যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূলের দিকে এগিয়ে আসছে শক্তিশালী হারিকেন ‘ইসাইয়াস’। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৬৫ কিলোমিটার বেগে বয়ে চলা ঝড়টির আঘাতে উপকূলীয় এলাকায় প্রাণঘাতী জলোচ্ছ্বাস, ভারী বৃষ্টি ও ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জরুরি প্রস্তুতি নিচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকারী দল।
আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, শুক্রবার গভীর রাতে ঝড়টি স্থলভাগে আঘাত হানতে পারে। এতে ফ্লোরিডার প্যানহ্যান্ডল, দক্ষিণ আলাবামা ও দক্ষিণ মিসিসিপিতে বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি রয়েছে। সপ্তাহান্ত পর্যন্ত টেনেসি ও নর্থ ক্যারোলাইনার উত্তরাঞ্চলেও ভারী বৃষ্টি ও বন্যা দেখা দিতে পারে।
আটলান্টিক মৌসুমের প্রথম হারিকেন হিসেবে আবির্ভূত ইসাইয়াস বর্তমানে দ্বিতীয় শ্রেণির ঝড়। হারিকেন কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ঝড়টি ঘণ্টায় প্রায় ২২ কিলোমিটার গতিতে উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। সর্বশেষ অবস্থান ছিল মিসিসিপি নদীর মোহনা থেকে প্রায় ৩৭০ কিলোমিটার দক্ষিণে।
ঝড়টির সম্ভাব্য গতিপথ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে উপকূলীয় শহরগুলোতে। আলাবামা ও ফ্লোরিডার সীমান্তবর্তী এলাকায় আঘাত হানলে পেনসাকোলা উপসাগরে প্রাণঘাতী জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হতে পারে। ঝড় পশ্চিম দিকে সরে গেলে মোবাইল শহর বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর পূর্ব দিকে অগ্রসর হলে ফ্লোরিডার পেনসাকোলা ও ডেস্টিন শহর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
মিসিসিপির ওশান স্প্রিংস থেকে ফ্লোরিডার বে-গালফ কাউন্টি সীমান্ত পর্যন্ত হারিকেন সতর্কতা জারি করা হয়েছে। এ ছাড়া মিসিসিপি নদীর মোহনা থেকে সুয়ানি নদী পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় জলোচ্ছ্বাসের সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
উপকূলে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি
ঝড়ের আশঙ্কায় বৃহস্পতিবার থেকেই উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। আলাবামার গভর্নর কে আইভি গালফ শোরস, অরেঞ্জ বিচ ও ডফিন দ্বীপ থেকে পর্যটক এবং অস্থায়ী বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। গালফ শোরস থেকে বের হওয়ার সড়কে যানজটের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই এলাকার সৈকতে দ্বিগুণ লাল পতাকা উড়িয়ে পানিতে নামা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ফ্লোরিডার অন্তত চারটি স্কুল জেলায় সপ্তাহের শেষভাগের ক্লাস বাতিল করা হয়েছে। কয়েকটি কাউন্টির উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদের বাধ্যতামূলকভাবে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফ্লোরিডা ও আলাবামার গভর্নররা কয়েক ডজন কাউন্টিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।
ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস জানিয়েছেন, শুক্রবারের মধ্যে ন্যাশনাল গার্ডের প্রায় পাঁচ হাজার সদস্যকে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত করা হতে পারে।
আলাবামার উপকূলের কাছে প্রায় ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ডফিন দ্বীপের বাসিন্দাদের স্বেচ্ছায় নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন কর্মকর্তারা। বিশেষ করে দ্বীপটির পশ্চিম অংশে জলোচ্ছ্বাসের ঝুঁকি বেশি।
দ্বীপটির মেয়র জেফ কলিয়ার বলেছেন, বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হবে বলে তিনি মনে করছেন না। তবে ঝড়ের গতিপথ ও শক্তিতে শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন আসতে পারে। সে কারণে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
জলোচ্ছ্বাস ও টর্নেডোর আশঙ্কা
পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আলাবামা ও ফ্লোরিডার কিছু এলাকায় জলোচ্ছ্বাস ও উচ্চ জোয়ারের কারণে পানির উচ্চতা ১ দশমিক ৫ থেকে ২ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। উপকূলীয় অঞ্চলে সর্বোচ্চ ৩৮ সেন্টিমিটার বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।
শুক্রবার রাত থেকে শনিবার পর্যন্ত আলাবামা, ফ্লোরিডার প্যানহ্যান্ডল এবং জর্জিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে টর্নেডোও সৃষ্টি হতে পারে। তবে স্থলভাগে প্রবেশের পর হারিকেনটি দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে পূর্বাভাসে জানানো হয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে জাতীয় আবহাওয়া পরিষেবা।
১২১ বছরের রেকর্ডের কাছাকাছি
আটলান্টিকের হারিকেন মৌসুম শুরু হওয়ার চার মাসেরও বেশি সময় পর তৈরি হয়েছে ইসাইয়াস। মৌসুমের প্রথম হারিকেন হিসেবে এটি ১২১ বছরের পুরোনো একটি রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ১৯০৫ সালের ৮ অক্টোবর ওই অঞ্চলে মৌসুমের প্রথম হারিকেন তৈরি হয়েছিল।
এ বছর আটলান্টিক মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড়ের কার্যক্রম তুলনামূলক কম। শক্তিশালী এল নিনোর কারণে এ অঞ্চলে ঝড় তৈরির অনুকূল পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিপরীতে প্রশান্ত মহাসাগরে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঝড়ের কার্যক্রম দেখা গেছে।
প্রশান্ত মহাসাগরে বুধবার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় হিসেবে তৈরি হওয়া ‘সাইমন’ বৃহস্পতিবার রাতে হারিকেনে পরিণত হয়েছে। এটি চতুর্থ শ্রেণির হারিকেনে রূপ নিতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। এ ছাড়া গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় ‘র্যাচেল’ সপ্তাহান্তে মেক্সিকোর বাজা ক্যালিফোর্নিয়া ও দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় পৌঁছাতে পারে।
ইসাইয়াস এমন একটি অঞ্চলের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে অতীতে ভয়াবহ হারিকেন ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। ১৯৬৯ সালে হারিকেন ক্যামিল মিসিসিপির ওয়েভল্যান্ডের কাছে আঘাত হেনে ২৫০ জনের বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। ২০০৫ সালে হারিকেন ক্যাটরিনা মিসিসিপির বিস্তীর্ণ এলাকা বিধ্বস্ত করে, নিউ অরলিন্সে বন্যা সৃষ্টি করে এবং প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু ঘটায়। ২০১৮ সালে হারিকেন মাইকেল ফ্লোরিডার পানামা সিটির কাছে বহু বাড়িঘর ও ভবন ধ্বংস করে।


