ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্ড বিতরণ ও পণ্য বিক্রির কার্যক্রমে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে সরকার। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) জারি করা এ নির্দেশিকায় উপকারভোগী বাছাই, কার্ড বিতরণ, ডিলারের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি, হিসাব সংরক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ে তদারকির বিষয়ে বিস্তারিত নিয়ম নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, হতদরিদ্র পরিবার, নিম্ন আয়ের মানুষ, ভূমিহীন, কৃষিশ্রমিক, দিনমজুর, চা-শ্রমিক, চাতালশ্রমিক, কারখানার শ্রমিক এবং উপার্জনে অক্ষম ব্যক্তিরা টিসিবির কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচিত হবেন। পাশাপাশি বিধবা, তালাকপ্রাপ্ত, স্বামী পরিত্যক্ত ও অসচ্ছল বয়স্ক নারীপ্রধান পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। যেসব অসচ্ছল পরিবারে শিশু বা প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছেন, তারাও অগ্রাধিকার তালিকায় থাকবেন।
তবে একটি পরিবারের একাধিক সদস্য টিসিবির সুবিধা নিতে পারবেন না। কার্ড পেতে আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র থাকা বাধ্যতামূলক। প্রয়োজন হলে স্বামী বা স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্রও দিতে হবে। একই সঙ্গে উপকারভোগীর জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিজের নামে নিবন্ধিত সচল মোবাইল নম্বর থাকতে হবে।
কার্ডের জন্য নির্বাচিত ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়নের স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। নির্বাচিত পরিবারগুলোর তথ্য টিসিবির সেবা অ্যাপের মাধ্যমে তথ্যভান্ডারে সংরক্ষণ করা হবে। এর ফলে উপকারভোগীদের তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে।
নির্দেশিকায় সিটি করপোরেশন, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে আলাদা তদারক কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। এসব কমিটি উপকারভোগী নির্বাচন, তথ্যভান্ডার তৈরি, কার্ড বিতরণ এবং পণ্য বিক্রির পুরো কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবে।
টিসিবির একজন কার্ডধারী পরিবার দুই লিটার ভোজ্যতেল, দুই কেজি মসুর ডাল এবং এক কেজি চিনি পাবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ থাকলে এর সঙ্গে পাঁচ কেজি চালও দেওয়া হবে। তবে সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী পণ্যের সংখ্যা, পরিমাণ ও মূল্য পরিবর্তন করতে পারবে।
রমজান ও ঈদুল আজহা সামনে রেখে নির্ধারিত বরাদ্দের বাইরেও সাধারণ মানুষের কাছে ভর্তুকি মূল্যে টিসিবির পণ্য বিক্রির সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ ট্রাকসেলের মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করতে পারবে সরকার।
টিসিবির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৭৫ লাখ কার্ডধারী রয়েছেন। সম্প্রতি টিসিবির এক অনুষ্ঠানে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানান, অনিয়মের অভিযোগে এরই মধ্যে ৫৯ লাখ কার্ড বাতিল করা হয়েছে। এসব বাতিল কার্ড ডিজিটাল পদ্ধতিতে রূপান্তর করে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন নির্দেশিকায় উপকারভোগী নির্বাচন থেকে পণ্য বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নজরদারি বাড়ানোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। জেলা পর্যায়ের কমিটির সভাপতি থাকবেন জেলা প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট জেলার সংসদ সদস্যরা থাকবেন উপদেষ্টা হিসেবে।
জেলা কমিটিতে পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, পৌরসভার মেয়র বা প্রশাসক, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, সমাজসেবা কর্মকর্তা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা, মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা এবং টিসিবির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
উপজেলা পর্যায়েও পৃথক তদারক কমিটি থাকবে। সেখানে সংসদ সদস্য, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে রাখা হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ে গঠন করা হবে ‘ট্যাগ টিম’। এসব টিম ডিলারের দোকান ও বিক্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন করবে এবং কার্ডধারীরা নিয়ম অনুযায়ী পণ্য পাচ্ছেন কি না, তা পর্যবেক্ষণ করবে।
ডিলারের দোকানের সামনে পণ্যের ভোক্তা মূল্যতালিকা টানানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পাশাপাশি পণ্য পাওয়ার তারিখ ও সময়, মূল্য এবং বিতরণ করা পণ্যের সংখ্যা ও পরিমাণ সম্পর্কে কার্ডধারীদের জানাতে হবে।
পণ্য বিক্রিতে স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিলারের দোকানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া জনসমক্ষে পণ্য বিক্রির তথ্য টিসিবির সংশ্লিষ্ট কর্মীদেরও জানাতে হবে।
গুদাম ব্যবস্থাপনাতেও নতুন নিয়ম যুক্ত হয়েছে। টিসিবির নিজস্ব বা ভাড়া করা গুদামে পণ্য সংরক্ষণ করতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সরকার এসব গুদাম পরিদর্শন করবে।
টিসিবির উপপরিচালক শাহাদত হোসেন জানিয়েছেন, নতুন নির্দেশিকা কার্যকর হলে সাশ্রয়ী মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী হবে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে টিসিবি সাশ্রয়ী মূল্যে দুই লাখ টন ভোজ্যতেল, দুই লাখ ২০ হাজার টন মসুর ডাল এবং এক লাখ ১০ হাজার টন চিনি বিক্রির পরিকল্পনা করেছে। বর্তমানে প্রতি লিটার ভোজ্যতেল ১০০ টাকা, প্রতি কেজি মসুর ডাল ৬০ টাকা এবং প্রতি কেজি চিনি ৭০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।
টিসিবি জানিয়েছে, সাশ্রয়ী মূল্যে এসব পণ্য বিক্রির কারণে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারকে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ভর্তুকির পরিমাণ কমে ২ হাজার ৪০০ কোটি টাকায় নামতে পারে বলে আশা করছে সংস্থাটি।



