জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের পর প্রায় নয় মাস ডায়ালাইসিস ছাড়াই বেঁচে থাকার নজির গড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ৬৬ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। পরে ওই কিডনি অকার্যকর হয়ে পড়লে তা অপসারণ করে মৃত মানবদাতার একটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে ঘটনাটিকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এবারই প্রথম জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি একজন রোগীকে মানব কিডনি পাওয়ার আগ পর্যন্ত সাময়িকভাবে সুস্থ রাখার ক্ষেত্রে কার্যকর ‘সেতু’ হিসেবে কাজ করেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিম অ্যান্ড্রুজ নামের ওই ব্যক্তি টাইপ-২ ডায়াবেটিসজনিত জটিলতায় গুরুতর কিডনি রোগে আক্রান্ত ছিলেন। চিকিৎসকদের ধারণা ছিল, অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে তার মানব কিডনি পাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ৯ শতাংশ। অন্যদিকে, দীর্ঘ অপেক্ষার সময়ে তালিকা থেকে বাদ পড়া কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকিও ছিল উল্লেখযোগ্য।
শেষ পর্যায়ের কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য কিডনি প্রতিস্থাপন জীবন রক্ষা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের অন্যতম কার্যকর চিকিৎসা। তবে বিশ্বজুড়ে প্রয়োজনের তুলনায় মানবদাতার কিডনির সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় অসংখ্য রোগীকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়।
ম্যাসাচুসেটসের ম্যাস জেনারেল ব্রিগহামের চিকিৎসকরা ইউকাটান মিনিয়েচার জাতের ‘উইলমা’ নামের একটি শূকরের কিডনি অ্যান্ড্রুজের শরীরে প্রতিস্থাপন করেন।
মানবদেহে প্রতিস্থাপনের উপযোগী করতে শূকরের জিনে মোট ৬৯টি পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এসব পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার সাথে অঙ্গটির সামঞ্জস্য বাড়ানো, অঙ্গ প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি কমানো এবং সম্ভাব্য ভাইরাসজনিত ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রতিস্থাপনের পর অ্যান্ড্রুজ মোট ২৭১ দিন শূকরের ওই কিডনি নিয়ে বেঁচে ছিলেন। এ সময় তাকে নিয়মিত ডায়ালাইসিস নিতে হয়নি। জীবিত মানুষের শরীরে শূকরের কিডনি কার্যকর থাকার ক্ষেত্রে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নজির।
তবে প্রায় ছয় মাস পর কিডনিটির রক্তনালিতে ক্ষতির লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। সময়ের সাথে পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে প্রতিস্থাপনের প্রায় নয় মাস পর কিডনিটি অপসারণের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকরা।
নিউ হ্যাম্পশায়ারের বাসিন্দা অ্যান্ড্রুজ তার নতুন জীবনকে অলৌকিক অভিজ্ঞতা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপনের পর তিনি দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজ স্বাভাবিকভাবে করতে পারতেন।
এ সময় তিনি রান্না, ঘর পরিষ্কারসহ বিভিন্ন কাজ করার পাশাপাশি নিজের কুকুর ‘কাপকেক’-কে নিয়ে দীর্ঘ সময় হাঁটাহাঁটিও করতে পারতেন।
শূকরের কিডনি অপসারণের পর কয়েক মাস তাকে আবার ডায়ালাইসিস নিতে হয়। পরে তিনি মৃত একজন মানবদাতার কিডনি পান। চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তী ছয় মাসের পর্যবেক্ষণে নতুন মানব কিডনিটি ভালোভাবে কাজ করছে।
মানবদেহে জিনগতভাবে পরিবর্তিত প্রাণীর অঙ্গ প্রতিস্থাপন বা জেনোট্রান্সপ্লান্টেশনকে দীর্ঘদিন ধরে অঙ্গদানের সংকট মোকাবিলার সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে এ পদ্ধতির নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে।
২০২৪ সালে জীবিত একজন মানুষের শরীরে প্রথম শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়। ওই রোগী ৫২ দিন পর মারা গেলেও তার মৃত্যুর সাথে প্রতিস্থাপিত কিডনির সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। এর আগে জীবিত মানুষের শরীরে শূকরের কিডনি দুই মাসের বেশি কার্যকর থাকার কোনো নথিভুক্ত নজির ছিল না বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
অ্যান্ড্রুজের ঘটনা তাই জেনোট্রান্সপ্লান্টেশনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মানব কিডনির জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি সাময়িক সমাধান হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে রোগীরা মানব কিডনি পাওয়ার অপেক্ষার সময় ডায়ালাইসিস ছাড়াই জীবনযাপন করার সুযোগ পেতে পারেন।
ম্যাস জেনারেল ব্রিগহামের সেন্টার ফর ট্রান্সপ্লান্টেশন সায়েন্সেসের চিকিৎসক লিওনার্দো রিয়েলা বলেন, কিডনির ঘাটতি বর্তমানে প্রতিস্থাপন চিকিৎসার অন্যতম বড় সংকট। তার মতে, প্রাথমিকভাবে শূকরের কিডনিকে মানব কিডনি পাওয়ার আগ পর্যন্ত একটি ‘ব্রিজ’ বা সেতু হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদে এ পদ্ধতির নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে জিনগতভাবে পরিবর্তিত প্রাণীর অঙ্গ স্থায়ী প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রেও ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এটি এখন পর্যন্ত একজন রোগীকে নিয়ে পাওয়া অভিজ্ঞতা। এখানে তুলনা করার মতো কোনো নিয়ন্ত্রণ রোগী ছিল না। রোগী নির্বাচন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং চিকিৎসার অন্যান্য বিষয়ও ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষকদের তথ্যমতে, অ্যান্ড্রুজের শরীরে শূকরের কিডনি থাকার সময় নতুন কোনো ক্ষতিকর মানব-টিস্যুবিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। একই সাথে শূকর থেকে আসতে পারে এমন কোনো ভাইরাস বা অন্য রোগজীবাণুর উপস্থিতিও শনাক্ত হয়নি।
ফলে পরবর্তীতে মানব কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রেও শূকরের কিডনির কারণে অতিরিক্ত কোনো জটিলতা তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘটনাটি আশাব্যঞ্জক হলেও জিনগতভাবে পরিবর্তিত শূকরের কিডনি ব্যাপকভাবে ব্যবহারের আগে আরও বড় পরিসরে গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রয়োজন রয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


