...|...|...

বিশ্ব

টানা ১১ বছর কেমোথেরাপির ধকল, শেষে জানা গেল ক্যানসারই হয়নি

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১০:৩১
Shares
টানা ১১ বছর কেমোথেরাপির ধকল, শেষে জানা গেল ক্যানসারই হয়নি

ছবি: সংগৃহীত

মাত্র ২১ বছর বয়সে বেকি জোন্সকে জানানো হয়েছিল, তাঁর মস্তিষ্কে দুরারোগ্য ক্যানসার হয়েছে। চিকিৎসকদের আশঙ্কা ছিল, তিনি আর মাত্র কয়েক মাস বাঁচবেন। সেই রোগ নির্ণয়ের পর দীর্ঘ ১১ বছর কেমোথেরাপি নিয়েছেন তিনি। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে জানতে পারেন, তাঁর কখনোই মস্তিষ্কে ক্যানসার ছিল না।

বর্তমানে ৩৪ বছর বয়সী দুই সন্তানের মা বেকি তখন পুলিশে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। একই সময়ে তাঁর পরিচয় হয় বর্তমান সঙ্গী পিটের সঙ্গে। কিন্তু ক্যানসারের চিকিৎসা শুরু হওয়ার পর বদলে যায় তাঁর জীবন। নিয়মিত বমি বমি ভাব, পেটে ব্যথা, মুখে ঘা ও চরম ক্লান্তিতে ভুগতেন তিনি। সংক্রমণের আশঙ্কায় এড়িয়ে চলতেন সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানও।

বেকির দাবি, কভেন্ট্রির ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে চিকিৎসার সময় অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ইয়ান ব্রাউন তাঁকে ‘গ্রেড ফোর গ্লিওব্লাস্টোমা’ নামের মস্তিষ্কের ক্যানসার হয়েছে বলে জানান। তাঁকে ‘টেমোজোলোমাইড’ নামের কেমোথেরাপির ওষুধ দীর্ঘদিন, এমনকি সারা জীবন নিতে হবে বলেও জানানো হয়েছিল।

তবে চিকিৎসা নির্দেশিকায় এই ওষুধের ছয়টি চক্র বা সাইকেল, অর্থাৎ প্রায় ছয় মাসের চিকিৎসার সুপারিশ ছিল। একাধিক স্ক্যানে টিউমারের কোনো প্রমাণ না পাওয়ার পরও চিকিৎসা চলতে থাকে। বেকি জানান, বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে তাঁকে বলা হয়েছিল, টিউমারটি হয়তো সাধারণ চোখে দেখা যাচ্ছে না।

দীর্ঘ চিকিৎসার কারণে তাঁর ড্রাইভিং লাইসেন্সে বিধিনিষেধ আসে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনও বাধাগ্রস্ত হয়। সন্তান ধারণ নিয়েও তাঁকে বলা হয়েছিল, তিনি হয়তো আর কখনো মা হতে পারবেন না। অথচ পরবর্তীতে তাঁর দুটি সন্তান হয়।

২০২৪ সালে হঠাৎ তাঁকে জানানো হয়, কেমোথেরাপি বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে অধ্যাপক ব্রাউনের অবসরের কথা জানানো হলেও পরবর্তী চিকিৎসা নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

এরপর ২০২৫ সালের মে মাসে আইনজীবীদের উদ্যোগে নিউরোসার্জন ও রেডিওলজিস্টদের স্বাধীন পর্যালোচনায় বেরিয়ে আসে, বেকির মস্তিষ্কে কখনোই ক্যানসার ছিল না। তাঁর প্রকৃত সমস্যা ছিল ‘টিউমেফ্যাক্টিভ ডিমাইলিনেশন’—এক ধরনের প্রদাহ, যার চিকিৎসা সাধারণত স্টেরয়েডের মাধ্যমে করা হয়।

বেকি বলেন, ‘আমার মস্তিষ্কে কখনোই কোনো টিউমার ছিল না। আমার রোগ ভুলভাবে নির্ণয় করা হয়েছিল এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বড় একটা সময়জুড়ে আমি কোনো কারণ ছাড়াই এই সব চিকিৎসার মধ্য দিয়ে গেছি।’

এ ঘটনায় বেকিসহ ৪০ জনের বেশি রোগী ইউনিভার্সিটি হসপিটালস কভেন্ট্রি অ্যান্ড ওয়ারউইকশায়ার এনএইচএস ট্রাস্টের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, তাদের অনেককেই দীর্ঘ সময় ধরে অপ্রয়োজনীয়ভাবে কেমোথেরাপি দেওয়া হয়েছিল।

রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানসের প্রাথমিক পর্যালোচনায় ২০টি ঘটনা খতিয়ে দেখে ১৫টিকে ‘সামগ্রিকভাবে অসন্তোষজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সম্পর্কে নথিপত্রের ঘাটতি, চিকিৎসাগত অনুসন্ধিৎসার অভাব এবং বিভিন্ন বিভাগের চিকিৎসকদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কথাও উঠে এসেছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রাউনকে ঘিরে চিকিৎসা পাওয়া আরও কয়েকজন রোগীও দীর্ঘদিন টেমোজোলোমাইড ব্যবহারের কারণে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার কথা জানিয়েছেন। একজন রোগী দাবি করেছেন, ওষুধটির কারণে তিনি বন্ধ্যা হয়ে গেছেন। আরেকজন ১০০টি সাইকেল চিকিৎসা নেওয়ার পর লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হন।

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনো নির্দিষ্ট রোগী বা ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য না করে জানিয়েছে, টেমোজোলোমাইডের প্রেসক্রিপশন ও ব্যবহারের ওপর আরও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।