...|...|...

লাইফস্টাইল

বজ্রপাতের সময় মোবাইল ব্যবহার কি সত্যিই বিপজ্জনক?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, সকাল ১১:৩৭ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:৫৩
Shares
বজ্রপাতের সময় মোবাইল ব্যবহার কি সত্যিই বিপজ্জনক?

ছবি: এআই জেনারেটেড

বৃষ্টি নামলেই আকাশজুড়ে বিদ্যুৎ চমকানো আর মেঘের গর্জন- এই দৃশ্য আমাদের কাছে খুবই পরিচিত। আর ঠিক তখনই মনে জেগে ওঠে পুরনো এক সতর্কবাণী- ‘বজ্রপাতের সময় মোবাইল ফোন ধরো না, বাজ পড়বে!’

ছোটবেলা থেকে শোনা এই কথাটি কতটা সত্যি, আর কতটা নিছক শোনা কথা- যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস (NWS) ও সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC)- এর তথ্য অনুসারে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।

মোবাইল ফোন কি সত্যিই বজ্রপাত টেনে আনে?

সরাসরি উত্তর হলো- না। এটি একটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা মাত্র। ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের বজ্রপাত নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ জন জেনসেনিয়াস স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ছোট আকারের ইলেকট্রনিক ডিভাইস যেমন মোবাইল ফোন বজ্রপাতকে আকর্ষণ করে না। বজ্রপাত মূলত আকর্ষিত হয় উঁচু বস্তু ও বড় ধাতব কাঠামোর দিকে- যেমন গাছ, টাওয়ার বা খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র লম্বা বস্তু।

তাহলে কেন এই ভুল ধারণাটি এত জনপ্রিয় হয়ে উঠল? এর একটি কারণ হলো- কেউ বজ্রপাতে আক্রান্ত হওয়ার সময় যদি তার হাতে মোবাইল ফোন থাকে, তাহলে সেই ফোনটি প্রচণ্ড তাপে গলে বা পুড়ে যেতে পারে।

এই দৃশ্য দেখেই সাধারণ মানুষ মনে করে বসেন, ফোনটাই বুঝি বজ্রপাত টেনে এনেছিল। কিন্তু বাস্তবে এই দুটি ঘটনার মধ্যে কোনো কার্যকারণ সম্পর্ক নেই- ফোনটি নিছক দুর্ঘটনাক্রমে সেখানে উপস্থিত ছিল বলেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

তাহলে আসল ঝুঁকিটা ঠিক কোথায়

মোবাইল ফোন নিজে থেকে বিপজ্জনক না হলেও, নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ব্যবহারকারী প্রকৃতপক্ষেই ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

১. চার্জে বসিয়ে ব্যবহার করলে

এখানেই লুকিয়ে আছে আসল বিপদ। মোবাইল ফোন যখন দেয়ালের বৈদ্যুতিক সকেটে প্লাগ করে চার্জ দেওয়া অবস্থায় থাকে, তখন সেটি আসলে বাড়ির পুরো বৈদ্যুতিক তারের জালের সাথে সরাসরি সংযুক্ত হয়ে যায়।

CDC-র নির্দেশিকা অনুযায়ী, বজ্রপাত যদি বাড়ি বা এর কাছাকাছি বৈদ্যুতিক লাইনে আঘাত হানে, তাহলে সেই প্রবল বৈদ্যুতিক প্রবাহ (surge) ঘরের ভেতরের তার বেয়ে যেকোনো প্লাগ-ইন করা যন্ত্রের মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

তাই ঝড়ের সময় চার্জে বসানো ফোন হাতে নিয়ে কথা বলা বা ব্যবহার করা, তার-যুক্ত (কর্ডেড) ল্যান্ডলাইন ফোন ব্যবহারের মতোই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিপরীতে, ব্যাটারিচালিত অবস্থায় (চার্জ ছাড়া) কর্ডলেস বা সেলুলার ফোন ব্যবহার করা নিরাপদ বলেই বিবেচিত হয়।

২. খোলা জায়গায় ফোন হাতে নিয়ে থাকা

সমস্যাটা এখানেও ফোনে নয়, বরং খোলা আকাশের নিচে অবস্থানে। বৃহত্তর ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যের নর্থউইক পার্ক হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সাধারণত বজ্রপাতে আক্রান্ত হলে ত্বকের উচ্চ রোধের কারণে বিদ্যুৎ শরীরের বাইরের পৃষ্ঠ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যায়, যাকে বলা হয় ‘ফ্ল্যাশওভার’।

কিন্তু হাতে যদি কোনো ধাতব বস্তু (যেমন মোবাইল ফোন) স্পর্শ করা অবস্থায় থাকে, তাহলে সেটি এই ফ্ল্যাশওভার প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে, ফলে শরীরের ভেতরে আঘাত পাওয়ার এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়।

এই কারণেই অস্ট্রেলিয়ার লাইটনিং প্রোটেকশন স্ট্যান্ডার্ড খোলা জায়গায় ঝড়ের সময় কর্ডলেস বা মোবাইল ফোনসহ যেকোনো ধাতব বস্তু বহন বা ব্যবহার না করার সুপারিশ করে। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়ায় খোলা জায়গায় মোবাইল ফোন ব্যবহারের সময় বজ্রপাতে মৃত্যুর একাধিক ঘটনাও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

৩. তার-যুক্ত ল্যান্ডলাইন ফোন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ

CDC-র নির্দেশিকা অনুযায়ী, কর্ডেড টেলিফোন বজ্রপাতের সময় ব্যবহার করা কখনোই নিরাপদ নয় এবং তা এড়িয়ে চলা উচিত। কারণ এটি সরাসরি বাড়ির বাইরের তারের সাথে যুক্ত থাকে, ফলে লাইনে বজ্রপাত আঘাত হানলে তা সরাসরি ব্যবহারকারীর কানে ও শরীরে পৌঁছাতে পারে।

তবে কর্ডলেস বা মোবাইল ফোন ব্যবহার করা- চার্জে না থাকা অবস্থায় সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে CDC নিশ্চিত করেছে।

ঘরের ভেতরে থাকলেও সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা দরকার- ঘরের চার দেয়ালের ভেতরে থাকা মানেই বজ্রপাত থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকা নয়।

CDC-র তথ্য অনুযায়ী, বজ্রপাতে আহত হওয়ার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঘটনা ঘটে ঘরের ভেতরেই। এর কারণ হলো, বজ্রপাত মূলত তিনটি পথ ধরে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে- পানির পাইপলাইন, বৈদ্যুতিক তার এবং টেলিফোন লাইন। তাই ঝড়ের সময় শুধু মোবাইল ফোন নয়, নিচের বিষয়গুলোও এড়িয়ে চলা জরুরি:

  • পানির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন - গোসল করা, বাসন মাজা বা কল থেকে পানি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন, কারণ ধাতব পাইপ ও পানির মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ সহজেই প্রবাহিত হতে পারে।
  • প্লাগ-ইন করা ইলেকট্রনিক যন্ত্র থেকে দূরে থাকুন - কম্পিউটার, টিভি বা অন্য যেকোনো যন্ত্র যা দেয়ালের সকেটে সংযুক্ত, তা থেকে দূরে থাকুন।
  • জানালা ও দরজা থেকে দূরে থাকুন - ধাতব ফ্রেম বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে, আর কাছাকাছি বজ্রপাত হলে তার শক ওয়েভে কাচ ভেঙে যেতে পারে।
  • কংক্রিটের মেঝেতে শোয়া বা দেয়ালে হেলান দেওয়া থেকে বিরত থাকুন - কংক্রিটের ভেতরের ধাতব রড (রিবার) বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে।

তবে এখানে একটি স্বস্তির তথ্যও আছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক সিস্টেম্যাটিক রিভিউ গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক যুগে ঘরের ভেতরে বজ্রপাতে সরাসরি মৃত্যুর ঘটনা কার্যত বিরল বললেই চলে।

গত এক শতাব্দীতে নগরায়ণ, উন্নত অবকাঠামো এবং সার্জ প্রোটেক্টরের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ঘরের ভেতরকে অনেক বেশি নিরাপদ করে তুলেছে- একশ বছর আগে ঘরের ভেতরে বজ্রপাতে আহত হওয়ার ঝুঁকি ছিল তুলনামূলক অনেক বেশি।

৩০-৩০ নিয়ম- সহজ ও কার্যকর সতর্কতা

বজ্রপাত থেকে নিরাপদ থাকার জন্য আবহাওয়াবিদরা একটি সহজ নিয়মের কথা বলেন, যা ‘৩০-৩০ নিয়ম’ নামে পরিচিত।

  • বিদ্যুৎ চমকানো দেখার পর যদি ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে বজ্রধ্বনি শোনা যায়, তার মানে ঝড়টি বিপজ্জনকভাবে কাছাকাছি (প্রায় ১০ কিলোমিটার বা ৬ মাইলের মধ্যে) - তখনই আশ্রয় নেওয়া উচিত।
  • সর্বশেষ বজ্রধ্বনি শোনার পর অন্তত ৩০ মিনিট অপেক্ষা না করে বাইরে বের হওয়া উচিত নয়, কারণ ঝড়ের প্রান্ত থেকেও বজ্রপাত ঘটতে পারে।

NWS-এর একটি সহজ স্লোগানও প্রচলিত আছে- ‘মেঘের গর্জন শুনলেই, ঘরে ঢুকে পড়ো’। কারণ বজ্রপাত বৃষ্টির এলাকা থেকে ১০ মাইল পর্যন্ত দূরেও আঘাত হানতে পারে, যাকে বলা হয় ‘বোল্ট ফ্রম দ্য ব্লু’- অর্থাৎ, বৃষ্টি না থাকলেও আপনি বজ্রপাতের ঝুঁকির বাইরে নন।

সংক্ষেপে যা মনে রাখবেন

  • মোবাইল ফোন নিজে থেকে বজ্রপাত আকর্ষণ করে না- এটি একটি ভুল ধারণা।
  • ব্যাটারিচালিত অবস্থায় (চার্জ ছাড়া) মোবাইল বা কর্ডলেস ফোন ঘরের ভেতরে ব্যবহার করা নিরাপদ।
  • চার্জে বসানো অবস্থায় ফোন ব্যবহার করা এড়িয়ে চলুন- এটি বাড়ির বৈদ্যুতিক তারের সাথে যুক্ত থাকে।
  • কর্ডেড ল্যান্ডলাইন ফোন বজ্রপাতের সময় কখনোই ব্যবহার করবেন না।
  • খোলা জায়গায় ঝড়ের সময় হাতে ধাতব বস্তু (ফোনসহ) রাখা বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
  • ঘরের ভেতরে থাকলেও পানি, প্লাগ-ইন যন্ত্র, জানালা-দরজা ও কংক্রিটের দেয়াল থেকে দূরে থাকুন।
  • মেঘের গর্জন শুনলেই দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান, আর সর্বশেষ বজ্রধ্বনির অন্তত ৩০ মিনিট পর বাইরে বের হন।

সবমিলিয়ে বলা যায়, মোবাইল ফোন ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিনের সতর্কবাণীটি পুরোপুরি ভিত্তিহীন গুজব নয়, তবে এর পেছনের আসল কারণ ও প্রক্রিয়াটি অনেকেই সঠিকভাবে জানেন না। আসল বিপদ ফোনে নয়- বিপদ লুকিয়ে আছে বৈদ্যুতিক সংযোগ ও খোলা জায়গায় অবস্থানের মধ্যে।

তথ্যসূত্র: U.S. National Weather Service (NWS), Centers for Disease Control and Prevention (CDC), British Medical Journal-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন (নর্থউইক পার্ক হাসপাতাল), AccuWeather, medRxiv-এ প্রকাশিত সিস্টেম্যাটিক রিভিউ (২০২৩)।