বৃষ্টি মানেই আমাদের দেশে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা। রাস্তায় পানি জমা, যানজট, স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়া, সর্দি-কাশির প্রকোপ- এসবের পাশাপাশি আরেকটা ব্যাপারও লক্ষ্য করা যায়। সেটি হলো- বৃষ্টি শুরু হলেই মোবাইল বা ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের স্পিড হঠাৎ কমে যায়।
ইউটিউব ভিডিও বারবার বাফারিং হয়, ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ পাঠাতে দেরি হয়, জুম কল কেটে যায় বারবার। অনেকেই ভাবেন এটা হয়তো শুধু কাকতালীয়, কিন্তু আসলে এর পেছনে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত কারণ আছে।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, বৃষ্টির সাথে ইন্টারনেটের গতির সম্পর্কটা আসলে কী-
১. বৃষ্টির ফোঁটা আর রেডিও তরঙ্গের লড়াই
আমরা মনে করি, ইন্টারনেট বুঝি সরাসরি বাতাস বেয়ে ফোনে চলে আসে। বাস্তবে ব্যাপারটা এমন যে, মোবাইল টাওয়ার থেকে বেতার তরঙ্গ বা তড়িৎচুম্বকীয় সংকেত আকারে ডেটা পাঠানো হয়, যা আমাদের ফোনের অ্যান্টেনা গ্রহণ করে। সাধারণ আবহাওয়ায় এই তরঙ্গ কোনো বাধা ছাড়াই দ্রুত পৌঁছে যায়।
কিন্তু ভারী বৃষ্টির সময় বাতাসে থাকা লাখো-কোটি পানির ফোঁটা এই তরঙ্গগুলোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। পানির ফোঁটা রেডিও তরঙ্গ শুষে নেয় এবং চারদিকে ছড়িয়ে দেয়, ফলে সংকেত দুর্বল হয়ে ফোন পর্যন্ত পৌঁছায়।
প্রযুক্তির ভাষায় এই ঘটনাকে বলা হয় ‘রেইন অ্যাটেন্যুয়েশন’ বা ‘রেইন ফেড’। বৃষ্টি যত ভারী হবে, সিগন্যালের ক্ষতিও তত বেশি হবে।
২. ঘরবন্দি মানুষ, বেড়ে যাওয়া চাপ
শুধু বৃষ্টির ফোঁটাই একমাত্র কারণ নয়। বৃষ্টি নামলে বেশিরভাগ মানুষ বাধ্য হয়ে ঘরে বসে থাকেন। ফলে একসাথে অনেক বেশি মানুষ মোবাইল ও ইন্টারনেট ব্যবহার শুরু করেন- কেউ সিনেমা দেখেন, কেউ গেম খেলেন, কেউ সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করেন।
একই এলাকার একটি মোবাইল টাওয়ারে যখন হঠাৎ করে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যায়, তখন সেই টাওয়ারের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। ফলাফল- নেটওয়ার্ক স্লো হয়ে যাওয়া, কল ড্রপ হওয়া বা ইন্টারনেট একদমই কাজ না করা।
৩. ব্রডব্যান্ড থাকলেও নিশ্চিন্ত থাকা যায় না
অনেকে মনে করেন, ফাইবার-অপটিক বা ব্রডব্যান্ড কানেকশন থাকলে বৃষ্টিতে কোনো সমস্যা হবে না। এই ধারণাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। বৃষ্টির পানি সরাসরি ফাইবার-অপটিক কেবলের ক্ষতি না করলেও, যদি সেই পানি আশপাশের জংশন বক্স, সংযোগ পয়েন্ট বা অন্য কোনো নেটওয়ার্কিং যন্ত্রপাতির ভেতরে ঢুকে যায়, তাহলে সংযোগ বিঘ্নিত হতে পারে।
বিভিন্ন জায়গায় পানি জমে থাকলে কেবল সংযোগও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া ঝড়-বৃষ্টির সময় মোবাইল টাওয়ারের অ্যান্টেনা সামান্য নড়ে গেলেও পুরো এলাকার সিগন্যাল কভারেজে প্রভাব পড়তে পারে।
বৃষ্টির সময় ইন্টারনেট স্লো হওয়ার পেছনে মূলত দুইটা কারণ কাজ করে-
- ভারী বৃষ্টি রেডিও সিগন্যালকে দুর্বল করে দেয়।
- একসাথে অনেক মানুষ ঘরে বসে ইন্টারনেট ব্যবহার করায় নেটওয়ার্কের ওপর চাপ বেড়ে যায়।
তাই পরের বার বৃষ্টির মধ্যে ভিডিও বাফার হতে থাকলে বা কল কেটে গেলে বুঝে নেবেন- এটা শুধু আপনার ফোন বা অপারেটরের দোষ না, প্রকৃতি আর একসাথে অনেক মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারও এর পেছনে দায়ী।



