বর্তমান সময়ে বিশ্বের দেশে দেশে নানা ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে বিশ্বব্যাপীই, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অনেক ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান সত্যের আড়ালে গোয়েন্দা সংস্থা, বিদেশি শক্তি বা আধিপত্যবাদীদের হয়ে কাজ করে- যেটা অনেক সময় সাধারণ মানুষ বুঝেই উঠতে পারে না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল শরীফ ওসমান হাদী হত্যা, যে ঘটনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের সঙ্গে জড়িত। ওই ঘটনার পেছনেও এমনই ফ্যাক্টচেকের নামে সত্যকে আড়াল করার চেষ্টা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
“ঢাকার কোনো এক অভিজাত এলাকার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত, হাই-টেক অফিস রুম। ল্যাপটপের স্ক্রিনে কিছু তরুণ চোখ আটকে আছে। তারা নিজেদের দাবি করে 'ফ্যাক্ট-চেকার' বা 'ওসিন্ট' (OSINT - Open Source Intelligence) অ্যানালিস্ট হিসেবে।
আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এরা সমাজের অত্যন্ত উপকারী একটি অংশ, যারা ফেক নিউজ বা ভুয়া খবরের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। কিন্তু এই আধুনিক ফ্যাক্ট-চেকারদের সাথে ব্রিটিশ আমলের ওই সিগারেট বিক্রেতাদের এক অদ্ভুত এবং ভয়ংকর মিল রয়েছে। ব্রিটিশরা যেমন ফ্রি সিগারেট দিয়ে ট্রাস্ট বা বিশ্বাস অর্জন করেছিল, এরাও ঠিক তেমনি কিছু 'দুর্দান্ত' ফ্যাক্ট চেক দিয়ে আপনার আমার বিশ্বাস অর্জন করছে। আর সেই বিশ্বাস অর্জনের পরই শুরু হচ্ছে আসল খেলা!
আমাদের দেশের এই তথাকথিত ফ্যাক্ট-চেক পেজগুলো কীভাবে কাজ করে?
তারা শুরুতে অত্যন্ত দুর্দান্ত, নিখুঁত এবং প্রশংসনীয় কিছু ফ্যাক্ট চেক করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া কোনো সস্তা গুজব, কোনো ভুয়া ছবি বা ছোটখাটো রাজনৈতিক ব্লেম-গেম নিয়ে তারা অত্যন্ত চমৎকার বিশ্লেষণ হাজির করে। সাধারণ মানুষ যখন দেখে যে এই পেজটি তো খুব লজিক্যাল কথা বলে, এরা তো সত্য তুলে ধরে...তখন তারা অবচেতনভাবেই ওই পেজটির প্রতি এক ধরনের অন্ধ বিশ্বাস বা 'ব্লাইন্ড ট্রাস্ট' গড়ে তোলে। এটিই হলো সেই ফ্রি সিগারেটের প্রাথমিক পর্যায়।
যখন তারা আপনার ট্রাস্ট গেইন করে ফেলল, যখন তাদের পেজে ডিসেন্ট ফলোয়ার হয়ে গেল, তখন শুরু হয় আসল মিশন। তারা হয়তো ১০০টি খবরের ফ্যাক্ট চেক করবে। এর মধ্যে ৯৫টি হবে সম্পূর্ণ সত্য এবং নিরপেক্ষ, যা দিয়ে তারা তাদের 'সুশীল' এবং 'নিরপেক্ষ' ইমেজটি ধরে রাখবে। কিন্তু বাকি যে ৫টি ফ্যাক্ট চেক তারা করবে, সেখানে লুকিয়ে থাকবে কয়েক হাজার কোটি টাকার দেশি-বিদেশি স্বার্থ!
এই ৫টি খবরে তারা অত্যন্ত সুকৌশলে বিভিন্ন দেশি-বিদেশি শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করবে। তারা এমনভাবে সেই 'সত্য'টি উপস্থাপন করবে, যা আসলে সত্য নয়, বরং সত্যের মোড়কে ঢাকা একটি প্রোপাগান্ডা। আর সাধারণ মানুষ, যারা ওই ৯৫টি খবরের কারণে তাদের অন্ধভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, তারা এই ৫টি ভয়ংকর খবরকেও বিনা প্রশ্নে সত্য বলে মেনে নেবে। এটি কোনো সাংবাদিকতা নয়; এটি হলো মনস্তাত্ত্বিক বা ফিফথ-জেনারেশন ওয়ারফেয়ারের এক নিখুঁত অস্ত্র।
এই ফ্যাক্ট-চেকাররা বা 'ওসিন্ট' পেজগুলো আসলে কাদের হয়ে কাজ করে? তারা কি সত্যিই স্বাধীন?
আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো (যেমন...সাউথ ব্লকের 'র' বা পশ্চিমা ইন্টেলিজেন্স) যখন অন্য কোনো দেশে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়, তখন তারা সরাসরি নিজেদের নাম ব্যবহার করে না। তারা সেই দেশে কিছু 'বি-টিম' বা 'সি-টিম' তৈরি করে। এই টিমগুলো মূলত পরিচালিত হয় বিদেশি ফান্ডিংয়ে।
আমাদের দেশেও এমন বেশ কয়েকটি ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের ফান্ডিংয়ের উৎস খুঁজলে দেখা যাবে, কোনো না কোনো বিদেশি দূতাবাস, আন্তর্জাতিক এনজিও বা ভিনদেশি থিংকট্যাংক তাদের টাকা দিচ্ছে। যে বিদেশি সংস্থা তাদের কোটি টাকা ফান্ড দিচ্ছে, তারা কি কেবল বাংলাদেশের মানুষের 'সত্য' জানার অধিকার নিশ্চিত করার জন্য এত দরদি হয়ে উঠেছে?
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে ফ্রি লাঞ্চ বলে কিছু নেই!
এই ফান্ডিংয়ের পেছনের গডফাদাররা আসলে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি 'স্লিপার সেল' হিসেবে তৈরি করে রাখে। যখনই কোনো ভূ-রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়, যখনই কোনো পরাশক্তির স্বার্থ হুমকিতে পড়ে, তখন এই ফ্যাক্ট-চেকারদের ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট বয়ান বা 'ন্যারেটিভ' মানুষের মগজে পুশ করা হয়। এরা তখন আর ফ্যাক্ট-চেকার থাকে না, এরা পরিণত হয় বিদেশি ইন্টেলিজেন্সের একটি প্রক্সি বা ভাড়াতে বাহিনীতে।
এই পেজগুলো যে কতটা ভয়ংকর এবং এদের শেকড় যে কতটা গভীরে, তার একটি জ্বলন্ত প্রমাণ আমরা দেখেছি ওসমান হাদীর হত্যাকাণ্ডের সময়।
ওসমান হাদীর মতো একজন হাই-প্রোফাইল ব্যক্তির হত্যাকাণ্ডের পর পুরো দেশ যখন স্তব্ধ, তখন সেই হত্যাকাণ্ডের সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে সবচেয়ে বড় খেলাটি খেলেছিল এই তথাকথিত ফ্যাক্ট-চেকাররা। আপনারা কি কখনো নিজেদের প্রশ্ন করে দেখেছেন...দেশের বাঘা বাঘা গোয়েন্দা সংস্থা, এনএসআই, ডিজিএফআই বা পুলিশের ডিবি যখন ওই সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছিল না, তখন এই কয়েকটি ল্যাপটপ নিয়ে বসা ফ্যাক্ট-চেক পেজগুলো কীভাবে এত দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে সেটি বিশ্লেষণ করে ফেলল?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল...তারা ওই স্পর্শকাতর ফুটেজগুলো বিশ্লেষণ করার অনুমতি বা এক্সেস পেল কীভাবে? একটি দেশের জাতীয় নিরাপত্তার সাথে জড়িত এমন হাই-প্রোফাইল মার্ডার কেসের এভিডেন্স যখন রাষ্ট্রের আগেই একটি বেসরকারি বা বিদেশি ফান্ডিংয়ে চালিত ফ্যাক্ট-চেক পেজের হাতে চলে যায়, তখন বুঝতে হবে তারা রাষ্ট্রের ভেতরে একটি অদৃশ্য সমান্তরাল সরকার বা 'ডিপ স্টেট' এসেট।
তারা হয়তো ওই ফুটেজগুলো এমনভাবে ম্যানিপুলেট বা বিশ্লেষণ করেছে, যা তাদের বিদেশি প্রভুদের তৈরি করা স্ক্রিপ্টের সাথে মিলে যায়। সাধারণ মানুষ ভেবেছে এরা তো খুব স্মার্ট, কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি যে এদের এই স্মার্টনেসের পেছনে কাজ করছে কোনো পরাশক্তির শক্তিশালী সাইবার ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রত্যক্ষ মদদ এবং ইনফরমেশন অ্যাক্সেস!
একবিংশ শতাব্দীতে কোনো দেশকে দখল করতে হলে সেখানে সেনাবাহিনী বা ট্যাংক পাঠানোর প্রয়োজন হয় না। সেই দেশের মানুষের মগজ দখল করতে পারলেই পুরো দেশ দখল হয়ে যায়। আর এই মগজ দখলের আধুনিক এবং সবচেয়ে নিখুঁত হাতিয়ার হলো 'ইনফরমেশন মনোপলি' বা তথ্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ।
তারা এমন এক অদৃশ্য সেন্সরশিপ বা কণ্ঠরোধের জাল তৈরি করেছে, যা স্বৈরাচারের বন্দুকের চেয়েও ভয়ংকর। কারণ বন্দুকের গুলি দেখলে মানুষ প্রতিবাদ করে, কিন্তু এই ফ্যাক্ট-চেকের নামে যখন মানুষের মগজ ধোলাই করা হয়, তখন মানুষ হাসিমুখে সেই পরাধীনতাকে মেনে নেয়। এই ফ্যাক্ট-চেকাররা হলো আমাদের সমাজের ভেতরে থাকা সেই 'ট্রোজান হর্স' বা কাঠের ঘোড়া, যাদের পেটের ভেতরে লুকিয়ে আছে ভিনদেশি ইন্টেলিজেন্সের বিষাক্ত ছায়া।’’

