সাতদিন ধরে নিখোঁজ ছিল ১০ বছরের শিশু কামরুন্নাহার কলি। তাকে জীবিত উদ্ধারের দাবিতে মঙ্গলবার পাবনা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেছিলেন স্বজন ও এলাকাবাসী। পরে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে দেওয়া হয়েছিল স্মারকলিপি। কিন্তু এর একদিন পরই বাড়ির পেছনের ডোবা থেকে উদ্ধার হলো কলির বস্তাবন্দি লাশ।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ৭টার দিকে পাবনা সদর উপজেলার দোগাছী ইউনিয়নের কলুনিয়া গ্রামের নিজ বাড়ির পেছনের একটি ডোবা থেকে শিশুটির লাশ উদ্ধার করা হয়। খবর ছড়িয়ে পড়লে স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। লাশ দেখতে কলিদের বাড়িতে ভিড় করেন স্থানীয়রা।
নিহত কামরুন্নাহার কলি কলুনিয়া গ্রামের কামাল প্রামানিকের মেয়ে। স্থানীয় আল-ফালাহ স্কুলের তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত সে। মেয়ের লাশ উদ্ধারের পর কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বাবা কামাল প্রামানিক ও মা মোছা. বিউটি আক্তার। জীবিত মেয়েকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা পরিবারকে শেষ পর্যন্ত বস্তাবন্দি লাশের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
কলির নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে গত ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায়। ওইদিন বাবার সাথে স্থানীয় শ্রীপুর বাজারে গিয়েছিল সে। বাজার থেকে বাবার সাথে বাড়ি ফিরে মায়ের হাতে বাজারের ব্যাগ তুলে দেয় কলি। এরপর বাড়ির পাশের দিকে যায়। কিন্তু বেশ কিছু সময় পার হলেও আর ঘরে ফেরেনি।
মেয়ের কোনো সন্ধান না পেয়ে পরিবারের লোকজন আশপাশের বাড়ি, প্রতিবেশী ও সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজ শুরু করেন। একপর্যায়ে বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে কলির পরনের স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে তার বাবা পাবনা সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
এরপর টানা সাতদিন কলির সন্ধানে বিভিন্ন জায়গায় ছুটেছেন স্বজনরা। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ চালিয়েও তার সন্ধান মেলেনি।
এ অবস্থায় মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) শিশুটিকে উদ্ধারের দাবিতে পাবনা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনে অংশ নেন এলাকাবাসী ও স্বজনরা। কর্মসূচি শেষে তারা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান। পরে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর স্মারকলিপি দিয়ে দ্রুত কলিকে উদ্ধারের দাবি জানান।
তবে ওই কর্মসূচির পরদিনই বদলে যায় পুরো পরিস্থিতি। বুধবার সকালে বাড়ির পেছনের ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় কলির লাশ উদ্ধার করা হয়।
এদিকে কলির পরিবারের অভিযোগ, নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হলেও তাকে উদ্ধারে পুলিশের প্রয়োজনীয় তৎপরতা দেখা যায়নি। তাদের দাবি, পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা নিলে শিশুটিকে দ্রুত খুঁজে বের করা সম্ভব হতে পারত।
অন্যদিকে পুলিশের দাবি, কলি নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করা হয়েছিল। এ ঘটনায় থানা পুলিশের বিন্দুমাত্র গাফিলতি নেই বলেও দাবি পুলিশের।
নিহত শিশু কলির বাবা কামাল প্রামানিক বলেন, প্রশাসনের কাছে আমি পাঁচদিন ঘুরেছি, প্রশাসন আমাকে কোনো সময় দেয় নাই। প্রশাসন কোনো গুরুত্ব দেয় নাই। পুলিশ মাঠে না নেমে আমার বাসায় এসে ঘুরে চলে যেত। গতকাল মানববন্ধন করার পর রাত ১২টায় থানায় মামলা এন্টি করাই। পরেরদিন সকালবেলায় আমার মেয়ের লাশ দেখতে পাই। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিচার চাই।
কলির মা মোছা. বিউটি আক্তার বলেন, আমার মেয়ে নিখোঁজের পর থেকেই আমি ফেসবুকের মাধ্যমে আমার মেয়ের জান ভিক্ষা চেয়ে আসছিলাম। আজকে আমার মেয়ের লাশ উদ্ধার করা লাগলো। আমি আমার মেয়ের খুনির ফাঁসি চাই।
কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশন পাবনা জেলা শাখার সভাপতি মাহফুজুর রহমান বলেন, পাবনার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি দুর্বল আছে জন্যই আজকে এ ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটলো। আজ ৭ দিন হয়ে গেলেও জীবিত উদ্ধার না করে মৃত উদ্ধার করতে হলো। প্রশাসন এতে প্রশ্নবিদ্ধ।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু প্রশাসন জীবিত উদ্ধার করতে পারেনি সেহেতু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যারা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তাদের গ্রেফতার করতে হবে। আইনশৃঙ্খলার এমন পরিস্থিতিতে আমরা শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।
পাবনার পুলিশ সুপার মো. আবু আশ্রাফ বলেন, নিখোঁজের ঘটনার পর থেকেই থানা পুলিশ এটি নিয়ে তাৎক্ষণিক কাজ শুরু করেছিল। আমার সাথে গতকাল কথা হলে অপহরণ মামলা নিয়েছি। আর আজকে সকালবেলায় লাশটা পাওয়া গিয়েছে। আমার ধারণা গতকাল রাতে লাশটি এখানে ফেলে গিয়েছে দুষ্কৃতকারীরা।
তিনি আরও বলেন, এই খুনের রহস্য উদ্ঘাটন ও আসামিদের গ্রেফতার করার জন্য জেলা পুলিশের গোয়েন্দা টিম, থানার টিমসহ সবাই গুরুত্বসহকারে কাজ করছে। ঘটনাটির রহস্য উদ্ঘাটন এবং দোষীদের গ্রেফতার করবো।


