরে ইনসুলিন তৈরি একেবারেই বন্ধ হয়ে যায় বা নগণ্য পরিমাণে তৈরি হয়।
টাইপ ২ ডায়াবেটিস: এটি এমন একটি অবস্থা, যেখানে শরীর ইনসুলিনের প্রতি সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে (ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স) এবং একপর্যায়ে অগ্ন্যাশয় রক্তের শর্করা স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না।
‘টাইপ ৩ ডায়াবেটিস’: এটি আলঝেইমারস রোগ নিয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনার সুবিধার জন্য ব্যবহৃত একটি অনানুষ্ঠানিক গবেষণার পরিভাষা, যা মস্তিষ্কে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়াকে বোঝায়। এটি ডায়াবেটিসের কোনো অফিশিয়াল বা নির্ধারিত চিকিৎসা ডায়াগনসিস নয়।
এই অবস্থাগুলোতে ইনসুলিন প্রক্রিয়ার যোগসূত্র থাকলেও এগুলো একটি অন্যটির বিকল্প নয়। অর্থাৎ আলঝেইমারসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তির যে ডায়াবেটিস থাকবেই এমন নয়, আবার টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলেই যে কারও আলঝেইমারস হবে—এমন কথা বলা যাবে না।
আলঝেইমারস ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের সম্পর্ক আলঝেইমারস রোগের ওপর গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ বা সেলগুলো কীভাবে ইনসুলিনে সাড়া দেবে এবং গ্লুকোজ ব্যবহার করবে—তার প্রক্রিয়ায় বেশ কিছু পরিবর্তন আসে।
বিজ্ঞানীরা খতিয়ে দেখছেন, মস্তিষ্কের এই পরিবর্তনগুলো স্মৃতিশক্তি, শেখার ক্ষমতা এবং অন্যান্য বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মূল কারণ কি না। এর পাশাপাশি টাইপ ২ ডায়াবেটিসের কারণে ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি বাড়ে কি না, তা নিয়েও ব্যাপক অনুসন্ধান চলছে। তবে এই দুটি বিষয়ের মধ্যে যোগসূত্র থাকার অর্থ এই নয় যে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স সরাসরি আলঝেইমারস ঘটায়। কারণ আলঝেইমারসের পেছনে একাধিক কারণ যুক্ত থাকে এবং এর প্রকৃত প্রক্রিয়া এখনো চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের গবেষণাধীন।
‘টাইপ ৩’ কি একেবারে নতুন কোনো রোগ?
‘টাইপ ৩ ডায়াবেটিস’ শব্দটি একেবারে নতুন নয়, তবে বিভিন্ন সময়ে এটি ভিন্ন ভিন্ন চিকিৎসা সংক্রান্ত ধারণা ব্যাখ্যায় ব্যবহৃত হয়েছে।
মস্তিষ্কে ইনসুলিন ব্যবহারে বিঘ্ন ঘটার এই অনানুষ্ঠানিক ধারণাকে ‘টাইপ ৩সি ডায়াবেটিস’-এর সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। কারণ ‘টাইপ ৩সি’ ডায়াবেটিস সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বীকৃত একটি শারীরিক অবস্থা, যা মূলত অগ্ন্যাশয় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে দেখা দেয়। অগ্ন্যাশয়ের জটিল কোনো রোগ, বড় ধরনের আঘাত বা অস্ত্রোপচারের পর যখন অঙ্গটি ইনসুলিন তৈরির ক্ষমতা হারায়, তখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘টাইপ ৩সি ডায়াবেটিস’ বলা হয়।
সামা টিভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মস্তিষ্ক ও ইনসুলিনের পারস্পরিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে ‘টাইপ ৩ ডায়াবেটিস’কে কোনো চূড়ান্ত রোগ নির্ণয়ের নাম নয়, বরং বিজ্ঞানীদের একটি তাত্ত্বিক পরিভাষা হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।


