বর্ষা এলেই নতুন করে উদ্বেগ বাড়ায় ডেঙ্গু। জ্বর, শরীরব্যথা আর হাসপাতালে রোগীর ভিড়—প্রতিবছরই এমন চিত্র দেখা যায় দেশের বিভিন্ন স্থানে। তবে ডেঙ্গু কোনো নতুন রোগ নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিশ্বের নানা অঞ্চলে ডেঙ্গুর মতো রোগের প্রাদুর্ভাবের ইতিহাস পাওয়া যায়। সময়ের সাথে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অগ্রগতি হলেও ডেঙ্গু এখনো জনস্বাস্থ্যের বড় চ্যালেঞ্জ।
শতাব্দীপ্রাচীন রোগের ইতিহাস
ডেঙ্গুর মতো উপসর্গযুক্ত অসুস্থতার প্রাচীনতম বর্ণনাগুলোর একটি পাওয়া যায় চীনের একটি চিকিৎসাবিষয়ক বিশ্বকোষে। ৯৯২ খ্রিস্টাব্দে সম্পাদিত ওই গ্রন্থে পানির সাথে সম্পর্কিত উড়ন্ত পোকামাকড়ের কারণে সৃষ্ট অসুস্থতার উল্লেখ ছিল। তবে সেই রোগটি আধুনিক ডেঙ্গু ছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
১৭৭৯ ও ১৭৮০ সালের দিকে এশিয়া, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকায় ডেঙ্গুর মতো রোগের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাবের বিবরণ পাওয়া যায়। ১৭৮৯ সালে মার্কিন চিকিৎসক বেঞ্জামিন রাশ ১৭৮০ সালের ফিলাডেলফিয়ার একটি প্রাদুর্ভাবের বর্ণনায় ‘ব্রেকবোন ফিভার’ নামটি ব্যবহার করেন। তীব্র পেশি ও অস্থিসন্ধির ব্যথার কারণে রোগটির এমন নাম প্রচলিত হয়।
ডেঙ্গু নামটির উৎপত্তি নিয়েও একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। একটি প্রচলিত মত অনুযায়ী, সোয়াহিলি ‘কি-ডেঙ্গা পেপো’ শব্দগুচ্ছের সাথে এর সম্পর্ক থাকতে পারে। শব্দগুচ্ছটি খিঁচুনি বা ব্যথার মতো উপসর্গযুক্ত অসুস্থতার ধারণা প্রকাশ করে। তবে নামটির সুনির্দিষ্ট উৎপত্তি নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেই।
১৯০৬ সালে এডিস মশার মাধ্যমে ডেঙ্গু ছড়ানোর বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে রোগটির সংক্রমণপ্রক্রিয়া বোঝার ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ঘটে। সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের প্রকাশনা
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তার
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাসও কয়েক দশকের পুরোনো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রোগটি শনাক্ত হয়েছিল। সে সময় এটি ‘ঢাকা ফিভার’ নামে পরিচিত ছিল। সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা
দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্নভাবে রোগী শনাক্ত হলেও ২০০০ সালে দেশে বড় ধরনের ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ওই বছর ৫ হাজার ৫৫১ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৯৩ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। সূত্র: গবেষণাপত্র, প্লস ওয়ান
এরপর বিভিন্ন সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে। তবে ২০২৩ সাল বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির অন্যতম ভয়াবহ বছর হিসেবে চিহ্নিত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ওই বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। বিপুলসংখ্যক রোগী ও মৃত্যুর ঘটনা ডেঙ্গু প্রতিরোধে আরও কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
আবহাওয়া ও পরিবেশের প্রভাব
ডেঙ্গুর বিস্তারের সাথে আবহাওয়া ও পরিবেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। উষ্ণতা, আর্দ্রতা ও বৃষ্টিপাত এডিস মশার বংশবিস্তারে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। বাড়ির ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবন কিংবা অন্য কোনো স্থানে জমে থাকা পানি মশার প্রজননস্থল হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু উষ্ণ ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলে বেশি দেখা যায়। বৃষ্টির মৌসুম এবং এর পরবর্তী সময়েও সংক্রমণ বাড়তে পারে। তবে ডেঙ্গুর বিস্তার শুধু আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে না; নগরায়ণ, পানি ব্যবস্থাপনা, জনবসতির ঘনত্ব এবং মশা নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমও এতে ভূমিকা রাখে।
চার ধরনের ভাইরাস, ঝুঁকিও ভিন্ন
ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি প্রধান ধরন রয়েছে-ডিইএনভি-১, ডিইএনভি-২, ডিইএনভি-৩ ও ডিইএনভি-৪। এক ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর সাধারণত সেই ধরনের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু অন্য ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে একই মাত্রার দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা তৈরি হয় না।
পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসে সংক্রমিত হলে গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে প্রত্যেক পুনঃসংক্রমণেই রোগ গুরুতর হবে, এমন নয়। রোগীর শারীরিক অবস্থা, বয়স এবং অন্যান্য বিষয়ও রোগের তীব্রতায় প্রভাব ফেলে।
ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে উচ্চ জ্বর, মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা, বমি বমি ভাব এবং ত্বকে ফুসকুড়ি। অনেক রোগী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা কিংবা অস্বাভাবিক অস্থিরতার মতো সতর্কসংকেত দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার সময়ও রোগীর অবস্থার অবনতি হতে পারে। তাই জ্বর কমলেই বিপদ কেটে গেছে—এমন ধারণা করা ঠিক নয়।
প্রতিরোধের শুরু নিজের ঘর থেকে
ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু হাসপাতালে চিকিৎসার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। মশার বংশবিস্তার বন্ধ করাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপগুলোর একটি। বাড়ি ও আশপাশে কোথাও পানি জমে আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। ফুলের টবের নিচের পাত্র, ড্রাম, বালতি, ছাদ, পরিত্যক্ত টায়ার এবং নির্মাণাধীন স্থানের পানি পরিষ্কার করতে হবে। যেসব পাত্রে পানি রাখা প্রয়োজন, সেগুলো ঢেকে রাখতে হবে এবং নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন সামাজিক উদ্যোগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সংগঠন ও বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমের মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সচেতনতামূলক কার্যক্রমও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সাথে হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসা উপকরণ, প্রশিক্ষিত জনবল ও পর্যাপ্ত সেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। রোগীর অবস্থা দ্রুত শনাক্ত করা এবং সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া গেলে জটিলতা মোকাবিলা সহজ হতে পারে।
সম্মিলিত উদ্যোগই পারে ঝুঁকি কমাতে
ডেঙ্গু মোকাবিলা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়, নাগরিকদেরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, সতর্কসংকেত সম্পর্কে ধারণা এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ—এসব পদক্ষেপ সংক্রমণ ও জটিলতার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
শতাব্দীপ্রাচীন এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আধুনিক চিকিৎসার পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সচেতনতা ও ধারাবাহিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার অপেক্ষায় না থেকে সংক্রমণের সুযোগ কমিয়ে আনতে হবে। নিজের ঘর থেকে শুরু হোক সেই উদ্যোগ; ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠুক ডেঙ্গুমুক্ত পরিবেশের প্রত্যাশা।
লেখক: নুসরাত জাহান রীমা, গৃহিণী

