...|...|...

খেলা

মেসি-হলান্ডের প্রিয় মাতেতে কী আছে এত আকর্ষণ

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১২:১৭
Shares
মেসি-হলান্ডের প্রিয় মাতেতে কী আছে এত আকর্ষণ

ছবি: সংগৃহীত

লিওনেল মেসি, লুইস সুয়ারেজ, এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ও আঁতোয়ান গ্রিজমানের মতো তারকাদের প্রিয় পানীয় মাতে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ম্যানচেস্টার সিটির নরওয়েজীয় স্ট্রাইকার আর্লিং হলান্ড। দক্ষিণ আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী এই পানীয় শুধু তৃষ্ণা মেটায় না, বরং বন্ধুত্ব, পারিবারিক স্মৃতি ও সামাজিকতারও প্রতীক। ফুটবলারদের হাত ধরে মাতের সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বজুড়ে।

রবিবার (১৮ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাতে হাতে নিজের একটি ছবি প্রকাশ করেন হলান্ড। পানীয়টির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য ম্যানচেস্টার সিটির বর্তমান ও সাবেক তিন আর্জেন্টাইন ফুটবলার এনজো ফার্নান্দেজ, হুলিয়ান আলভারেজ ও জেরোনিমো রুলিকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

তেতো স্বাদ থেকে ভালোবাসা

উরুগুয়ের সাবেক গোলকিপার সেবাস্তিয়ান ভিয়েরা ছোটবেলায় বাবার কাছ থেকে প্রথম মাতে পান করে স্বাদ পছন্দ করেননি। নিজের সন্তানদেরও একই অভিজ্ঞতা হয়েছে। তবে সময়ের সাথে তেতো স্বাদই হয়ে ওঠে ভালোবাসা।

২০০৪ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে উরুগুয়ের জাতীয় দলের হয়ে ১৫টি ম্যাচ খেলেছেন ভিয়েরা। তিনি বলেন, ‘বাবা প্রথম আমাকে মাতে খেতে দিয়েছিলেন। একেবারেই ভালো লাগেনি। আসলে প্রথমবার খেয়ে কারও ভালো লাগাটা বিরল। আমার সন্তানদেরও একই অভিজ্ঞতা। বলেছিল, খুব গরম, খুব তেতো। কিন্তু ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। তারপর একসময় প্রেমে পড়ে যাবেন।’

আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, প্যারাগুয়ে ও ব্রাজিলের কিছু অঞ্চলে মাতে শুধু পানীয় নয়, বরং পারিবারিক আড্ডা ও সামাজিকতারও অংশ।

মাতে যেভাবে তৈরি হয়

ইয়েরবা মাতে গাছের শুকনো পাতা গরম পানিতে ভিজিয়ে এই পানীয় তৈরি করা হয়। ‘বোমবিয়া’ নামের ধাতব নল দিয়ে এটি পান করা হয়, আর ঐতিহ্যবাহী পাত্রের নাম ‘কালাবাশ’।

দক্ষিণ আমেরিকার আদিবাসী গুয়ারানি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এর প্রচলন শুরু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। আর্জেন্টিনার ন্যাশনাল ইয়েরবা মাতে ইনস্টিটিউটের রাউল রোমেরো বলেন, ‘এই পানীয়ের গভীর সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শিকড় রয়েছে। উপনিবেশ স্থাপনের আগেই এ অঞ্চলের আদিবাসীদের মধ্যে এর প্রচলন ছিল। মানুষের কাছে মাতে পান করার গুরুত্ব অপরিসীম।’

বিশ্বকাপেও ছিল মাতে

২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দল সাথে নিয়েছিল প্রায় ২৪০ কেজি মাতে পাতা। উরুগুয়ে দলের প্রেস কর্মকর্তা ফেলিপে কোতেলো দ্য অ্যাথলেটিককে বলেছিলেন, ‘ফুটবলাররা সবাই এটা নিয়ে পাগল। সারাক্ষণ পান করছে। শেষ হবে না। আর শেষ হয়ে গেলেও সমস্যা নেই। আরও আনিয়ে নেব।’

২০২৪ সালের কোপা আমেরিকাতেও মেসি, সুয়ারেজ, এমিলিয়ানো মার্তিনেজসহ অনেক ফুটবলারের নিত্যসাথী ছিল মাতে। মেসি ও রদ্রিগো দি পল প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৯টায় মেসির হোটেলকক্ষে বসে এই পানীয় পান করতেন।

ভিয়েরার মতে, মাতে সতীর্থদের মধ্যে বন্ধন তৈরি করে। তিনি বলেন, ‘উরুগুয়ের হয়ে খেলার সময় আমাদের সাথে সব সময় মাতে থাকত। সব সময়। সত্যি বলতে, আমার মনে পড়ে না এমন কোনো সতীর্থ পেয়েছি, যে মাতে পান করত না। মাতে মানুষকে এক করে।’

ইউরোপেও বাড়ছে জনপ্রিয়তা

মাতেতে থাকা ক্যাফেইন, অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান সতেজতা ও মনোযোগ বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। তবে রাতে পান করলে ঘুমের সমস্যা হতে পারে। এফসি বাসেলের ক্রীড়া পুষ্টিবিদ্যা বিভাগের প্রধান হোসে ব্লেসার মতে, মাতে শরীরে পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং সহনশক্তি ও মনোযোগ বাড়াতে সহায়তা করে।

ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী আঁতোয়ান গ্রিজমান ও ইংল্যান্ডের সাবেক টটেনহাম ডিফেন্ডার এরিক ডায়ারও মাতের ভক্ত। ডায়ার বলেছিলেন, ‘আমাদের অনেক ফুটবলার মাতে পান করা শুরু করেছে। দলে অনেক আর্জেন্টাইন ছিল। তাদের সাথে আমিও শুরু করি। এখন ইংলিশ ফুটবলাররা দক্ষিণ আমেরিকান হওয়ার ভান করছে। আমি কিছুটা আসক্ত হয়ে পড়েছি।’

আর্জেন্টিনায় বছরে মাথাপিছু মাতে পান করার পরিমাণ ছয় কেজির বেশি। দেশটির ৯০ শতাংশেরও বেশি পরিবারে এই পানীয়ের প্রচলন রয়েছে। মাতে স্বাদের আইসক্রিম ও চিপসও পাওয়া যায়। উরুগুয়েতেও মাতে জাতীয় আবেগের অংশ। ২০২৪ সালে রাজধানী মন্টেভিডিওতে তৈরি করা হয় বিশাল মাতে পাত্রের শিল্পকর্ম। এমনকি ২০২২ বিশ্বকাপে দেশটির মাসকট ‘বোতিহা’ তৈরি হয়েছিল থার্মোস ফ্লাস্কের আদলে।

মাতে নিয়ে বিতর্কও আছে

মাতের প্রতি ভালোবাসা কখনো জাতীয় বিতর্কও তৈরি করেছে। ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা দলের জন্য নেওয়া মাতে পাতা উরুগুয়েতে উৎপাদিত ও ব্রাজিলে প্রক্রিয়াজাত হওয়ায় সমালোচনা করেছিলেন দেশটির সাবেক পার্লামেন্ট সদস্য লুইস পাস্তোরি। তিনি বলেন, ‘এটা অস্বাভাবিক এবং ব্যাখ্যাতীত। আর্জেন্টিনায় কয়েক ডজন খুব ভালো মাতে ব্র্যান্ড আছে। তার পরেও অন্য দেশের মাতে নেওয়া, এটা প্রায় উসকানি দেওয়ার মতো ব্যাপার।’

২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনা নিজেদের দেশের কাচামাই ব্র্যান্ডের মাতে ব্যবহার করে। পরে ব্র্যান্ডটি জাতীয় দলের স্পনসর হয় এবং মেসিসহ কয়েকজন তারকার ছবি পণ্যের প্যাকেটে স্থান পায়।

দক্ষিণ আমেরিকার বাইরে সিরিয়া ও লেবাননেও মাতে জনপ্রিয়। কোভিডের পর একই পাত্র ও নল ভাগাভাগি করে পান করার অভ্যাসে পরিবর্তন এলেও এর সামাজিক গুরুত্ব রয়ে গেছে। মেসি থেকে হলান্ড বিভিন্ন দেশের ফুটবলারদের এক করেছে এই ঐতিহ্যবাহী পানীয়। ফুটবলের মতোই এক পেয়ালা মাতে গড়ে তুলছে বন্ধুত্বের সেতু।