যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও সাবেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনারের বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব পালনের সময় বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত ব্যাংক হিসাব ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ওই হিসাবে শত শত কোটি ডলার লেনদেনের তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে অনুসন্ধানী সাংবাদিক ম্যাথু কোলের একটি নতুন বইয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। তবে অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন কুশনার ও তার আইনজীবী।
গত ২২ অক্টোবর মার্কিন সাময়িকী ভ্যানিটি ফেয়ার-এ কোলের আসন্ন বই প্রিন্সেস অ্যান্ড থিভস: জ্যারেড কুশনার অ্যান্ড মোহাম্মদ বিন জায়েদের সিক্রেট প্লট টু রিমেক দ্য মিডল ইস্ট থেকে একটি অংশ প্রকাশিত হয়। এতে দাবি করা হয়েছে, নেদারল্যান্ডসের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ২০১৭ সালের শেষ দিকে রুশ সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার (জিআরইউ) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক হ্যাকারের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের সূত্র ধরে কুশনারের আইফোনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সুযোগ পায়। পরে ২০১৮ সালে তার ফোনের পর্দায় দেখা কার্যক্রম নজরদারির আওতায় আসে বলে বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফোনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সময় গোয়েন্দারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফার্স্ট আবুধাবি ব্যাংকের একটি হিসাব ব্যবহার করতে দেখেন কুশনারকে। ‘আলফা’ নামে চিহ্নিত ওই হিসাবে প্রায় ৭৫ কোটি ডলার জমা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। অর্থের একটি অংশ আজারবাইজানের একটি ব্যাংকের মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছিল বলেও বইটিতে উল্লেখ রয়েছে।
কোলের বর্ণনা অনুযায়ী, হিসাবটি সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ওয়াতানি আল এমারাত ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। কুশনার ওই হিসাবের অনুমোদিত স্বাক্ষরকারীদের একজন ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে হিসাবটির সঙ্গে নিজের কোনো সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেছেন তিনি ও তার আইনজীবী।
সৌদি ও আমিরাতের নেতাদের সঙ্গে আর্থিক যোগসূত্রের অভিযোগ
বইটিতে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে কুশনারের কথিত আর্থিক যোগাযোগের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
কোলের দাবি, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কূটনৈতিক উদ্যোগে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে সৌদি ও আমিরাতের পক্ষ থেকে একাধিক ব্যাংক হিসাবে অর্থ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এসব হিসাবে কুশনারের প্রবেশাধিকার ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। বইটির বর্ণনা অনুযায়ী, বিভিন্ন হিসাবে মোট অন্তত ২০০ কোটি ডলারের অর্থের যোগসূত্র পাওয়া যায়।
প্রতিবেদনে ‘বিটা’ নামে আরেকটি হিসাবের কথাও বলা হয়েছে। এতে প্রায় ১০০ কোটি ডলার ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত একটি হিসাবে স্থানান্তরের অভিযোগ রয়েছে। এই অর্থের প্রকৃত মালিকানা, ব্যবহারের উদ্দেশ্য এবং কুশনারের ব্যক্তিগত স্বার্থের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী ছিল, তা নিয়ে বইটিতে বিভিন্ন সূত্রের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নামও ওই আর্থিক ব্যবস্থার প্রসঙ্গে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা ব্যাংক নথি বা লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশিত হয়নি। ফলে বইয়ে বর্ণিত আর্থিক যোগসূত্রগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই।
আইন লঙ্ঘনের প্রশ্ন কেন উঠছে?
কুশনার ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি দায়িত্বে থাকাকালে তার কোনো বিদেশি আর্থিক হিসাবের ওপর নিয়ন্ত্রণ বা স্বাক্ষর করার ক্ষমতা থাকলে, তা আর্থিক তথ্য প্রকাশের বিধি এবং অন্যান্য প্রযোজ্য আইনের আওতায় পড়তে পারে।
বইটির লেখকের বক্তব্য, কথিত হিসাবগুলোর বিষয়ে কুশনারের ভূমিকা এবং সেগুলো যথাযথভাবে প্রকাশ করা হয়েছিল কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিদেশি অর্থের বিনিময়ে সরকারি নীতিতে প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্য প্রমাণিত হলে ঘুষ, আর্থিক তথ্য গোপন কিংবা বিদেশি স্বার্থের প্রতিনিধিত্বসংক্রান্ত আইন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
তবে কোনো আইন লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা নির্ধারণের জন্য হিসাবের মালিকানা, অর্থের প্রকৃত উৎস, লেনদেনের উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। প্রকাশিত অভিযোগের ভিত্তিতে এখনই কুশনারকে অপরাধী বলার সুযোগ নেই।
অভিযোগকে ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’ বললেন কুশনার
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন কুশনার। ভ্যানিটি ফেয়ারে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছেন, লেখকের অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং এমন ঘটনা ঘটেনি।
তার আইনজীবীও অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের বক্তব্য, দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, অর্থ স্থানান্তরের নথি, হিসাব নম্বর কিংবা লেনদেনের তারিখের মতো যাচাইযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। অভিযোগের ভিত্তিতে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ।
অন্যদিকে, নেদারল্যান্ডসের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এ বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি। সংস্থাটি সাধারণত তাদের গোয়েন্দা কার্যক্রম, উৎস ও পদ্ধতি নিয়ে মন্তব্য করে না বলে ডাচ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, কুশনারের কথিত বিদেশি ব্যাংক হিসাব এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে আর্থিক যোগাযোগ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের প্রধান ভিত্তি একটি অনুসন্ধানী বইয়ে বর্ণিত গোয়েন্দা তথ্য ও বিভিন্ন সূত্রের বক্তব্য। সংশ্লিষ্ট পক্ষের অস্বীকৃতি এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা আর্থিক নথির অনুপস্থিতির কারণে বিষয়টি এখনো বিতর্কিত।


