...|...|...

বিশেষ প্রতিবেদন

ডিএসসিসির নেইবারহুড প্রকল্প

৮৮০ কোটির স্বপ্ন, ৭ বছরেও অন্ধকারে

বাজেট কাটছাঁটে নেমেছে ৫০৪ কোটিতে, তবুও শেষ হয়নি কাজ

নাজমুল হাসান রাজ
প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৮:১৫ | আপডেট: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:৩৯
Shares
৮৮০ কোটির স্বপ্ন, ৭ বছরেও অন্ধকারে

৮৮০ কোটি টাকার স্বপ্ন নিয়ে সাত বছর আগে শুরু হয়েছিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রকল্প’। কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, সূত্রাপুর-নয়াবাজার-গুলিস্তান এবং খিলগাঁও-মুগদা-বাসাবোর নগরচিত্র বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল এতে। আধুনিক সড়ক, প্রশস্ত ফুটপাত, দৃষ্টিনন্দন খেলার মাঠ, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ঝকঝকে স্ট্রিট লাইটের সেই পরিকল্পনা এখনও আলোর মুখ দেখেনি। উল্টো কাটছাঁট করে প্রকল্পের ব্যয় নামানো হয়েছে ৫০৪ কোটি টাকায়। তবুও শেষ হয়নি কাজ।

আইএমইডির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন এবং টাইমস টুডের সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা ও অপূর্ণতার চিত্র।

তথ্য বলছে, ২০১৯ সালের মার্চে বিশ্বব্যাংকের ঋণসহায়তায় হাতে নেওয়া হয় ‘ঢাকা সিটি নেইবারহুড আপগ্রেডিং প্রজেক্ট’। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়ন, নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা এবং গণপরিবহন ও পথচারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। পাশাপাশি খোলা জায়গা বাড়ানো ও পরিবেশগত উন্নয়নের পরিকল্পনাও ছিল এতে। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮৮০ কোটি টাকা। তবে তিন দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও কাজ শেষ করতে পারেনি বাস্তবায়নকারী সংস্থা। একপর্যায়ে পরিকল্পনা থেকে বাদ দেওয়া হয় দুটি বড় অবকাঠামো। ফলে প্রায় ৪৩ শতাংশ কমিয়ে প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৫০৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। কিন্তু বাজেট ছোট হলেও শেষ হয়নি মাঠপর্যায়ের কাজ। এর মধ্যেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, দাপ্তরিক পরিচালনা এবং পরামর্শক সেবায় ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬৮ কোটি টাকা।

আইএমইডির বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকল্পে সুষম কোনো অগ্রগতি হয়নি। রাস্তা নির্মাণের কাজ শতভাগ শেষ হলেও পুকুর উন্নয়নে অগ্রগতি ৯৮ শতাংশ এবং ঐতিহাসিক লালকুঠিসহ ঐতিহ্যবাহী ভবন সংস্কারে ৮৩ শতাংশ। কিন্তু নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কাজগুলোতেই সবচেয়ে বড় ধীরগতি- যেমন পয়ঃনিষ্কাশন লাইন নির্মাণে অগ্রগতি মাত্র ৫৬ শতাংশ। 

ডিএসসিসির প্রকৌশল বিভাগের তথ্য বলছে, প্রকল্পের আওতায় কয়েকটি কমিউনিটি সেন্টার সংস্কার, চারটি বর্জ্য স্থানান্তরকেন্দ্র নির্মাণ, দুটি খেলার মাঠ উন্নয়ন এবং কিছু সড়ক ও নর্দমার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। শেষ হয়েছে বাসাবো বালুর মাঠ, পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক লালকুঠি ও ঢাকা মহানগর নাট্যমঞ্চসহ আরও কয়েকটি স্থাপনার সংস্কারকাজ। তবে সামগ্রিক বাস্তবায়নের চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়। পরিকল্পনায় থাকা নয়টি বর্জ্য স্থানান্তরকেন্দ্রের মধ্যে নির্মিত হয়েছে মাত্র চারটি; এ খাতে অগ্রগতি প্রায় ৩০ শতাংশ। স্ট্রিট লাইট স্থাপন, বৃক্ষরোপণ, পার্ক উন্নয়ন এবং নতুন আটটি গণশৌচাগার নির্মাণেও নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।

প্রকল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি উদ্যোগ ছিল কামরাঙ্গীরচরের লোহারপুল পুনর্নির্মাণ এবং শাহজাহানপুর ঝিলকে আধুনিক বিনোদনকেন্দ্রে রূপান্তর। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের এপ্রিলের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও কাজ দুটির জন্য ঠিকাদার নিয়োগ করতে পারেনি ডিএসসিসি। শেষ পর্যন্ত প্রায় ২৬০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই দুটি উদ্যোগ মূল প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হয়। এর ফলে প্রকল্পের ব্যয় ৮৮০ কোটি টাকা থেকে কমে দাঁড়ায় ৫০৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকায়।

আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংক তাদের ২০২৪ সালের মূল্যায়ন প্রতিবেদনে ডিএসসিসির প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে পুরোপুরি ‘অসন্তোষজনক’ আখ্যা দেয়। সংস্থাটি জানায়, অনুমোদনের প্রায় পাঁচ বছর পরও মোট ঋণের মাত্র ১৯ দশমিক ৯১ শতাংশ অর্থ ছাড় করা সম্ভব হয়েছিল। পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে ক্রয়প্রক্রিয়া ও আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে চিহ্নিত করা হয় ‘মধ্যম মাত্রায় অসন্তোষজনক’ হিসেবে।

আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্পের প্রশাসনিক তদারকিতে ছিল মারাত্মক গাফিলতি। নিয়ম অনুযায়ী নিয়মিত সভা হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৩৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ সভা করেছে। প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটির (পিএসসি) অবস্থা আরও করুণ- সভার হার মাত্র ২১ শতাংশ। এই নজরদারি-ঘাটতির খেসারত হিসেবে ছয়টি অর্থবছরে মোট ২৫টি গুরুতর অডিট আপত্তি উঠেছে, যার মধ্যে ১৩টি এখনও অমীমাংসিত। এসব আপত্তিতে আটকে আছে জনগণের প্রায় ১৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই মেগা প্রকল্প

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিপুল ব্যয়ের প্রকল্পটি গ্রহণের আগে কোনো কারিগরি সমীক্ষা বা সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। অনুমাননির্ভর পরিকল্পনা ও নকশার কারণে বাস্তবায়ন পর্যায়ে জমিসংক্রান্ত জটিলতা, সরু সড়কে কাজের প্রতিবন্ধকতা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের চাহিদার সঙ্গে প্রকল্পের পরিকল্পনার অসামঞ্জস্য দেখা দেয়। পরে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে একাধিকবার নকশা পরিবর্তন করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। এর সঙ্গে করোনা মহামারি এবং ঠিকাদার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা যুক্ত হয়ে প্রকল্পের অগ্রগতি আরও মন্থর করে দেয়।

প্রকল্পের মূল কাজ থমকে থাকলেও পরামর্শক সেবা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক খাতে ইতিমধ্যে প্রায় ৬৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অন্যদিকে বাস্তবায়ন করতে না পেরে প্রায় ২৬০ কোটি টাকার দুটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প থেকে বাদ দিতে হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বিপরীত চিত্র প্রকল্পের পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় গুরুতর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। পর্যাপ্ত সমীক্ষা ছাড়া অনুমাননির্ভর প্রকল্প গ্রহণ কেবল পরিকল্পনাগত ত্রুটি নয়, এতে জনসম্পদের অপচয়ের ঝুঁকিও তৈরি হয়। নির্দিষ্ট সময় ও বাজেট সামনে রেখে প্রকল্প শুরু হলেও বারবার মেয়াদ বাড়ানো এখন যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আর এই দীর্ঘসূত্রতার সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে নগরবাসীকেই- যাদের জীবনমান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সাত বছর আগে প্রকল্পটি শুরু হয়েছিল।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতার চূড়ান্ত খেসারত দিতে হয় সাধারণ মানুষকেই। কারণ প্রকল্প বাস্তবায়নে নেওয়া ঋণের কিস্তি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেই পরিশোধ করতে হয়, আর রাষ্ট্রীয় অর্থের মূল উৎস জনগণের করের টাকা। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে একদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয় বাড়তে থাকে, অন্যদিকে অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে প্রয়োজন হয় নতুন বরাদ্দের। ফলে একটি প্রকল্পেই বারবার ব্যয় হয় জনগণের অর্থ। অথচ প্রত্যাশিত সেবা থেকে তারা বঞ্চিত থাকে বছরের পর বছর।

প্রকল্পটির এমন পরিণতির জন্য শুরুতেই যথাযথ সমীক্ষা না করাকে দায়ী করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান। তিনি টাইমস টুডেকে বলেন, বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই না করে অনুমাননির্ভর পরিকল্পনার ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ করাই ছিল মূল ভুল। তার মতে, এটি শুধু পরিকল্পনাগত দুর্বলতা নয়; জনসম্পদেরও সুস্পষ্ট অপচয়।

জবাবদিহিতার ঘাটতির বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ। তিনি মনে করেন, ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও অযৌক্তিক বিলম্বের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা না হলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি চলতেই থাকবে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও একই- প্রকল্প গ্রহণের আগে বাস্তবসম্মত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা এবং প্রতিটি পর্যায়ে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় মেয়াদ বৃদ্ধি, ব্যয় বাড়ানো এবং অসমাপ্ত কাজের এই দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না। 

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পুর) ও ডিসিএনইউপি প্রকল্পের পরিচালক রাজিব খাদেম টাইমস টুডেকে বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পের পরিধি কমানো হয়েছিল। চলমান কাজ দ্রুত শেষ করতে প্রকল্পের মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ৮৩ শতাংশ ভৌত অগ্রগতি হয়েছে।

বাদ পড়া বা অসমাপ্ত কাজের বিষয়ে তিনি বলেন, সেগুলো সরকারি অর্থায়ন (জিওবি) কিংবা অন্য কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে। এক্ষেত্রে আরইউটিডিপি প্রকল্পের আওতায় কাজগুলো বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও রয়েছে বলে জানান তিনি। 

খিলগাঁওয়ের বাসাবো বালুর মাঠ সংস্কারসহ চলমান কাজগুলো শেষ হলে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের হাঁটাচলার সুযোগ বাড়বে। তবে প্রকল্পের আওতায় নির্মিত অবকাঠামো ভবিষ্যতে কারা, কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করবে- সে বিষয়ে এখনও কোনো সুস্পষ্ট নীতিমালা তৈরি হয়নি। ফলে প্রকল্প শেষ হলেও এসব স্থাপনার স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে হলে এখনই সুনির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক ক্র্যাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে নগরজীবন বদলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে শুরু হওয়া সাড়ে সাত বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা শেষ পর্যন্ত আরেকটি ব্যর্থ প্রকল্পের নজির হয়ে থাকবে।