...|...|...

বিশ্ব

ইরান যুদ্ধে কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ!

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ নভেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৩৫
Shares
ইরান যুদ্ধে কারও পৌষ মাস, কারও সর্বনাশ!

ছবি: সংগৃহীত

ইরান যুদ্ধের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও দামে অস্থিরতা তৈরি হলেও বিপুল মুনাফা করছে যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো। গত ছয় মাসে দেশটির ৫১টি বড় জ্বালানি কোম্পানি ১৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মুনাফা করেছে। অন্যদিকে, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামে নাকাল সাধারণ মানুষ। যুদ্ধের কারণে শুধু পেট্রোল ও ডিজেল কিনতেই মার্কিন পরিবারগুলোর অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে গড়ে ১ হাজার ১৫০ ডলারের বেশি।

সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রকাশিত হিসাবের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আল জাজিরা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১টি বড় তেল ও গ্যাস কোম্পানির সম্মিলিত মুনাফা ১৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের মুনাফা ছিল ৪৭ বিলিয়ন ডলারেরও কম।

অন্যদিকে, ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ক্লাইমেট সলিউশনস ল্যাবের বিশ্লেষণ বলছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পেট্রোল ও ডিজেল কিনতে মার্কিন নাগরিকদের অতিরিক্ত ১৫০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে। এতে প্রতিটি পরিবারের ওপর গড়ে ১ হাজার ১৫০ ডলারের বেশি বাড়তি খরচের বোঝা চেপেছে। ফলে যুদ্ধ থেকে কারা লাভবান হচ্ছে আর কারা এর মূল্য দিচ্ছে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে।

জ্বালানি খাতে এই বিপুল মুনাফার পেছনে যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইতালির ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল স্টাডিজের ফেলো নাসের আল-তামিমির মতে, অপরিশোধিত তেলের উচ্চমূল্য থেকে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো লাভবান হচ্ছে। পাশাপাশি ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানির সরবরাহ কমে যাওয়ায় শোধনাগারগুলোও অস্বাভাবিক মুনাফা করছে। মধ্যপ্রাচ্য ও রাশিয়ার শোধনাগারের ক্ষয়ক্ষতি, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞাও এ সংকট বাড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বড় দুই তেল কোম্পানি এক্সনমোবিল ও শেভরনের মুনাফা ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে, শোধনাগার প্রতিষ্ঠান ভালেরো এনার্জির তৃতীয় প্রান্তিকের মুনাফা ছয় গুণের বেশি বেড়ে ৬ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ফিলিপস ৬৬-ও ইতিহাসের সর্বোচ্চ প্রান্তিক মুনাফার কথা জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির নিট আয় আগের বছরের ১৩৩ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক জিওফ্রে মিলারের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাথে ইরানের সংঘাত বিশ্ববাজারে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম বড় জ্বালানি সরবরাহ সংকট তৈরি করেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো বাড়তি মুনাফার সুযোগ পেলেও উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদকরা অবকাঠামোগত ক্ষতি, নিরাপত্তাঝুঁকি ও পরিবহন সংকটে পড়েছেন।

এদিকে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে অধিকাংশ জাহাজের চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে সংকট আরও বেড়েছে। এর জবাবে ইরানের তেল ও গ্যাস পরিবহনে নৌ-অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টাপাল্টি এসব পদক্ষেপে বিশ্ববাজারে জ্বালানি পরিবহনের ঝুঁকি বাড়ছে।

শুধু জ্বালানি নয়, এর প্রভাব পড়ছে খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পণ্যবাজারবিষয়ক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্যের দাম আরও ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। কৃষ্ণসাগর ও হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্য বিঘ্ন এবং প্রতিকূল আবহাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতা না হলে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হতে পারে। লন্ডনের রাবোব্যাংকের জ্যেষ্ঠ জ্বালানি কৌশলবিদ ফ্লোরেন্স শ্মিটের মতে, সরবরাহ সংকটের কারণে আগামী বছরও বিভিন্ন বাজারে পণ্যের দাম চড়া থাকতে পারে। সরকারগুলো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভোক্তাদের মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকবে।

অন্যদিকে, জিওফ্রে মিলার সতর্ক করেছেন, স্বল্প মেয়াদে তেল কোম্পানি ও তাদের শেয়ারহোল্ডাররা লাভবান হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তেলের উচ্চমূল্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এমনকি তৈরি হতে পারে মন্দার ঝুঁকিও। আর নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরু হলে আঞ্চলিক সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীতে জ্বালানি সরবরাহ সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।