ফ্রান্সে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ এবং পুলিশের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মাঝেই উন্নত বেতন ও কর্মপরিবেশের দাবিতে দেশজুড়ে রাজপথে নেমেছেন হাজার হাজার সরকারি চাকরিজীবী।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) শিক্ষক, অগ্নিনির্বাপক কর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ বিভিন্ন খাতের লাখ লাখ মানুষ এই একদিনের সাধারণ ধর্মঘটে অংশ নেন।
আল জাজিরার বরাতে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশব্যাপী এই বিক্ষোভে প্রায় ৩ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। অন্যদিকে প্যারিস পুলিশের তথ্য অনুযায়ী কেবল রাজধানীতেই ৩০ হাজার মানুষ অংশ নেন।
মূলত সরকারের প্রস্তাবিত বাজেট ঘাটতি কমানোর পদক্ষেপ এবং মূল্যস্ফীতির বিপরীতে জীবনযাত্রার মান রক্ষার দাবিতে এই আন্দোলন গড়ে উঠেছে। সরকারের আসন্ন বাজেট প্রস্তাবের ঠিক দুই দিন আগে এবং আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র সাত মাস বাকি থাকতে এই তীব্র অসন্তোষ দেখা দিল।
ইউনিয়নের দাবি অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের মৌলিক বেতন ২০২৭ সালের জন্য স্থগিত রাখতে চায় সরকার, যার মাধ্যমে ২ বিলিয়ন ইউরো (২.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর আমলে এটি হবে চতুর্থ ধারাবাহিক বার্ষিক বেতন স্থগিতাদেশ এবং তার পুরো মেয়াদে অষ্টম বারের মতো এমন পদক্ষেপ। ইউনিয়নগুলোর মতে, এসব স্থগিতাদেশের কারণে কর্মীরা তাদের ক্রয়ক্ষমতার বড় একটি অংশ হারিয়ে ফেলেছেন, যার ফলে তারা ৬ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির দাবি জানাচ্ছেন।
‘রেড অ্যালার্ট’ বা লাল সতর্কতা জারি
জেনারেল কনফেডারেশন অফ লেবারের সাধারণ সম্পাদক সোফি বিনে এই আন্দোলনকে একটি ‘লাল সতর্কতা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই ক্ষোভ সহজে থামছে না। সরকারকে অবশ্যই বাজেট বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তী ধর্মঘট কর্মসূচি চূড়ান্ত করার আগে বাজেট কাাঁটছাঁটের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার সময় দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ১১ শতাংশের কিছুটা বেশি শিক্ষক ও স্কুল স্টাফ ধর্মঘটে অংশ নেন। উল্লেখ্য যে, ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় ফরাসি শিক্ষকদের গড় বেতন কিছুটা কম। এছাড়া কাজের দিনে বেতন কাটার আশঙ্কায় অন্যান্য সরকারি চাকরিজীবী ও হাসপাতাল কর্মীদের অংশগ্রহণের হার ছিল ১০ ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। তবে ফরাসি বেসামরিক বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিছু বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচলে বিঘ্ন ঘটার বিষয়ে আগেই সতর্ক করেছিল। চলমান দাবির অংশ হিসেবে পেশাদার অগ্নিনির্বাপক কর্মীরাও মিছিলে যোগ দেন, যারা মনে করেন যে গত গ্রীষ্মের ভয়াবহ দাবানল রাষ্ট্রীয় সম্পদের চরম সংকটকে উন্মোচন করে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা সামলাতে পরিবারগুলোকে সহায়তার জন্য সরকার ইতোমধ্যে কিছু ব্যবস্থা ঘোষণা করলেও, প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ ও তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রশমিত করতে তা ব্যর্থ হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের তীব্র বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ
অন্যদিকে, চলতি বছরের তীব্র তাপপ্রবাহের সময় ক্লাসরুমের অতিরিক্ত গরম, ক্লাসের সময়সূচী, শিক্ষার্থী সংখ্যাধিক্য এবং শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে শত শত স্কুলের বাইরে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছে। প্যারিস সংলগ্ন ইল-ফ্রাঁস অঞ্চল থেকে এই আন্দোলন শুরু হলেও তা দ্রুত অন্যান্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে।
কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থী ও স্টাফদের ১০ জন আহত হওয়ার পাশাপাশি সংঘর্ষে ৪৮ জন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য আহত হয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্থানে ময়লার ঝুড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এর জবাবে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ত নুনেজ বিএফএমটিভিকে জানান, এ পর্যন্ত ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে এখনও চূড়ান্ত হিসাব নেই, তবে আমাকে বলা হয়েছে যে আটককৃতদের দুই-তৃতীয়াংশকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। সহিংসতা কখনো বৈধ হতে পারে না এবং কোনো কিছুই সহিংসতাকে সমর্থন করে না।
শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দ জেফ্রে সামাজিক মাধ্যমে এই সংঘর্ষের তীব্র নিন্দা জানিয়ে লিখেছেন, এই সহিংসতা অগ্রহণযোগ্য। তিনি জানান যে আইনি কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এগুলোকে বৈধতা দেওয়া বা অবরোধ বাড়িয়ে তোলার আহ্বান জানানো আমাদের শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মকর্তা উভয়ের জন্যই বিপজ্জনক। এটি অত্যন্ত দায়িত্বজ্ঞানহীন।
‘কম পুলিশ, বেশি অর্থ’
প্যারিসের কম আয়ের শহরতলি সেন-সাঁ-দেনির ‘লিসে পল-এলুয়ার’ স্কুলের বাইরে শত শত শিক্ষার্থীর সাথে বিক্ষোভে যোগ দেন ওই জেলার মেয়র এবং কড়া বামপন্থী দল ‘ফ্রান্স আনবাউন্ড’-এর সদস্য বালি বাগায়োকো। তিনি শিক্ষার্থীদের সাথে জাতীয় সংগীত গেয়ে এই আন্দোলনকে ‘সম্পূর্ণ বৈধ’ বলে অভিহিত করেন এবং ধনী এলাকার তুলনায় দরিদ্র এলাকাগুলোতে কম সরকারি বরাদ্দ পাওয়ার তীব্র সমালোচনা করেন।
প্যারিসের আরাগো স্কুলের বাইরে শিক্ষার্থীরা মুখ ঢেকে ময়লার বড় ডাস্টবিনের ওপর বসে প্রবেশপথ বন্ধ করে দেয়, যার ওপরে লেখা ছিল ‘মাক্রোঁ বিস্ফোরণ’। এছাড়া হেলেন-বাউচার স্কুলের একটি ব্যানারে লেখা ছিল ‘কম পুলিশ, বেশি অর্থ’। ওই স্কুলের শেষ বর্ষের ছাত্র মায়েল ব্রেটন বলেন, আমরা কম পুলিশ চাই কারণ আমরা মনে করি হাই স্কুলের শিক্ষার্থী আন্দোলন এবং সামাজিক আন্দোলন—উভয় ক্ষেত্রেই প্রচুর পুলিশি দমনপীড়ন চালানো হয়। এটি একটি বড় সমস্যা, বিশেষ করে যখন আমাদের স্কুলে এবং সামগ্রিক জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায় তীব্র তহবিলের অভাব রয়েছে।
এদিকে, সোমবার প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকোরনু উচ্চ বিদ্যালয়ের বিক্ষোভকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে অভিহিত করলেও স্বীকার করেন যে, "উচ্চ বিদ্যালয়গুলোর অসুবিধাগুলো শোনা এবং সমাধান করা জরুরি।
অন্যদিকে, প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কড়া বামপন্থী প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জঁ-লুক মেলেনশোঁ সরকারের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে জনসেবা ধ্বংস করার অভিযোগ আনেন এবং তার সমর্থকদের আসন্ন বাজেট প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।
সোমবার প্রকাশিত একটি টুলুনা হ্যারিস জনমত জরিপে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মেলেনশোঁ এবং কড়া উগ্র ডানপন্থী দল ‘ন্যাশনাল র্যালি’র নেত্রী মারিন লে পেন রান-অফে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন, যেখানে লে পেন জয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।



