...|...|...

সারাদেশ

আজমুল হত্যা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানাল আসামি আসিফ

মেহেদী হাসান, খুলনা
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১০:১২
Shares
আজমুল হত্যা নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানাল আসামি আসিফ

খুলনায় শিক্ষার্থী আয়মান মো. আজমুল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেফতার শেখ আসিফ হোসেন। ছবি: টাইমস টুডে

খুলনার নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আয়মান মো. আজমুল হোসেনের মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। গ্রেফতার শেখ আসিফ হোসেনের জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করা হয়েছে, মৃত্যুর আগে চুরির অভিযোগে আজমুলকে মারধর করা হয়, জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয় এবং সেই বক্তব্য ভিডিও ধারণ করা হয়।

এসআরবি-৬ এর জিজ্ঞাসাবাদে আসিফ দাবি করেছেন, আজমুলকে প্রথমে ভাত চুরি করে খাওয়া, মোবাইল ফোন ও টাকা চুরির অভিযোগ স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়। একপর্যায়ে তাকে চারতলার ছাদে নিয়ে মারধর করা হয়। পরে কয়েকজন তার কাছ থেকে জোর করে আদায় করা বক্তব্যের ভিডিও ধারণ করেন বলেও দাবি করেছেন আসিফ।

আসিফের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর আজমুলকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ভয় দেখানো হলে তিনি আতঙ্কে চারতলার ছাদ থেকে পাশের তৃতীয় তলায় লাফ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সেখানে পা পিছলে নিচে পড়ে তার মৃত্যু হয়।

তবে গ্রেফতার আসামি শেখ আসিফ হোসেনের এসব বক্তব্যের সত্যতা এখনো তদন্তাধীন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ভোররাতে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী থানার ভাটিয়াপাড়া গোলচত্বর এলাকা থেকে শেখ আসিফ হোসেনকে গ্রেফতার করে এসআরবি-৬-এর স্পেশাল কোম্পানি ও ভাটিয়াপাড়া ক্যাম্পের যৌথ দল। তিনি খুলনার পাইকগাছা উপজেলার সনাতনকাটি গ্রামের শেখ মিরাজের ছেলে এবং খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। গ্রেফতারের পর তাকে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের হরিণটানা থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।

এসআরবি-৬-এর তথ্য অনুযায়ী, আসিফের একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি হয়েছিল এবং ২০ সেপ্টেম্বর তার কাজে যোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ১৮ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে আজমুলের মৃত্যুর ঘটনার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন।

আসিফের দাবি, ঘটনার রাতে তিনি তার ব্যাচের সহপাঠীদের সাথে দেখা করতে ওই ভবনে গিয়েছিলেন। সেখানে আজমুলকে মারধরের সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে আজমুলকে চারতলার ছাদে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে মারধর করে চুরি করে ভাত খাওয়া, মোবাইল ফোন ও টাকা চুরির অভিযোগ স্বীকার করানোর চেষ্টা করা হয়। এরপর কয়েকজন তার বক্তব্য ভিডিও করেন।

পরে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ভয় দেখানো হলে আজমুল ছাদ থেকে পালানোর চেষ্টা করেন বলে দাবি করেন আসিফ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, চারতলা থেকে তৃতীয় তলায় লাফ দেওয়ার পর পা পিছলে নিচে পড়ে যান আজমুল।

এই বর্ণনা মামলার আগের তথ্যের সাথে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। কারণ, ১৮ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল রোডসংলগ্ন ইসলামনগর সড়কের একটি চারতলা ভবনের ছাদে ভাত চুরির অভিযোগে আজমুলকে মারধরের কথা মামলার নথিতে এসেছে। পরে ভবন থেকে পড়ে তার মৃত্যু হয়। স্বজনদের অভিযোগ ছিল, তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

জিজ্ঞাসাবাদে আসিফ ম্যাচ ম্যানেজার মেহেদী এবং কৃষি ব্যাংকের খুলনার টাউন নওয়াপাড়া শাখার ক্যাশ অফিসার হাসনাত হাবিব রিফাতের ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার কথা বলেছেন বলে এসআরবি দাবি করেছে। আসিফের ভাষ্য অনুযায়ী, আজমুলকে নির্যাতনের ঘটনায় তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তবে আজমুলকে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল না বলেও দাবি করেছেন তিনি।

এ ছাড়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা হলের সামনে থাকা ‘মা-বাবার দোয়া তানহা জুস কর্নার’-এর মালিক তারেক ওরফে রুবেল আজমুলকে বেশি মারধর করেছেন বলেও দাবি করেছেন আসিফ। তবে এসব অভিযোগও তদন্তসাপেক্ষ। আসিফের বক্তব্যের ভিত্তিতে কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

চাঞ্চল্যকর এ মামলায় গত দুই দিনে মোট চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী তিনজন এবং একজন জুস বিক্রেতা। এর আগে মঙ্গলবার এসআরবি-৬ ও এসআরবি-৮ এর যৌথ অভিযানে হাসনাত হাবিব রিফাতকে গ্রেফতার করা হয়। একই সময়ে তারেক ওরফে রুবেলকে গ্রেফতার করে এসআরবি। আর প্রতাপ সরকার নামে আরও একজনকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ।

এর মধ্যে হাসনাত হাবিব রিফাত আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাত সাড়ে ৭টার দিকে খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪ এর বিচারক ইব্রাহীম খলিল মাহিমের কাছে তিনি ওই জবানবন্দি দেন।

হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন জানান, অন্য আসামিরাও স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিতে পারেন। ম্যাচ ম্যানেজার মেহেদীকে গ্রেফতার করা গেলে ঘটনা সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলেও জানান তিনি।

১৮ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল রোডসংলগ্ন ইসলামনগর সড়কের একটি চারতলা ভবনের ছাদে আজমুলকে মারধর করা হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ ছিল, তিনি ভাত চুরি করে খেয়েছেন। পরে ভবন থেকে পড়ে তার মৃত্যু হয়।

কিন্তু মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল-আজমুল কীভাবে ভবনের নিচে পড়ে গেলেন? তাকে কি মারধর করা হয়েছিল? মৃত্যুর আগে তার সাথে কী ঘটেছিল? কারা সেখানে ছিলেন?

গ্রেফতার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতের জবানবন্দিতে এখন এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে। নতুন গ্রেফতার আসিফের ভাষ্য সেই অনুসন্ধানে আরও একটি বর্ণনা যোগ করেছে। সেখানে রয়েছে জোর করে চুরির অভিযোগ স্বীকার করানো, সেই বক্তব্য ভিডিও ধারণ এবং পুলিশের ভয় দেখানোর দাবি।

তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন বক্তব্য কতটা সত্য এবং আজমুলের মৃত্যুর সাথে কার কী ভূমিকা ছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

আজমুলের বাবা কুতুবউদ্দিন গত শনিবার রাতে হরিণটানা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলায় এখন পর্যন্ত চারজন গ্রেফতার হলেও তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত হচ্ছে। পুলিশ ও এসআরবি বলছে, গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করা হচ্ছে এবং ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে ঘিরে এখন তদন্তের কেন্দ্রে শুধু ‘ভাত চুরি’ বা ‘ভবন থেকে পড়ে মৃত্যু’র প্রশ্ন নেই; বরং মৃত্যুর আগের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাবও খোঁজা হচ্ছে। আজমুলের ওপর কী ঘটেছিল, কারা তাকে ঘিরে ছিল, কেন তাকে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে তিনি চারতলার ছাদ থেকে নিচে পড়ে গেলেন-এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন মামলার তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।