...|...|...

সংবাদ

অপহরণ করে হত্যা, এআই ভিডিওতে জীবিত দেখিয়ে ৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়

রিপন ইসলাম শেখ, নীলফামারী
প্রকাশ: ৬ অক্টোবর ২০২৬, রাত ৯:০১ | আপডেট: ৬ অক্টোবর ২০২৬, রাত ৯:০২
Shares
অপহরণ করে হত্যা, এআই ভিডিওতে জীবিত দেখিয়ে ৪ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায়

নিহত রাকিব ইসলামের (১৭) লাশ উদ্ধার করা হচ্ছে। ছবি: টাইমস টুডে

ঢাকায় নিজ কক্ষে রাকিব ইসলাম (১৭) নামে এক কিশোরকে হত্যার পর তার লাশ কার্টনে ভরে নীলফামারীর ডিমলায় এনে মাটিচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আব্দুল্লাহ মামুন নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে। হত্যার পর ঢাকায় ফিরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাকিব জীবিত রয়েছে-এমন ভিডিও তৈরি করে তার পরিবারের কাছে পাঠিয়ে মুক্তিপণ দাবি করার অভিযোগও রয়েছে। পরে মামুনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ডিমলার বালাপাড়া ইউনিয়নের ছাতনাই বালাপাড়া এলাকা থেকে রাকিবের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ।

নিহত রাকিব ইসলাম টাঙ্গাইলের গোপালপুর থানার হামনগর ইউনিয়নের উদ্যমপুর গ্রামের খাদেমুল ইসলামের দ্বিতীয় ছেলে। অভিযুক্ত আব্দুল্লাহ মামুন নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ছাতনাই ইউনিয়নের বালাপাড়া এলাকার আফসার আলীর ছেলে।

রাকিবের ভাই জহুরুল ইসলাম জীবন জানান, রাকিবকে জীবিত ফেরত দেওয়ার কথা বলে আব্দুল্লাহ মামুন তাদের কাছে কয়েক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবার চার লাখ টাকা দিলেও রাকিবকে ফেরত দেওয়া হয়নি। পরে বিষয়টি জানিয়ে রাকিবের পরিবার ঢাকার সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে।

তদন্তের একপর্যায়ে গত ৩ অক্টোবর ঢাকায় অভিযান চালিয়ে আব্দুল্লাহ মামুনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি সামনে আসে। মামুনকে গ্রেফতারের পর রাকিবের পরিবার ঢাকার কাফরুল থানায় মামলা দায়ের করে। মামলাটির ডিএমপি মামলা নম্বর-০৫, তারিখ ৫ অক্টোবর ২০২৬।

পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামুনকে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের ছাতনাই বালাপাড়া গ্রামে নেওয়া হয়। তার দেখানো স্থান অনুযায়ী রাকিবের লাশ মাটিচাপা দেওয়ার স্থান শনাক্ত করা হয়। পরে ৬ অক্টোবর আদালতের নির্দেশে দুপুর ১টার দিকে ওই স্থান থেকে রাকিবের লাশ উদ্ধার করে ডিমলা থানায় নেওয়া হয়।

ঘটনার সূত্রে জানা যায়, ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার শুক্রাবাদে রাকিবের সাথে আব্দুল্লাহ মামুনের পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মামুনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকার একটি কক্ষে দুজনের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। একপর্যায়ে রাকিবকে হত্যা করা হয় বলে মামুন পুলিশকে জানিয়েছে।

মামুনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হত্যার পর রাকিবের লাশ একটি কার্টনে ভরে বাসা থেকে বের হয় সে। পরে ঢাকার কল্যাণপুরে গিয়ে রংপুরগামী একটি গাড়িতে ওঠে। যাত্রাপথে কার্টনের ভেতরে কী আছে জানতে চাইলে সেখানে ইলিশ মাছ রয়েছে বলে জানায় মামুন। রংপুরে পৌঁছে লোকাল বাসে করে ডিমলায় আসে সে। পরে লাশটি নিজ বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বসতবাড়ির দক্ষিণ পাশে কার্টনসহ মাটিচাপা দিয়ে রাখে বলে তার দেওয়া তথ্যে জানা গেছে।

জিজ্ঞাসাবাদে মামুন রতন (২৬) ও নুর জামাল (২৫) নামে আরও দুই ব্যক্তির জড়িত থাকার কথা জানিয়েছে বলেও জানা গেছে। তবে ওই দুই ব্যক্তির সম্পৃক্ততা কী পর্যায়ে এবং তারা কীভাবে ঘটনায় জড়িত, তা এখনো তদন্তাধীন।

এদিকে, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাকিবকে জীবিত দেখিয়ে ভিডিও তৈরি এবং সেই ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে মুক্তিপণ দাবির অভিযোগ ঘটনাটিকে আরও চাঞ্চল্যকর করে তুলেছে। পরিবারের দাবি, ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় তারা চার লাখ টাকা দিলেও শেষ পর্যন্ত রাকিবকে ফিরে পাননি।

লাশ উদ্ধারের পর রাকিবের পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় থাকা পরিবার এখন পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।

ডিমলা থানার অফিসার ইনচার্জ আশরাফুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় ঢাকা ডিএমপির কাফরুল থানায় একটি মামলা হয়েছে। আসামিকে গ্রেফতার করে ডিমলা থানায় নিয়ে এসে লাশ উত্তোলনে সহযোগিতা চাওয়া হয়। ডিমলা থানা পুলিশ লাশ উত্তোলনে সহযোগিতা করেছে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ নীলফামারী সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, মুক্তিপণের অর্থ লেনদেন, এআই ভিডিও তৈরির বিষয়টি এবং রতন ও নুর জামালসহ অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না-এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতির সাথে সাথে ঘটনায় আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।