...|...|...

সারাদেশ

ক্যানসারকে হার মানিয়ে বুশরার জিপিএ-৫

ঝালকাঠি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১:০৫
Shares
ক্যানসারকে হার মানিয়ে বুশরার জিপিএ-৫

মারণব্যাধি ব্লাড ক্যানসারের সাথে লড়াই করে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে বুশরা মেহজাবীন। ঝালকাঠি সরকারি হরচন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ৯০ শতাংশের বেশি নম্বর নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। নবম ও দশম শ্রেণির অর্ধেকেরও বেশি সময় কেটেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যানসার ওয়ার্ডে। টানা সাত মাস ছিল জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। শরীরে এখনও চলছে চিকিৎসা—প্রতি মাসে একবার কেমোথেরাপি, আর প্রতি তিন মাসে নিতে হয় বিশেষ কেমোথেরাপি। মাসের শেষ দিকে চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে, অনেক সময় মাথা সোজা করে রাখতে পারে না।

তবুও থেমে যায়নি তার পড়াশোনা। চিকিৎসক তাকে বিশেষ সুবিধায় হাসপাতালে শুয়ে পরীক্ষা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু বুশরা চেয়েছে অন্য সবার মতোই পরীক্ষার হলে বসে, সমান সুযোগ নিয়ে নিজের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যেতে। অদম্য আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম আর নিজের প্রতি বিশ্বাসের সেই প্রত্যয়ই শেষ পর্যন্ত এনে দিয়েছে ঈর্ষণীয় সাফল্য।

বুশরা মেহজাবীনের ব্লাড ক্যানসার শনাক্ত হয় ২০২৪ সালের ৫ জুলাই। এরপর থেকে দুই বছরের বেশি সময় ধরে দুরারোগ্য এই ব্যাধির সাথে লড়াই করছে সে। অসুস্থতার মধ্যেও একাই পড়াশোনা করে, নিজের চেষ্টায় পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে এসএসসিতে ৯০ শতাংশের বেশি নম্বর নিয়ে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে।

বুশরার এই সাফল্য শুধু একটি জিপিএ-৫ অর্জনের গল্প নয়; এটি অসুস্থতার কাছে হার না মানা এক কিশোরীর স্বপ্ন, সাহস, আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায়ের গল্প।

সংবর্ধনার দিন যেন সব কষ্ট ভুলে গিয়েছিল বুশরা:

বুশরা মেহজাবীনের কাছে শনিবারের রাতটা যেন কাটতেই চাইছিল না। সকাল হতে না হতেই মাকে তাড়া দিয়ে ঘুম থেকে তুলে প্রস্তুত হয়ে যায় সে। এরপর মায়ের সাথে চলে আসে ঝালকাঠি সরকারি কলেজের নতুন ভবনের হলরুমে প্রথম আলোর জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানে এসে যেন তার দীর্ঘদিনের অসুস্থতা, হাসপাতালের ক্যানসার ওয়ার্ড, কেমোথেরাপি আর চিকিৎসার নানা কষ্ট কিছু সময়ের জন্য দূরে সরে যায়। বন্ধুদের সাথে হইহুল্লোড়, গল্প আর সেলফি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে।

বুশরা মেহজাবীনের মা মেহেরুন্নেছা বলেন, প্রথম আলোর জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসে আমার মেয়ের শারীরিক সব কষ্ট দূর হয়ে গেছে। মেয়েটি অনুষ্ঠানে এসে বন্ধুদের সাথে হইহুল্লোড় ও সেলফি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মেয়ে কয়েক দিন ধরেই অনুষ্ঠান নিয়ে খুব উচ্ছ্বসিত ছিল।

বুশরা মেহজাবীন বলেন, ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়ার পর জীবনের একটা কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে, নিয়মিত কেমোথেরাপি নিতে হয়েছে। অনেক সময় শারীরিকভাবে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়তাম যে পড়াশোনা করাও কঠিন হয়ে যেত। তারপরও আমি কখনো মনে করিনি যে অসুস্থতার কারণে আমার স্বপ্ন থেমে যাবে।

চিকিৎসক আমাকে হাসপাতালে শুয়ে পরীক্ষা দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম অন্য সবার মতো পরীক্ষার হলে বসেই পরীক্ষা দিতে। কারণ আমি মনে করি, নিজের ওপর বিশ্বাস থাকলে কঠিন পরিস্থিতিও জয় করা সম্ভব। তাই যতটা পেরেছি নিজের মতো করে পড়াশোনা করেছি এবং পরীক্ষা দিয়েছি। জিপিএ-৫ পাওয়ার পর আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে আমার মা-বাবার মুখের হাসি দেখে।

প্রথম আলোর এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এসে আমার অনেক ভালো লাগছে। বন্ধুদের সাথে দেখা হয়েছে, গল্প করেছি, ছবি তুলেছি। কয়েক দিন ধরে এই অনুষ্ঠানটির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমার মতো যারা কোনো কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাদের বলতে চাই—হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। অসুস্থতা বা কোনো বাধাই যেন আমাদের স্বপ্নের পথে থামিয়ে না দেয়। আমি ভবিষ্যতে আরও পড়াশোনা করতে চাই এবং নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মানুষের জন্য কিছু করতে চাই।

ঝালকাঠিতে দেড় শতাধিক কৃতী শিক্ষার্থীর মিলনমেলা:

প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হচ্ছে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগানে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের ৬৪ জেলায় এ সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায় রবিবার (৪ অক্টোবর) সকালে ঝালকাঠি সরকারি কলেজের নতুন ভবনের হলরুমে এ অনুষ্ঠান হয়।

প্রথম আলোর জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ৪০-৪৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কাঁঠালিয়ার আমুয়া থেকে রাহায়ে রুহানি, রাজাপুর থেকে প্রিয়াংকা বিশ্বাস ও নলছিটির সুগন্ধা নদী পাড়ি দিয়ে নাফিজা ইসলাম অনুষ্ঠানে আসে। এ সংবর্ধনা ছিল তাদের জন্য স্বপ্নের, উচ্ছ্বাসের। কাঁঠালিয়ার আমুয়া থেকে রাহায়ে রুহানি বলে, প্রথম আলোর জিপিএ-৫ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য গত তিন দিনে কোথাও বেড়াতে যাইনি। প্রথমবারের মতো এমন কোনো সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এলাম। অন্য বন্ধুরাও এসেছে। খুবই ভালো লাগছে।

আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ। সহযোগিতায় রয়েছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা-গ্রি, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।

রবিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। এর আগেই সকালে কৃতী শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ক্রেস্ট ও উপহার। দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে ঝালকাঠি সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণ। এদিন সকাল থেকে অনুষ্ঠানস্থলে শিক্ষার্থীদের কেউ এসেছে মা-বাবার হাত ধরে, কেউ ভাইবোন বা বন্ধুদের নিয়ে।

দীর্ঘদিন পর পুরোনো সহপাঠীদের সাথে দেখা হওয়ার আনন্দে কেউ আলিঙ্গন করছে, কেউ মেতেছে গল্পে, আবার কেউ ব্যস্ত ছিল এই মুহূর্তের স্মৃতি ছবিতে ধরে রাখতে। অনুষ্ঠানে আসা অতিথি ও শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে একসাথে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে।

স্বপ্ন দেখার সাহস ও মানবিক হওয়ার আহ্বান:

ঝালকাঠি বন্ধুসভার সভাপতি শাকিল হাওলাদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর ঝালকাঠি প্রতিনিধি আ স ম মাহমুদুর রহমান। এরপর অন্যান্য অতিথিদের মঞ্চে ডেকে নেন তিনি। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা শিক্ষার্থীদের সামনে স্বপ্ন দেখার সাহস, অধ্যবসায় ও মানবিক মূল্যবোধের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

ঝালকাঠি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আগামীর বাংলাদেশের জন্য আমাদের যে প্রজন্ম গড়ে তোলা দরকার, প্রথম আলো তাদের অবস্থান থেকে সে দায়িত্বটা পালন করে যাচ্ছে। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমাদের নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। নিজের শক্তির ওপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখতে হবে। মানুষের কল্যাণে এবং সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে কাজে লাগাতে হবে।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ঝালকাঠি প্রেসক্লাবের সভাপতি আক্কাস সিকদার নানা পরামর্শমূলক বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, তোমরা এমনভাবে নিজেদের তৈরি করবে, যাতে ভবিষ্যতে তোমাদের জ্ঞান ও মেধা পরিবার, সমাজ ও দেশের মানুষের কাজে আসে।

আলোচনা অনুষ্ঠান, কুইজ ও পুরস্কার বিতরণী পর্বের মধ্যে কখনো সংগীত, কখনো নৃত্য, কখনো শিক্ষার্থীদের গল্প ও আবৃত্তিতে মুখর হয়ে ওঠে মঞ্চ।

অনুষ্ঠানের আরেক অতিথি ঝালকাঠি সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ইলিয়াস ব্যাপারী বলেন, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা মানেই চূড়ান্ত সফলতা নয়। ভালো ফলাফলের পাশাপাশি একজন ভালো মানুষ হয়ে ওঠা, নির্মোহ মানুষ হয়ে ওঠা, নিবেদিত, মানবিক ও দেশপ্রেমে সমৃদ্ধ মানুষ হয়ে ওঠা অনেক বেশি জরুরি।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের চিকিৎসা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। তাই আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে, আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে। শুধু জিপিএ-৫ পাওয়াই জীবনের বড় অর্জন নয়, তোমাদের একজন আলোকিত মানুষ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। এসময় আরও বক্তব্য রাখেন, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সাঈদ, ঝালকাঠি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পবিত্র কুমার দাস, প্রথম আলো বন্ধুসভার উপদেষ্টা শিক্ষক হামিদা খানম।

তিন ‘ম’ থেকে দূরে থাকার শপথ

এদিন প্রথম আলোর জেলা প্রতিনিধি আ স ম মাহমুদুর রহমান তিন ‘ম’কে—মাদক, মিথ্যা ও মুখস্থ—নিয়ে শিক্ষার্থীদের শপথ পড়ান। তিনি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সময়ের গুরুত্ব তুলে ধরে দিকনির্দেশনা দেন।

আর এই পুরো আয়োজনের ভিড়ে বুশরা মেহজাবীনের গল্পটি যেন আলাদা করে চোখে পড়ে। যে কিশোরী জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়েও ক্যানসারের সাথে লড়াই করে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে, হাসপাতালে শুয়ে নয়, সবার মতো পরীক্ষার হলে বসে পরীক্ষা দিয়েছে—তার জিপিএ-৫ যেন শুধু একটি ফলাফল নয়, বরং স্বপ্নের কাছে অসুস্থতার পরাজয়ের প্রতীক।

বুশরার মতো দেড় শতাধিক কৃতী শিক্ষার্থীকে ঘিরে এদিন ঝালকাঠি সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে তৈরি হয় স্বপ্ন, উচ্ছ্বাস ও সম্ভাবনার এক মিলনমেলা। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’—এই বার্তায় সংবর্ধিত শিক্ষার্থীরা যেন নতুন করে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয় নিয়েই অনুষ্ঠানস্থল থেকে ফিরে যায়।