লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার ৭০ দিন পেরিয়ে গেলেও রহস্যের পুরোপুরি কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। তবে তদন্তে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্লু পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে হত্যার প্রধান অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারের ব্যক্তিগত জীবন, তার সঙ্গে নিহত পরিবারের পূর্বপরিচয় এবং ঘটনার দিনের ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। পাশাপাশি দেশ কাঁপানো নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে গণমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে কেন আলোচনা নেই— সে বিষয়েও খানিকটা ধারণা পাওয়া গেছে টাইমস টুডের অনুসন্ধানে।
চলতি বছরের ২৫ জুন সকালে রায়পুর পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের গোডাউন রোড এলাকার একটি ভাড়া বাসায় ঘটে মর্মান্তিক এ ঘটনা। নিহতরা হলেন—শাহিনুর বেগম (৩৮), তার বড় মেয়ে সায়মা আক্তার (২০), মেঝো মেয়ে নাফিজা আক্তার ইকরা (১৬) ও ছোট মেয়ে শিফা আক্তার (৯)। ঘটনার সময় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় একমাত্র ছেলে জুনায়েদ।
ঘটনার পর স্থানীয়দের গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হয় হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে পরিচিত অন্তর মজুমদার (৩০)। আহত অবস্থায় তাকে ঢাকায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
তবে অন্তরের মৃত্যুর মধ্য দিয়েই শেষ হয়ে যায়নি তদন্ত। বরং তার অতীত, নিহত পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং ঘটনার দিন কীভাবে হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছিল—এসব বিষয় সামনে রেখে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে পুলিশ।
স্বামী হারানোর পর সন্তানদের নিয়ে রায়পুরে শাহিনুর
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নিহত শাহিনুর বেগমের বাড়ি কুমিল্লা জেলায়। স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে কয়েক বছর ধরে রায়পুরের ওই বাসায় ভাড়া থাকতেন তিনি। ২০১৯ সালে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে শাহিনুরের স্বামীর মৃত্যু হয়। এরপর সন্তানদের নিয়ে একাই সংসার চালিয়ে আসছিলেন তিনি।
শাহিনুরের বড় মেয়ে সায়মা আক্তার ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছিলেন। মেঝো মেয়ে নাফিজা আক্তার ইকরা রায়পুর সরকারি মার্চেন্টস অ্যাকাডেমি থেকে এসএসসি পরীক্ষার ফলপ্রত্যাশী ছিল। ছোট মেয়ে শিফা আক্তার একই প্রতিষ্ঠানের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী ছিল। আর একমাত্র ছেলে জুনায়েদ ইসলাম রায়পুর সরকারি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনার পাশাপাশি একটি দোকানে কাজ করছেন।
স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে শাহিনুরের জীবনযাপন ছিল মূলত স্থানীয় মানুষ ও পরিচিতদের সহযোগিতানির্ভর। আর এই সূত্রেই বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে তার পরিবারের যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। আর সেই যোগাযোগের অংশ হিসেবে স্থানীয় প্রভাবশালী অর্থাৎ রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও অন্যান্য মানুষের যাতায়াত ছিল বাড়িটিতে।
একই ভবনে থাকতেন অন্তর
স্থানীয় বাসিন্দা ও ভবনের ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় এক বছর আগে স্কুলশিক্ষক আমির হোসেনের ওই ভবনের পাঁচতলায় ভাড়া থাকতেন অন্তর মজুমদার। ভ্যানে করে ফল বিক্রি করতেন তিনি। অন্যদিকে নিচতলায় তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে থাকতেন শাহিনুর বেগম। একই ভবনে থাকার সূত্রে শাহিনুরের সঙ্গে অন্তরের পরিচয় হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিবেশী নারী জানান, পরিচয়ের পর বিভিন্ন সময় শাহিনুরকে উত্ত্যক্ত করতেন অন্তর। তাকে নিয়ে অশালীন কথাবার্তাও বলতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে কয়েক মাস আগে দুজনের মধ্যে বাগবিতণ্ডাও হয়। বিষয়টি বাড়ির মালিককে জানানো হলে অন্তরকে বাসা ছেড়ে দেওয়ার কথা বলা হয়। পরে তিনি ওই ভবন ছেড়ে চলে যান।
স্থানীয়দের ধারণা, ওই ঘটনার কারণে অন্তরের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। সেই ক্ষোভ থেকেই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে তিনি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারেন। তবে পূর্ববিরোধই হত্যার চূড়ান্ত কারণ, এমন সিদ্ধান্তে এখনো পৌঁছায়নি পুলিশ।
অন্তরের ‘স্ত্রী’ পরিচয় দেওয়া সেই নারী কে?
তদন্তে নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী।
তিনি বলেন, অন্তর ওই বাসায় থাকার সময় একজন মেয়েকে তার স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, ওই নারী আসলে অন্তরের স্ত্রী নন।
রায়হান কাজেমীর ভাষ্য, ওই নারী একজন মুসলিম। তার ব্যক্তিগত জীবনের বিষয় বিবেচনায় পুলিশ আপাতত তার নাম প্রকাশ করছে না।
পুলিশের এই তথ্য সামনে আসার পর অন্তরের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ওই নারীর সঙ্গে অন্তরের সম্পর্ক কী ছিল, শাহিনুরের পরিবারের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল কি না এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তার কোনো তথ্যগত যোগসূত্র রয়েছে কি না— এসব বিষয় এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে ওই নারী হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কি না— এমন কোনো তথ্য পুলিশ প্রকাশ করেনি।
একসঙ্গে চারজনকে হত্যা করেনি অন্তর
ঘটনার দিনের বর্ণনাতেও নতুন তথ্য দিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রায়হান কাজেমী। তিনি বলেন, অন্তর চারজনকে একসঙ্গে হত্যা করেনি। প্রথমে শাহিনুর বেগম যখন এক জায়গায় বসে ফল কাটছিলেন, তখন তাকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে আহত করা হয়। মায়ের চিৎকার শুনে একে একে মেয়েরা সেখানে ছুটে আসে। তখন তাদেরও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়।
পুলিশের এই বক্তব্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, ঘটনাটি কয়েক ধাপে সংঘটিত হয়েছিল। অর্থাৎ প্রথমে মাকে আক্রমণের পর তার চিৎকার শুনে মেয়েরা ঘটনাস্থলে আসায় একে একে তারাও হামলার শিকার হন। ঘটনার এই ধারাবাহিকতা হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য ও অন্তরের মানসিক অবস্থার বিষয়ে তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যাতায়াত ছিল প্রভাবশালী ব্যক্তিদের
শাহিনুর বেগমের বাসায় বিভিন্ন ব্যক্তির যাতায়াতের বিষয়টিও স্থানীয়দের কাছ থেকে উঠে এসেছিল। প্রতিবেশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শাহিনুরের স্বামী মারা যাওয়ার পর রায়পুর বাজারের ব্যবসায়ী, সমাজকর্মী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ওই বাসায় যাতায়াত ছিল। এবার পুলিশও বিষয়টি সত্য বলে জানিয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী বলেন, শাহিনুরের বাসায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যাতায়াত ছিল— এটি সত্য। তবে এর পেছনের কারণও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন। তার স্বামী মারা যাওয়ার পর ওই ব্যক্তিরাই পরিবারটিকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করতেন।
অর্থাৎ বাসায় বিভিন্ন মানুষের যাতায়াতকে সরাসরি সন্দেহের বিষয় হিসেবে দেখছে না পুলিশ। বরং স্বামী হারানোর পর পরিবারটির পাশে দাঁড়ানো ব্যক্তিদেরই অনেকে সেখানে যাতায়াত করতেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
তাহলে হত্যার কারণ কী?
সবকিছু ছাপিয়ে এখনো সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— কেন শাহিনুর বেগম ও তার তিন মেয়েকে হত্যা করা হলো?
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে অন্তরের সঙ্গে শাহিনুরের পূর্ববিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে। বাসা ছাড়ার ঘটনাও ঘটেছিল তাদের বিরোধের পর। ফলে স্থানীয়দের একাংশ মনে করছেন, প্রতিশোধ থেকেই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে। কিন্তু পুলিশের হাতে থাকা তদন্তের তথ্য এখনো হত্যার কারণকে এককভাবে ওই বিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি।
অন্তরের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য
তার ‘স্ত্রী’ হিসেবে পরিচয় দেওয়া নারী আসলে তার স্ত্রী নন—এ তথ্যও সামনে এসেছে। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে ওই নারীর বিষয়ে এখনো কিছু বলা হয়নি। বরং পুলিশের পক্ষ থেকে জানা চেষ্টা করা হচ্ছে— মুসলিম ওই নারীর সাথে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তর মজুমদারের কীসের সম্পর্ক? অন্তর বেঁচে না থাকলেও ওই নারীই দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করা এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ।
তদন্ত চলছে, মিলেছে একাধিক ক্লু
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী বলেন, এ ঘটনায় এখনো তদন্ত চলমান। বেশ কিছু ক্লু আমরা পেয়েছি।
তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট, ৭০ দিন পরও তদন্ত শেষ হয়নি। তবে তদন্তকারীদের হাতে এমন কিছু তথ্য এসেছে, যেগুলো ধরে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার পুরো চিত্র বের করার চেষ্টা চলছে।
চাঞ্চল্যকর ঘটনা হলেও আলোচনায় নেই কেন?
হিন্দু সম্প্রদায়ের একজন ব্যক্তি একটি মুসলিম পরিবারের চারজনকে একসঙ্গে নৃশংসভাবে খুনের ঘটনা সেসময় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই আলোচনা ছিল মাত্র দুই-একদিন। তারপর একে একে ৭০ দিন চলে গেল, অথচ বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে তেমন আলোচনাই নেই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেহেতু স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালীদের একটি বড় অংশের যাতায়াত ছিল শাহিনুরের বাড়িতে; সে কারণে বিষয়টি নিয়ে যেন সেভাবে আলোচনা না হয় সে ব্যাপারে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে। কারণ এখানে অনেকেই হয়তো সত্যিকার অর্থেই পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছেন, আবার কারও কারও অসৎ উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। আর তাই ‘কেঁচো খুড়তে গিয়ে যেন সাপ বেরিয়ে না আসে’— সেটাকে থামানোর প্রচেষ্টা থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

