ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় ‘ডেড হ্যান্ড’ নামে একটি সামরিক ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে বলে দাবি ছড়িয়েছে। তবে ইরানের সামরিক নেতৃত্বের এমন সিদ্ধান্তের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
২৩ অক্টোবর প্রকাশিত স্টোরিচেজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২১ অক্টোবর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি চ্যানেলে ইরানের কথিত ‘ডেড হ্যান্ড’ ব্যবস্থা সক্রিয় করার দাবি ছড়াতে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে এসব বার্তায় বলা হয়, সম্ভাব্য মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কায় ইরানের নেতৃত্ব সামরিক বাহিনীর বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি সক্রিয় করার নির্দেশ দিয়েছে। তবে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দাবিগুলোর পক্ষে ইরান সরকারের কোনো বিবৃতি, প্রকাশিত সামরিক নির্দেশনা কিংবা যাচাইযোগ্য নথি উপস্থাপন করা হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বার্তাগুলোর একটিতে দাবি করা হয়েছে, ইরানের নেতৃত্ব সামরিক বাহিনীকে ‘মোজাইক ডিফেন্স’ বা বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছে। এতে স্থানীয় সামরিক কমান্ডারদের যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনাসহ বিভিন্ন সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
দাবি অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেও আঞ্চলিক সামরিক ইউনিটগুলো যেন নিজস্ব সিদ্ধান্তে প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে পারে, সেটিই এ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য।
তবে স্টোরিচেজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব তথ্যের উৎস মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট। ইরানের কোনো সরকারি সূত্র এ বিষয়ে নিশ্চিত করেনি। ফলে কথিত নির্দেশনা জারি হয়েছে কিংবা লক্ষ্যবস্তুর তালিকা বিতরণ করা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই।
ইরানের ‘মোজাইক ডিফেন্স’ কী?
ইরানের সামরিক কৌশলে বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষার ধারণা নতুন নয়। এর উদ্দেশ্য হলো, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা সামরিক সদর দপ্তর আক্রান্ত হলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সামরিক ইউনিটগুলো যেন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।
২৩ মার্চ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছিল, ইরানের ক্ষমতাকাঠামো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিস্তৃত এবং দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বিকেন্দ্রীভূত ‘মোজাইক’ কাঠামো ও পূর্বপরিকল্পিত বিকল্প নেতৃত্বব্যবস্থা সামরিক কার্যক্রম সচল রাখতে ভূমিকা রাখে।
এই কাঠামো আগে থেকেই বিদ্যমান থাকা আর নতুন করে কোনো বিশেষ ব্যবস্থা সক্রিয় করার নির্দেশ দেওয়া এক বিষয় নয়। ফলে ইরানের প্রচলিত সামরিক কৌশলকে সাম্প্রতিক দাবির প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।
রাশিয়ার ‘ডেড হ্যান্ড’ ব্যবস্থার সাথে পার্থক্য
‘ডেড হ্যান্ড’ নামটি মূলত সোভিয়েত ইউনিয়নের শীতল যুদ্ধকালীন ‘পেরিমিটার’ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি পারমাণবিক হামলার পরও পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে তৈরি একটি ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত।
স্টোরিচেজের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, ইরানের কথিত সামরিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে এই নাম ব্যবহার বিভ্রান্তি তৈরি করছে। রাশিয়ার পারমাণবিক পাল্টা আঘাতব্যবস্থার সঙ্গে ইরানের বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরক্ষাকৌশলকে এক করে দেখার মতো প্রমাণ নেই।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলা নিয়ে উদ্বেগ
ইরানে সম্ভাব্য নতুন হামলা নিয়ে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমেও আলোচনা চলছে। ২২ অক্টোবর দ্য জেরুজালেম পোস্ট ইসরায়েলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কান নিউজের বরাতে জানায়, দেশটির নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ইরানে হামলার সময় নিয়ে সতর্কতা জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, ইসরায়েলের নির্বাচনের আগে হামলা চালানো হলে তা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। প্রতিবেদনে সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
২৩ অক্টোবর দ্য ইয়েশিভা ওয়ার্ল্ড ও ইসরায়েলি চ্যানেল ১২-এর সাংবাদিকদের বরাতে জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা নিয়ে তেহরানে উদ্বেগ রয়েছে। তবে ওই প্রতিবেদনেও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের আসন্ন হামলার বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
এসব প্রতিবেদন মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা চলার ইঙ্গিত দেয়। তবে এগুলো ইরানের ‘ডেড হ্যান্ড’ ব্যবস্থা সক্রিয় করার দাবিকে নিশ্চিত করে না।
সব মিলিয়ে, ইরানের বিকেন্দ্রীভূত সামরিক কাঠামো সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন থাকলেও ‘ডেড হ্যান্ড’ ব্যবস্থা নতুন করে সক্রিয় করা হয়েছে- এমন দাবির পক্ষে এখনো পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। ইরানি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টিকে অপ্রমাণিত দাবি হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।


