...|...|...

রাজনীতি

আকস্মিক নয়

হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়া ছিল পূর্বপরিকল্পিত

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ আগস্ট ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:২৮ | আপডেট: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ২:৩৮
Shares
হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়া ছিল পূর্বপরিকল্পিত

ছবি: সংগৃহীত

হাসিনার ৫ আগস্ট ভারত চলে যাওয়া নিয়ে নতুন দাবি সামনে এসেছে। শেখ হাসিনার দেশত্যাগ হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং এটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল—এমন তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

একটি বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল যে, তিনি হয়তো আকস্মিকভাবে দেশ ছেড়েছেন। তবে স্টার নিউজের হাতে আসা কিছু তথ্য ও প্রমাণে দাবি করা হয়েছে, ভারত যাওয়ার সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নেওয়া হয়েছিল।

তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদের সাথে কথোপকথনের একটি অডিওতে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, “আমি কিন্তু ঠিক করছিলাম, আজকে যাব রাষ্ট্রপতির কাছে। সব লিখে ঠিক করছিলাম। এভাবে মানুষ মেরে থাকার কোনো মানে হয় না। আর্মি চিফকে বলছি। সে ২৪ ঘণ্টা সময় নিয়েছে। আর্মি চিফ চেষ্টা করুক, কিছু করতে।”

প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ৪ আগস্ট শেখ হাসিনার অবস্থানে পরিবর্তন আসে। তিনি দলীয় এক নেতাকে জানান, সেনাপ্রধান ২৪ ঘণ্টা সময় চেয়েছেন। একই সাথে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার ইঙ্গিতও দেন তিনি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ফোনের কললিস্ট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৪ আগস্টের উত্তাল পরিস্থিতির পর রাতে মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া এবং সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার মধ্যে দীর্ঘ সময় কথোপকথন হয়।

এরপর ৫ আগস্ট ভোর ৫টা থেকে শেখ হাসিনার ফোনালাপ শুরু হয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ওইদিন তিনি তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাসান মাহমুদ, ব্যবসায়ী নেতা সালমান এফ রহমানসহ কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির সাথে কথা বলেন।

এ ছাড়া দেশ ছাড়ার আগে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা এবং পারিবারিক ফোন থেকেও বেশ কয়েকজনের সাথে যোগাযোগ করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে একজন সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একাধিকবার কথা বলার তথ্যও উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমানে ওঠার পরও শেখ হাসিনা ওই সামরিক কর্মকর্তার পাশাপাশি নিজের মেয়ে সায়মা ওয়াজেদের সাথে কথা বলেন। পরে সন্ধ্যায় ভারতে পৌঁছে ভারতীয় তিনটি নম্বরে যোগাযোগ করেন।

তথ্য-প্রযুক্তিবিদ ও অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলি তানভীর হাসান জোহা বলেন, ৩ আগস্ট থেকেই কয়েকটি নম্বর থেকে ভারতের সাথে যোগাযোগ শুরু হয়েছিল। তার দাবি, এসব নম্বর শেখ হাসিনার নিজস্ব না হলেও ভারতের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। তিনি বলেন, নির্দিষ্ট কিছু নম্বর শনাক্ত করা হয়েছে এবং ওই কথোপকথন রহস্যজনকভাবে অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়নি। বিষয়টি নিয়ে অধিকতর তদন্তের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান বাহিনীর এমআই-১৭ মডেলের হেলিকপ্টারের কল সাইন ছিল ‘লিওপার্ড ওয়ান জিরো থ্রি’। এটি আগারগাঁও মাঠ থেকে সরাসরি কুর্মিটোলা বিমানঘাঁটিতে যায়। সেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত অবস্থায় ছিল সি-১৩০জে হারকিউলিস মডেলের উড়োজাহাজ, যার কল সাইন ছিল এজেএক্স ১৪১৩।

প্রতিবেদনের দাবি অনুযায়ী, বিমানটি উড্ডয়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় মাত্র দুই মিনিট সময় নেয়। বিমান বাহিনীর ভাষায় এটিকে ‘স্ক্রাম্বল’ বলা হয়—যেখানে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত কোনো বিমান বা হেলিকপ্টার উড্ডয়ন করা হয়।

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান আকাশে ওঠার পর কিছু সময়ের জন্য ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে দেওয়া হয়, যাতে সেটিকে ট্র্যাক করা না যায়। পরে ভারতের সীমান্তে পৌঁছানোর পর ট্রান্সপন্ডার চালু করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দিল্লিগামী কোনো ফ্লাইট সাধারণত রাজশাহী হয়ে গেলেও এই বিমান সাতক্ষীরার ওপর দিয়ে যায়, যাতে দ্রুত বাংলাদেশের আকাশসীমা অতিক্রম করা যায়।

রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কর্নেল (অব.) আব্দুল হক বলেন, ভারতের নির্দেশে বিমান পাঠানো হয়েছে এবং এর সাথে নিরাপত্তা বাহিনী ও বিমানবাহিনীর কিছু কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।

বিশ্লেষকদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতসংখ্যক সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা এবং শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোনো ধরনের কাস্টমস, ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্স, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র, ডিপ্লোমেটিক ক্লিয়ারেন্স নাম্বার বা ডিসিএন কোড ছাড়া রাষ্ট্রীয় উড়োজাহাজ কীভাবে ভারতে গেল, তা তদন্তের বিষয়।

কর্নেল (অব.) আব্দুল হক বলেন, ৫ আগস্টের ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন, তা তদন্তের জন্য আদালতের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করা যেত।

আইনজ্ঞদের মতে, ৫ আগস্ট পরিকল্পিত বিদেশ যাত্রার অভিযোগে কেউ মামলা করলে কিংবা উচ্চ আদালত বা অপরাধ ট্রাইব্যুনালের শরণাপন্ন হলে এ ঘটনার আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হতে পারে।

সূত্র: স্টার নিউজ।