প্রতি বছর ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস। দিনটির পেছনে রয়েছে শত বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাস। ১৯১২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় ইন্টারন্যাশনাল ফার্মাসিউটিক্যাল ফেডারেশন (FIP)। সেই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ২০০৯ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত এফআইপি কাউন্সিল সভায় ২৫ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরের বছর, ২০১০ সাল থেকে দিবসটি বিশ্বজুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উদযাপিত হয়ে আসছে।
২০২৬ সালের বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবসের প্রতিপাদ্য -“Empowering Pharmacists for Healthier Futures”, অর্থাৎ “সুস্থতর ভবিষ্যতের জন্য ফার্মাসিস্টদের ক্ষমতায়ন।”
এই প্রতিপাদ্যের তাৎপর্য শুধু একটি পেশাকে সম্মান জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মূল বার্তা আরও বিস্তৃত -স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ফার্মাসিস্টদের জ্ঞান, দক্ষতা ও পেশাগত সক্ষমতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো। কারণ আধুনিক স্বাস্থ্যসেবায় ফার্মাসিস্টের ভূমিকা আর শুধু ওষুধ তৈরি বা বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; রোগীর নিরাপত্তা, ওষুধের যৌক্তিক ব্যবহার, বৈজ্ঞানিক তথ্য বিনিময় এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের সঙ্গেও তাঁর ভূমিকা গভীরভাবে যুক্ত।
সময়ের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা। অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বাড়ছে, জনসংখ্যার বয়সগত কাঠামো পরিবর্তিত হচ্ছে, প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা বিস্তৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে ওষুধের নিরাপদ, কার্যকর ও যৌক্তিক ব্যবহারও দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ফার্মাসিস্টের ভূমিকা কেবল ওষুধ উৎপাদন বা বিতরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই।
তবু ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে কাজ করতে গিয়ে পেশাগত জীবনে একটি প্রশ্ন বারবার শুনেছি -ফার্মাসিস্টের কাজ কি শুধু ল্যাব বা কারখানায়? বিপণন কি কেবল ব্যবসায় শিক্ষা-ভিত্তিক পেশাজীবীদের ক্ষেত্র? কখনো সরাসরি প্রশ্ন এসেছে, “ফার্মাসিস্ট হয়ে বিপণনে কেন?” কিংবা “ফার্মাসিস্ট বিপণন সম্পর্কে কতটুকু বোঝেন?”
এই প্রশ্নগুলোর মধ্যেই ফার্মাসিউটিক্যাল বিপণন সম্পর্কে একটি প্রচলিত ধারণা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অথচ ফার্মাসিউটিক্যাল পণ্যের বিপণন সাধারণ ভোক্তাপণ্য বা এফএমসিজি পণ্যের বিপণনের মতো নয়।
ধরা যাক, চিপস একটি সাধারণ ভোক্তাপণ্য। শিশুদের লক্ষ্য করে এটি বাজারজাত করা হলেও বিভিন্ন বয়সের মানুষ তা গ্রহণ করতে পারেন। স্বাদ, প্যাকেজিং কিংবা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্যটির আকর্ষণ তৈরি করা যায়। কিন্তু ওষুধের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
একটি ওষুধের ব্যবহার নির্ভর করে রোগীর রোগনির্ণয়, বয়স, ওজন, শারীরিক অবস্থা, অ্যালার্জির ইতিহাস, সঠিক মাত্রা, ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা, অন্য ওষুধ বা খাবারের সঙ্গে পারস্পরিক ক্রিয়া, কার্যকারিতা, নিরাপত্তা এবং সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ওপর। ফলে একই ওষুধ একজন রোগীর জন্য উপকারী ও উপযুক্ত হতে পারে, আবার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অন্য একজনের জন্য সেটি ঝুঁকিপূর্ণ বা ক্ষতিকরও হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে প্রোপ্রানোললের কথা বলা যায়। নির্দিষ্ট হৃদ্রোগ ও উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় ওষুধটি ব্যবহৃত হলেও ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা বা শ্বাসনালির হাঁপানিতে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এর ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের অনুমোদিত ওষুধ-তথ্যেও, ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমাতে প্রোপ্রানোলল ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞা হিসেবে উল্লেখ আছে।
এ প্রসঙ্গে দেশের ওষুধ প্রশাসনের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ওষুধের গুণগতমান, নিরাপত্তা ও যথাযথ ব্যবহারের বিষয়ে তাদের চলমান তৎপরতা এবং নজরদারি অবশ্যই প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতার দাবি রাখে। বাজারজাত হওয়ার পর কোনো ওষুধে নতুন ঝুঁকি, অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়া বা নিরাপত্তা-সংকেত তৈরি হচ্ছে কি না - এসব বিষয়ে কার্যকর নজরদারি একটি শক্তিশালী ওষুধ-নিরাপত্তা ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।
কারণ একটি ওষুধ বাজারে আসার মধ্য দিয়েই তার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বরং তখন শুরু হয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় - ওষুধ-নিরাপত্তা নজরদারি বা ফার্মাকোভিজিল্যান্স। বাস্তব ব্যবহারে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে কি না, নতুন কোনো নিরাপত্তা-সংকেত তৈরি হচ্ছে কি না কিংবা অন্য ওষুধের সঙ্গে পারস্পরিক ক্রিয়ায় নতুন কোনো ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে কি না - এসব বিষয় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করতে হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী সেই তথ্যের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থাও নিতে হয়।
অর্থাৎ ওষুধের বাজারজাতকরণের সঙ্গে শুধু বিক্রয় জড়িত নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত বিজ্ঞান, রোগীর নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও জনস্বাস্থ্য। সে কারণেই ফার্মাসিউটিক্যাল বিপণনকে কেবল বিক্রয় বা প্রচারণার কার্যক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক, ক্লিনিক্যাল, বাণিজ্যিক ও নৈতিক দায়িত্বের সমন্বিত ক্ষেত্র।
ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোতে বিপণনসংক্রান্ত এই বিভাগটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। কোথাও এটি প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট (পিএমডি), কোথাও স্ট্র্যাটেজিক বিজনেস বা মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি বিভাগ, আবার কোথাও সরাসরি মার্কেটিং ডিপার্টমেন্ট নামে পরিচালিত হয়। নাম ভিন্ন হলেও মূল দায়িত্ব প্রায় একই - নতুন জেনেরিক বা পণ্য নির্বাচন ও বাজারজাতকরণ, ব্র্যান্ড কৌশল নির্ধারণ, বাজার ও চিকিৎসা-চাহিদা বিশ্লেষণ, চিকিৎসকদের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক যোগাযোগ এবং সেলস টিমকে প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক সহায়তা দেওয়া। একটি ওষুধকে শুধু বাজারে নিয়ে আসা-ই এই বিভাগের কাজ নয়; তার বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব, যথাযথ ব্যবহার, রোগীর প্রয়োজন এবং বাজারের বাস্তবতার মধ্যে সঠিক সংযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ফলে একটি ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠানের বৈজ্ঞানিক ও বাণিজ্যিক কৌশল নির্ধারণে এই বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আর এখানেই একজন ফার্মাসিস্টের শিক্ষাগত ভিত্তি বিশেষ মূল্য যোগ করতে পারে। ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের বাস্তবতাতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠানের প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট বা বিপণন বিভাগে ফার্মাসিস্টরাই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। নতুন পণ্য নির্বাচন, ব্র্যান্ড কৌশল নির্ধারণ, বৈজ্ঞানিক অবস্থান তৈরি, চিকিৎসকদের সঙ্গে তথ্যভিত্তিক যোগাযোগ এবং সেলস টিমকে বৈজ্ঞানিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো কাজে তাঁদের ওষুধবিষয়ক প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান সরাসরি কাজে লাগে।
ফার্মাকোলজি, ওষুধের কার্যপ্রক্রিয়া, ফার্মাসিউটিক্স, ডোজ, ওষুধের পারস্পরিক ক্রিয়া, থেরাপিউটিকস, ওষুধের শ্রেণিবিন্যাস, ডোজেজ ফর্ম, নিরাপদ ব্যবহার, প্যাকেজিং ও সংরক্ষণ - এসব বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা একজন ফার্মাসিস্টকে ওষুধ সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি দেয়।
কোন ওষুধ কোন শ্রেণির - অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিফাঙ্গাল, অ্যান্টিহাইপারটেনসিভ কিংবা অন্য কোনো থেরাপিউটিক শ্রেণির - সেটি বোঝার পাশাপাশি কোথায় তার চিকিৎসাগত গুরুত্ব এবং কী ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন, সেটিও জানা জরুরি। কোন বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে ওষুধটিকে দায়িত্বশীলভাবে উপস্থাপন করা উচিত - এই বোঝাপড়াও একজন ফার্মাসিস্টের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অংশ।
ফার্মাসিউটিক্যাল বিপণনে একজন ফার্মাসিস্টের বিশেষ শক্তি তাই শুধু তাঁর ডিগ্রিতে নয়; বরং ওষুধবিষয়ক বৈজ্ঞানিক তথ্য বুঝে সেটিকে চিকিৎসা-চাহিদা, বাজারের বাস্তবতা এবং প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করার সক্ষমতায়। এই ভিত্তিই তাঁকে মেডিকেল, রেগুলেটরি, ফার্মাকোভিজিল্যান্স, সেলস ও বাণিজ্যিক বিভাগের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন তৈরিতে ভূমিকা রাখতে সহায়তা করে।
তবে শুধু ফার্মেসির ডিগ্রি থাকলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে একজন সফল বিপণন পেশাজীবী হয়ে ওঠেন না। বিপণন নিজেই একটি বিশেষায়িত পেশাগত ক্ষেত্র। ব্যবসায়িক কৌশল, বাজার বিশ্লেষণ, যোগাযোগ, অর্থনীতি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, নেতৃত্ব, ডেটা বিশ্লেষণ এবং কার্যকর বাস্তবায়ন - সবকিছুই এখানে শিখতে ও আয়ত্ত করতে হয়।
অর্থাৎ ওষুধ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান একজন ফার্মাসিস্টকে শুধু শক্তিশালী ভিত্তি দিতে পারে; কিন্তু সফল ফার্মাসিউটিক্যাল বিপণনের জন্য সেই জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবসায়িক সক্ষমতা, কৌশলগত চিন্তা এবং বাস্তবায়ন দক্ষতার সমন্বয় থাকা অপরিহার্য।
তাহলে প্রশ্ন আসে—ফার্মাসিউটিক্যাল বিপণনের মতো বিজ্ঞাননির্ভর একটি ক্ষেত্রে শুধু সাধারণ বিপণন জ্ঞান কি যথেষ্ট, নাকি তার সঙ্গে ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যাল বিজ্ঞানের গভীর বোঝাপড়াও প্রয়োজন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে মনে রাখতে হবে, আমরা কোনো সাধারণ পণ্য নিয়ে কাজ করছি না; আমরা কাজ করছি মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ নিয়ে, যা সরাসরি স্বাস্থ্য ও জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও ওষুধবিজ্ঞান প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত ও সমৃদ্ধ হচ্ছে। একটি ওষুধের সঠিক ব্যবহার যেমন জীবন রক্ষা করতে পারে, তেমনি ভুল বা অনুপযুক্ত ব্যবহার গুরুতর ক্ষতির কারণও হতে পারে। তাই ফার্মাসিউটিক্যাল বিপণনে বাজারের পাশাপাশি সমান গুরুত্ব পেতে হয় বিজ্ঞান, নিরাপত্তা, নৈতিকতা এবং রোগীর কল্যাণকে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের অগ্রগতি এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে দেশের ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাত নিজেই একটি বহুবিষয়ভিত্তিক ব্যবস্থা। চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, নার্স, গবেষক, ফাইন্যান্স বিশেষজ্ঞ, সাপ্লাই চেইন পেশাজীবী এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের প্রত্যেকেরই এখানে স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থায় এসব পেশাজীবী পরস্পরের প্রতিযোগী নন; বরং নিজ নিজ দক্ষতা নিয়ে একই লক্ষ্য -রোগীর কল্যাণ - অর্জনে কাজ করেন। আর এখানেই ফার্মাসিউটিক্যাল বিপণনে ফার্মাসিস্টের ভূমিকার আরেকটি বাস্তব দিক সামনে আসে।
ফার্মাসিউটিক্যাল বিপণনের কেন্দ্রবিন্দুতে শুধু বাজার বা বিক্রয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত স্বাস্থ্যসেবা এবং মানুষের চিকিৎসা-চাহিদা। তাই এই খাতে যিনি বিপণনের দায়িত্বে কাজ করেন, তাঁকে শুধু একটি পণ্যের বিক্রয় কত হবে, সেটিই ভাবলে চলে না। তাঁকে বুঝতে হয় - কোন সময়ে কোন রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে, চিকিৎসা-চাহিদা কীভাবে বদলাতে পারে এবং সে অনুযায়ী কোন ওষুধ কত পরিমাণে ও কখন বাজারে সহজলভ্য রাখা প্রয়োজন।
উদাহরণ হিসেবে ডেঙ্গুর কথাই ধরা যাক। বছরের কোন সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে পারে, তখন জ্বর ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় প্যারাসিটামলের চাহিদা কতটা বাড়তে পারে এবং সেই বাড়তি চাহিদা কতদিন স্থায়ী হতে পারে -এসব আগেভাগে অনুধাবন করা গুরুত্বপূর্ণ। সেই সম্ভাব্য চাহিদাকে সামনে রেখে বিপণন বিভাগকে সেলস, সাপ্লাই চেইন, উৎপাদন, পরিকল্পনা ও বিতরণসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ওষুধের যথাযথ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার পরিকল্পনায় ভূমিকা রাখতে হয়।
একইভাবে মৌসুমি রোগ, বিভিন্ন সংক্রমণ, দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগ কিংবা নতুন কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকির ক্ষেত্রে সম্ভাব্য চিকিৎসা-চাহিদা আগেভাগে অনুধাবন করে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা প্রয়োজন। অর্থাৎ একজন ফার্মাসিউটিক্যাল বিপণন পেশাজীবীর দায়িত্ব শুধু বিক্রয় বাড়ানো বা একটি ব্র্যান্ডের বাজার তৈরি করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; রোগের প্রবণতা, রোগীর প্রয়োজন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিবর্তন এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা - সবকিছুকে বিবেচনায় নিয়ে দায়িত্বশীল পরিকল্পনায় ভূমিকা রাখাও তাঁর কাজের অংশ।
তাই “ফার্মাসিউটিক্যাল বিপণনে ফার্মাসিস্ট কেন?” -এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি পেশাগত পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর উত্তর খুঁজতে হলে আগে বুঝতে হবে, ফার্মাসিউটিক্যাল বিপণন আসলে কী নিয়ে কাজ করে। এখানে বাজার বুঝতে হয়, প্রতিযোগিতা বুঝতে হয়, ব্যবসার বাস্তবতা বুঝতে হয় - কিন্তু তারও আগে বুঝতে হয় ওষুধকে; তার বিজ্ঞান, ব্যবহার, নিরাপত্তা এবং শেষ পর্যন্ত যে রোগীর জন্য ওষুধটি ব্যবহৃত হবে, তাঁর প্রয়োজনকে।
একজন ফার্মাসিস্টের বৈজ্ঞানিক শিক্ষা যখন ব্যবসায়িক কৌশল, বাজার বিশ্লেষণ, যোগাযোগ, নেতৃত্ব ও বাস্তবায়নের দক্ষতার সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন সেই জ্ঞান শুধু একটি ব্র্যান্ডের বাজার তৈরিতে নয়, বরং আরও তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল ও রোগীকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাণিজ্যিক প্রবৃদ্ধি অবশ্যই একটি ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি যদি রোগীর প্রকৃত প্রয়োজন, ওষুধের যথাযথ ব্যবহার এবং জনস্বাস্থ্যের বৃহত্তর স্বার্থ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তাহলে ফার্মাসিউটিক্যাল বিপণনের মূল দায়বদ্ধতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বাজার গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই বাজারের কেন্দ্রে রয়েছে একটি ওষুধ; আর সেই ওষুধের কেন্দ্রে রয়েছে একজন মানুষ। তাই ফার্মাসিউটিক্যাল বিপণনে বিক্রয়ের সংখ্যার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে বিজ্ঞান, নিরাপত্তা, নৈতিকতা এবং মানুষের জীবন।
বিশ্ব ফার্মাসিস্ট দিবস ২০২৬ আমাদের সেই কথাটিই নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে -ফার্মাসিস্টদের ক্ষমতায়ন মানে কোনো একটি পেশাকে অন্য পেশার ওপরে স্থান দেওয়া নয়; বরং তাঁদের শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও পেশাগত সক্ষমতাকে স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পের যথোপযুক্ত ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে কাজে লাগানো।
প্রত্যাশা হোক এমন একটি বাংলাদেশের, যেখানে স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের মধ্যে থাকবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমন্বয়, সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকবে বিজ্ঞান ও রোগীর কল্যাণ, আর প্রয়োজনের সময়ে মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে নিরাপদ, কার্যকর ও প্রয়োজনীয় ওষুধ।
লেখক-
রেজিস্টার্ড গ্রেড-এ ফার্মাসিস্ট

