জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাম্প্রতিক অধিবেশনে ইসরায়েল ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে দেখা গেল দুই ভিন্ন ধরনের কূটনৈতিক বার্তা বিনিময়ের নাটকীয় দৃশ্য। একদিকে সরাসরি উস্কানিমূলক পদক্ষেপ, অন্যদিকে নীরব অথচ তীব্র প্রতীকী প্রতিবাদ- উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে ভিন্ন ভিন্ন কৌশলে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে একটি স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট যন্ত্র প্রদর্শন করেন। ইরানে ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এই প্রযুক্তি ইরানি জনগণকে স্বাধীনতা অর্জনে সহায়তা করতে পারে। তিনি আরও বলেন, তিনি যন্ত্রটি জাতিসংঘে রেখে যাবেন, যাতে তা ইরানি প্রতিনিধি দলকে দেওয়া যায়- কারণ তারা যখন অবশেষে দলত্যাগ করবে, তখন তারাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের কথা অবাধে বলতে পারবে।
ভাষণ শেষে জাতিসংঘে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন নিজেই এই যন্ত্রটি হাতে নিয়ে ইরানি প্রতিনিধি দলের কাছে যান। তিনি ইরানি কূটনীতিক নাসের আসাদির কাছে গিয়ে যন্ত্রটি এগিয়ে দেন এবং এটি তেহরানে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানান। এসময় ড্যানন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুনলে বোঝা যাবে, ইরানের প্রতি তাদের যা করা হয়েছে তারপর জনগণকে স্বাধীনতা পেতে সাহায্য করতে এই যন্ত্র কতটা কার্যকর হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ইসরায়েল ইরানি জনগণকে ভালোবাসে এবং সেখানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য প্রার্থনা করে।
তবে এই সরাসরি প্রস্তাবের জবাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি ইরানি প্রতিনিধি। তিনি ড্যাননের সঙ্গে কোনো কথোপকথনে জড়াননি এবং যন্ত্রটি গ্রহণও করেননি। সংক্ষিপ্ত এই মুহূর্তটি ভিডিওতে ধারণ করা হয় এবং পরবর্তীতে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, নেতানিয়াহু যখন মূল ভাষণ শুরু করেন, তখন ইরানি প্রতিনিধি দল হল থেকে ওয়াকআউট করে বেরিয়ে যায়। তাদের প্রস্থানের পর ইরানি প্রতিনিধি দলের ডেস্কে রেখে যাওয়া হয় ২০২০ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত ইরান রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) কুদস ফোর্সের সাবেক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানির একটি ছবি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, শুধু ইরানই নয়- নেতানিয়াহু বক্তব্য শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে আরও বহু দেশের প্রতিনিধিও একযোগে ওয়াকআউট করেন, ফলে হলের অধিকাংশ আসন খালি হয়ে পড়ে।
এই গণ-ওয়াকআউটের প্রতিক্রিয়ায় নেতানিয়াহু কটাক্ষ করে বলেন, ‘শৃঙ্খলা বজায় রাখুন হলে’ বলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি বারবার আহ্বান জানান। নেতানিয়াহু বলেন- আর কোনো কাপুরুষ যদি এখনো হল ছেড়ে না যান, তারা যেন এখনই তা করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই ঘটনা একসঙ্গে বিবেচনা করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ইসরায়েল ও ইরানের ভিন্ন কূটনৈতিক ভাষা- একপক্ষ সরাসরি ও প্রকাশ্য প্ররোচনার পথ বেছে নিয়েছে, অন্যপক্ষ বেছে নিয়েছে নীরবতা ও প্রতীকের মাধ্যমে শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দেওয়ার কৌশল। ইরানের এই পদক্ষেপ দেশটির অভ্যন্তরেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে- কিছু কট্টরপন্থী মহল থেকে ওয়াকআউটে অংশ না নেওয়া প্রতিনিধিদের সমালোচনা করা হলেও, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই অবস্থানের পক্ষ নিয়েছে।
সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল ও সানডে গার্ডিয়ান।


