সকালে অফিসে যাওয়ার তাড়া হোক বা বিকেলে পার্কে বাচ্চাকে নিয়ে হাঁটতে বেরোনো - ক্রকস এখন যেন আমাদের সবার পায়ের নিত্যসঙ্গী। হালকা, রঙিন আর মুহূর্তেই পরে ফেলা যায় বলে এই জুতার কদর বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। শুধু বড়রা নয়, স্কুলগামী শিশু থেকে শুরু করে বাড়ির ছোট্ট সদস্য পর্যন্ত ক্রকসের রংবেরঙের জুতা এখন ঘরে ঘরে দেখা যায়।

কিন্তু এই আরামের আড়ালে যে একটা গোপন বিপদ লুকিয়ে থাকতে পারে, তা কি কখনও ভেবে দেখেছেন?
চিকিৎসকদের একাংশ বলছেন, দিনের পর দিন এই জুতা পরার অভ্যাস আপনার এবং আপনার সন্তানের পায়ের গঠনে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে।

শিকাগোর বিখ্যাত পডিয়াট্রিস্ট ডা. মেগান লিহির মতে, ক্রকস এমন একটি জুতা যা সারাদিন ধরে পরার জন্য মোটেই তৈরি হয়নি। এর মূল সমস্যা লুকিয়ে আছে জুতার গঠনে - গোড়ালির পেছনের অংশে হাড় ও পেশিকে ধরে রাখার মতো কোনও শক্তিশালী সাপোর্ট এতে নেই।
ফলে, হাঁটার সময় শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে আপনার পায়ের আঙুলগুলোকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। এই বাড়তি চাপ প্রথম দিকে টের না পেলেও, সময়ের সাথে সাথে তা জমতে জমতে বড় সমস্যার আকার নেয়।

দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারে কী কী সমস্যা হতে পারে
- টেন্ডোনাইটিস বা পেশির প্রদাহ: পায়ের পেশি ও স্নায়ুর ওপর ক্রমাগত চাপ পড়ার ফলে টেন্ডোনাইটিসের মতো প্রদাহজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
- আঙুল বেঁকে যাওয়া: সঠিক সাপোর্টের অভাবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারে পায়ের আঙুল ধীরে ধীরে বেঁকে যেতে পারে।
- কড়া পড়া: ঘর্ষণ ও চাপের কারণে পায়ে যন্ত্রণাদায়ক কড়া পড়ার সমস্যাও অস্বাভাবিক নয়।
- প্লান্টার ফ্যাসাইটিস বা গোড়ালির ব্যথা: ক্রকসের মাঝের অংশ অত্যন্ত নরম হওয়ায় তা পায়ের আর্চকে ঠিকমতো সাপোর্ট দিতে পারে না। ফলে দীর্ঘক্ষণ পরে থাকলে গোড়ালিতে তীব্র ব্যথা শুরু হতে পারে।
যাদের আগে থেকেই পায়ে ব্যথার সমস্যা আছে, তাদের জন্য এই জুতা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

শিশুদের ক্ষেত্রে বিপদ আরও বেশি
বড়দের চেয়ে শিশুদের জন্য ক্রকসের ঝুঁকি আরও গুরুতর। খেলাধুলা বা দৌড়াদৌড়ির সময় এই জুতা পা থেকে সহজেই খুলে যাওয়ার বা পিছলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে গিয়ে বড়সড় আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, যা একটি সক্রিয় শিশুর জন্য যথেষ্ট উদ্বেগের বিষয়।

এসক্যালেটরে ক্রকস: বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন
শপিং মলে গেলে এসক্যালেটর বা চলন্ত সিঁড়িতে ওঠা প্রায় অনিবার্য। কিন্তু শিশুকে ক্রকস পরিয়ে এসক্যালেটরে তোলা রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ একটি কাজ। জুতার নরম, নমনীয় উপাদান এসক্যালেটরের ধাতব খাঁজে আটকে যাওয়ার ঘটনা বিশ্বজুড়ে একাধিকবার সামনে এসেছে, যেখানে শিশুরা মারাত্মক আহত পর্যন্ত হয়েছে। তাই শপিং মলে বেরোনোর সময় শিশুকে অন্তত সেদিনের জন্য অন্য কোনও নিরাপদ জুতা পরানোই বুদ্ধিমানের কাজ।

তাহলে কি ক্রকস একেবারেই বাদ দিতে হবে
ক্রকস একেবারেই বাদ দিতে হবে, বিষয়টা এমন নয়। চিকিৎসকরা স্পষ্ট করে বলছেন, ক্রকস সম্পূর্ণ বর্জনীয় নয় -বরং এটি একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতির জন্য তৈরি জুতা। যেমন:
- সমুদ্রসৈকতে হাঁটার সময়
- বাগানের কাজ করার সময়
- সুইমিং পুলের আশেপাশে চলাফেরার সময়
এই ধরনের অল্প সময়ের, নির্দিষ্ট কাজের জন্য ক্রকস আরামদায়ক ও উপযোগী। সমস্যাটা তৈরি হয় তখনই, যখন এটিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটাচলা বা সারাদিনের ব্যবহারের জুতা হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।

সুস্থ পায়ের জন্য কী করা উচিত
প্রতিদিনের ব্যবহারের জন্য এমন জুতা বেছে নেওয়া উচিত যাতে -
- পায়ের মাপ অনুযায়ী সঠিক ফিটিং থাকে
- গোড়ালিকে সঠিকভাবে ধরে রাখার মতো মজবুত কাঠামো থাকে
- আর্চ সাপোর্ট পর্যাপ্ত থাকে
এক্ষেত্রে ভালো মানের স্নিকার্স বা স্পোর্টস শু নিয়মিত ব্যবহারের জন্য অনেক বেশি নিরাপদ এবং স্বাস্থ্যসম্মত বিকল্প।

আরাম নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই আরামের মূল্য যদি হয় পায়ের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতা, তাহলে একবার ভেবে দেখার সময় এসেছে। ক্রকস পুরোপুরি বাতিল না করে, ব্যবহারের ধরন ও সময়ে একটু সচেতন হলেই আপনি এবং আপনার সন্তান -দুজনেই থাকবেন সুস্থ ও নিরাপদ।

