ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধে পেন্টাগনের আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত সংখ্যার চেয়েও বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে। একই সাথে হংকংয়ে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের সংবেদনশীল যন্ত্রাংশ হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সংবেদনশীল প্রযুক্তি চীনের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা বিভাগের অভ্যন্তরীণ হতাহতের ডেটা অ্যাকাউন্টিংয়ের সাথে পরিচিত ৬ মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে যে, ইরান যুদ্ধে পেন্টাগনের প্রকাশ্য ডেটাবেজে থাকা ১৮ জনের পরিসংখ্যানের চেয়ে অন্তত ৪ থেকে ৫ জন বেশি সেনা মারা গেছেন।
পাঁচজন কর্মকর্তার মতে, সামরিক প্রাণহানির সংখ্যা অন্তত ২২ জন। ষষ্ঠ কর্মকর্তা এই সংখ্যাটিকে ২৩ বলে উল্লেখ করে জানান যে, অপ্রকাশিত এই মৃত্যুর সবকটি সরাসরি লড়াইয়ের সাথে যুক্ত না হলেও সংঘাতে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা মার্কিন সামরিক কর্মীদের অনেকেই এর অন্তর্ভুক্ত।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই অঞ্চলে তিনজন মার্কিন ঠিকাদারও নিহত হয়েছেন। তবে এই মৃত্যুর পরিস্থিতির বিষয়ে প্রতিবেদনে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি এবং নিহতদের পরিচয়ও স্পষ্ট করা হয়নি।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই প্রতিবেদন সরাসরি অস্বীকার করে এক্সে লিখেছেন, এটি অত্যন্ত ঘেন্নার এবং ভুয়া। এটি সম্পূর্ণ একটি মিথ্যা। ওয়াশিংটন পোস্টের জন্য লজ্জা—তারা এমনকি ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের চেয়েও খারাপ।
যুদ্ধের চড়া খরচ ও অস্ত্রের ভাণ্ডার হ্রাস
ইরান যুদ্ধের প্রভাব কেবল হতাহতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি তেলের দাম ও শেয়ারবাজারকেও প্রভাবিত করেছে। আইনপ্রণেতাদের কাছে পাঠানো নতুন এক অনুমান অনুযায়ী, গত ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মার্কিন সামরিক বাহিনীর খরচ দাঁড়িয়েছে ৪৩.৬ বিলিয়ন ডলারে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এটিই এই সংঘাতের সবচেয়ে হালনাগাদ খরচ। গত মঙ্গলবার প্রকাশিত এক কংগ্রেশনাল বাজেট অফিস প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল যে, ১ আগস্ট পর্যন্ত যুদ্ধের খরচ ছিল ৩৮ বিলিয়ন ডলার এবং সংঘাতের তীব্রতার ওপর নির্ভর করে প্রতি মাসে এর পেছনে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার খরচ অব্যাহত থাকবে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস কর্তৃক দেখা এবং ব্লুমবার্গ ও পাঞ্চবোল নিউজ কর্তৃক পূর্বে প্রকাশিত নতুন হিসাবটিতে মার্কিন বাহিনী কর্তৃক ব্যয়বহুল যুদ্ধাস্ত্রের অব্যাহত ব্যবহারের চিত্রও ফুটে উঠেছে। সিবিও প্রতিবেদনে যেখানে অস্ত্রের খরচ ২১.৭ বিলিয়ন ডলার দেখানো হয়েছিল, এক মাসেরও কম সময়ে তা ৬ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বেড়ে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের জরিপে ২৮.১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বর্তমান এই ব্যয় প্রাক্কলন এমন এক সময়ে সামনে এসেছে যখন ট্রাম্প প্রশাসন ঐতিহাসিক ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের সামরিক বাজেট প্রস্তাবের জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এছাড়া হোয়াইট হাউস কংগ্রেসের কাছে ৯৫ বিলিয়ন ডলারের একটি প্যাকেজ অনুমোদনের অনুরোধ জানিয়েছে, যা ইরান যুদ্ধ এবং অন্যান্য অগ্রাধিকার খাতগুলোতে অর্থায়ন করবে।
টেক্সাসের অস্টিনে নৌবাহিনীর জন্য ড্রোন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘সারোনিক টেকনোলজিস’-এ শুক্রবার এক বক্তৃতায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই বাজেট পাসের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আমাদের দেশকে শক্তিশালী রাখতে এবং সারোনিকের মতো আমেরিকান প্রস্তুতকারকদের জন্য ভালো ও উচ্চ বেতনের চাকরি নিশ্চিত করতে বর্তমান বাজেটে আমরা ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রজন্মভিত্তিক বিনিয়োগের দাবি জানাচ্ছি।
এদিকে, ডেমোক্র্যাট সেনেটররা ইরান যুদ্ধের খরচের সম্পূর্ণ হিসাব দেওয়ার জন্য হেগসেথকে চাপ দিচ্ছেন। পেন্টাগন প্রধানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে আইনপ্রণেতারা মার্কিন সেনা হতাহত ও করদাতাদের অর্থ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও প্রতিরক্ষা বিভাগ কর্তৃক কংগ্রেস ও আমেরিকান জনসাধারণের কাছ থেকে মৌলিক বাজেটের তথ্য গোপন করার সমালোচনা করেছেন। এই সপ্তাহে কংগ্রেসের কাছে দেওয়া পেন্টাগনের এক পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত বিবরণীতে যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও ঘাঁটি পরিচালনার খরচ ছাড়াও যন্ত্রাংশের ক্ষতি এবং ট্রুপস বা সেনাসদস্যদের চিকিৎসা সহায়তার খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যেগুলোতে ইরান ব্যালটিক মিসাইল ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে।
পেন্টাগন ইন্সপেক্টর জেনারেলের গত সোমবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান এবং জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে শত শত ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
কংগ্রেসের নতুন প্রতিবেদনে দেখা যায়, সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে যুদ্ধাস্ত্রের খরচ, যা সব খরচের অর্ধেকেরও বেশি। যে উন্নত অস্ত্রগুলোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি রয়েছে, তা হলো প্রতিরক্ষামূলক মিসাইল ইন্টারসেপ্টর, যেমন—আর্মির প্যাট্রিয়ট এবং থ্যাড সিস্টেমের মাধ্যমে উৎক্ষিপ্ত ইন্টারসেপ্টরগুলো। এই অস্ত্রভাণ্ডার কমে যাওয়ায় ইউরোপেও অ্যালার্ম বা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মার্কিন ও ন্যাটো কর্মকর্তারা এপিকে জানিয়েছেন যে মিসাইল ইন্টারসেপ্টরের ক্ষেত্রে সংকটের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের সাথে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় সৌদি আরবও ইন্টারসেপ্টরের সংকটে পড়েছে এবং আঞ্চলিক ও পশ্চিমা মিত্রদের সহায়তা চেয়েছে।


