চলতি বছরের জুলাই মাসে সারাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৬ জন নিহত এবং ১৬৪ জনের বেশি আহত হয়েছেন। একই সময়ে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৭ জন এবং আহত হয়েছেন ৫১ জন।
সোমবার (৩ আগস্ট) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।
সংগঠনটির মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, এইচআরএসএসের নিজস্ব তথ্য এবং স্থানীয় প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জুলাই মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই মাসে ৪৫টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৬ জন নিহত এবং ১৬৪ জন আহত হয়েছেন। এর আগের মাস জুনে ৫৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ৩৪৬ জন আহত হয়েছিলেন।
জুলাইয়ের রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৪টি ঘটনায় ২ জন নিহত ও ৪৮ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে ৬টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪৪ জন। বিএনপি-এনসিপির মধ্যে ৫টি সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩৮ জন। এছাড়া বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে ৩টি ঘটনায় ১৩ জন এবং বিএনপি-অন্যান্য দলের সংঘর্ষে ১৪টি ঘটনায় ১৬ জন আহত হয়েছেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিভিন্ন দলের সংঘর্ষে ৩টি ঘটনায় ৩ জন নিহত ও ৫ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির ২ জন এবং জেএসএস ও ইউপিডিএফের ৩ জন রয়েছেন।
এদিকে, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের ওপর দুর্বৃত্তদের হামলার অন্তত ৭টি ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১ জন এবং বিএনপির ৪ জন রয়েছেন। এসব ঘটনায় অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, রাজনৈতিক বিরোধ ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ৯টি ঘটনায় অন্তত ৪০টি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
রাজনৈতিক মামলার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই মাসে বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৪১টির বেশি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ৮৮৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং প্রায় ৫ হাজার ১৯ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক ও অন্যান্য ঘটনায় মোট ১৯৩টি মামলায় অন্তত ৯ হাজার ১৫৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৩১৮ জন, বিএনপির ২৮ জন, এনসিপির ৭ জন এবং জামায়াতের ১ জন নেতাকর্মী রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনির বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাকবিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার ও ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগসহ ৪৯টি ঘটনায় ১৭ জন নিহত ও ৫১ জন আহত হয়েছেন।
জুলাই মাসে সাংবাদিক নির্যাতনের ৩৬টি ঘটনায় ৫৫ জন সাংবাদিক হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২১ জন আহত, ৯ জন লাঞ্ছিত, ৮ জন হুমকির মুখে পড়েছেন এবং ৩ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ৮টি মামলায় ১৪ জন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সভা-সমাবেশ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ৯টি ঘটনায় ২০ জন আহত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের কারণে ৮টি ঘটনায় ৮ জনকে আটক এবং ৮টি মামলা করা হয়েছে।
এদিকে, জুলাই মাসে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ হেফাজতে ২ জন এবং ডিবি হেফাজতে ১ জন মারা গেছেন। একই সময়ে কারাগারে ১০ জন আসামির মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে ২ জন কয়েদি ও ৮ জন হাজতি।
শ্রমিক নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই মাসে ৭৯টি ঘটনায় ২৩ জন শ্রমিক নিহত এবং ৭২ জন আহত হয়েছেন। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় নিরাপত্তাহীনতার কারণে আরও ৫৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই মাসে ২৫৮ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৯৫ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬১ জন শিশু ও কিশোরী। গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১১ জন নারী ও কন্যাশিশু।
এ ছাড়া যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৭৮ জন, পারিবারিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৪৫ জন নারী, আহত হয়েছেন ১০ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ২৩ জন।
শিশু নির্যাতনের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই মাসে ১৮০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৩৪ জন মারা গেছে এবং ১৪৬ জন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনা অব্যাহত ছিল। এসব বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।



