জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মজুরি ও পেনশন নিয়ে অসন্তোষ এবং সরকারি পরিষেবায় বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে অংশ নেন লাখো মানুষ।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এবারের বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ ৭৫ হাজার। তবে প্রধান শ্রমিক সংগঠন জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার (সিজিটি) দাবি করেছে, দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১৫ লাখ ৭৩ হাজার মানুষ।
অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা নিয়ে সরকার ও শ্রমিক সংগঠনের হিসাবে বড় পার্থক্য থাকলেও উভয় পক্ষের তথ্যেই এবারের কর্মসূচির ব্যাপকতা স্পষ্ট। এর আগে ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে সরকারি হিসাবে ৫ লাখ ৫০ হাজার, ২৪ অক্টোবর ৪ লাখ ১০ হাজার এবং ৩১ অক্টোবর ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।
সিজিটির হিসাবে, শুধু প্যারিসেই বিক্ষোভে অংশ নেন প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। অন্যদিকে, রাজধানীতে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ৬৫ হাজার বলে জানিয়েছে সরকার।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে বেতন ও ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ সরকারি পরিষেবায় বরাদ্দ বাড়ানো।
ফ্রান্সে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং আয়ের তুলনায় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজুরি বাড়ছে না। পাশাপাশি সরকারি খাতে ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা জনসেবার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সিজিটির মহাসচিব সোফি বেনে বলেছেন, এবারের ধর্মঘট বেশ কার্যকর হয়েছে। শ্রমিকদের দাবি মেনে নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি সব কর্মীর বেতন বাড়ানো এবং ন্যূনতম মজুরি ১০ শতাংশ বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন।
প্যারিসের এক সমাবেশে তিনি বলেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শ্রমিকদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
এবারের ধর্মঘটে শিক্ষা খাতেও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দেশটির প্রায় ১৬ শতাংশ শিক্ষক ধর্মঘটে অংশ নেন। তবে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের সংগঠন SNES-FSU দাবি করেছে, মধ্য ও উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মীদের মধ্যে ধর্মঘটে অংশগ্রহণের হার ছিল ৫২ শতাংশ।
উচ্চশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির ১৮৪টি বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬০টিতে কোনো না কোনোভাবে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। কয়েকটি শহরে শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানের প্রবেশপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। প্যারিস ও বোর্দোসহ কয়েকটি স্থানে অবরোধ সরাতে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের সূত্রপাত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর অতিরিক্ত চাপ, শিক্ষক সংকট, শিক্ষা খাতে অর্থের ঘাটতি এবং শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ থেকে আন্দোলন শুরু হয়। পরে এর সঙ্গে বিভিন্ন শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠনও যুক্ত হয়।
বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে রাখতে দেশজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি সদস্য মোতায়েন করে ফরাসি সরকার। অধিকাংশ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হলেও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন শহর থেকে অন্তত ৪৪৮ জনকে আটক করা হয়েছে। প্যারিস, বোর্দো, মার্সেই, নঁত ও রেনসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
ধর্মঘট ও সড়ক অবরোধের কারণে পরিবহনব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবায়ও বিঘ্ন ঘটে।
দেশজুড়ে আন্দোলনের মধ্যে শ্রমিক সংগঠন ও নিয়োগকর্তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছে ফরাসি সরকার। আগামী সোমবার (৯ নভেম্বর) প্যারিসের মাতিনিয়ন ভবনে একটি সামাজিক সম্মেলন আয়োজনের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু।
সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, সম্মেলনে মজুরি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে।
তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি কেবল বেতন বৃদ্ধিতে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অর্থায়ন, সরকারি পরিষেবার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়গুলোও তাদের দাবির তালিকায় রয়েছে। ফলে সরকারের আলোচনার উদ্যোগ আন্দোলনকারীদের কতটা সন্তুষ্ট করতে পারে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ফ্রান্সের এবারের আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, শিক্ষার্থীদের দাবি থেকে শুরু হওয়া প্রতিবাদ ক্রমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শ্রমিক, সরকারি কর্মচারী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, কৃষক ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তুষ্ট সাধারণ মানুষ এতে যুক্ত হয়েছেন।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সরকারি ব্যয় সংকোচনের নীতি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, বাজেট ঘাটতি কমানোর চাপ এবং পার্লামেন্টে রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে সরকারের জন্য নতুন করে সরকারি ব্যয় বাড়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে সোমবারের সামাজিক সম্মেলনের দিকে নজর রয়েছে শ্রমিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষের। আলোচনার মাধ্যমে দাবিদাওয়ার কতটা সমাধান হয়, নাকি আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়, তা নির্ভর করবে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।


