...|...|...

মতামত

হঠাৎ ঢাকায় ‘র’ প্রধান, পরাগ জৈনের সফরের নেপথ্যে কী?

যোবায়ের আহমদ
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:৩৬ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৭:২৭
Shares
হঠাৎ ঢাকায় ‘র’ প্রধান, পরাগ জৈনের সফরের নেপথ্যে কী?

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং বা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনের আকস্মিক ঢাকা সফর দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক নতুন ও তীব্র উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে। দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যখন নানা টানাপোড়েন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনজনিত জটিলতা এবং আস্থার সংকট চলছে, ঠিক তখনই এই শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তার ঢাকা আগমন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কৌশলগত বিশ্লেষকরা।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে গত রোববার দুপুরে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান পরাগ জৈন। তার নেতৃত্বে চার সদস্যের এই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলে আরও রয়েছেন অশ্বীন মুকুন্দ কোটনিস, রাহুল নেগি ও শৈবাল রায় চৌধুরী। তবে এই সফর নিয়ে বাংলাদেশ বা ভারতের কূটনৈতিক ও সরকারি মহলে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ঢাকার একটি নির্দিষ্ট কূটনৈতিক নিরাপত্তা বলয়ের হোটেলে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে অবস্থান করছেন তারা।

কূটনৈতিক মহলের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় পা রাখার ঠিক আগেই চীন সফর করেছিলেন পরাগ জৈন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বেইজিং সফরের পরপরই তার এই ঢাকা সফর কেবল রুটিনগত কোনো গোয়েন্দা যোগাযোগ বা সাধারণ কূটনৈতিক সৌজন্য নয়। এটি দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতিতে ভারতের নতুন কোনো কৌশলগত পদক্ষেপ, আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা কিংবা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে চীন ফ্যাক্টরকে মাথায় রেখে নতুন কোনো সমীকরণের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে নিজেদের আধিপত্য ও প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখতে ভারতের এই ধরনের বহুমাত্রিক কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ বেশ অর্থবহ।

ভারতের মাটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান এবং সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া (এফসিসি সাউথ এশিয়া)-র আয়োজনে তার ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রায় উত্তেজনা তৈরি করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের বার্ষিকীর দিনে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তার এই অনলাইন উপস্থিতি এবং দেশে ফেরার ঘোষণা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে দিল্লির কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দাবি করেছে এবং একে সার্বভৌমত্বের প্রতি স্পষ্ট হস্তক্ষেপ বলে অভিহিত করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পলাতক অবস্থায় ভারতে বসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যম ও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেশের ভেতরে নানামুখী রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানো, অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করা এবং অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে ভারতীয় ভূখণ্ডে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ নেতাদের ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে ঢাকা। এই প্রেক্ষাপটে ‘র’-এর প্রধানের ঢাকা সফরকে নিছক সাধারণ কোনো কূটনৈতিক সাক্ষাৎ হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ এক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। ভারতের দীর্ঘদিনের প্রথাগত প্রভাব বলয় থেকে বাংলাদেশ যাতে পুরোপুরি বেরিয়ে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের নেতৃত্বাধীন কোনো বিশেষ পরাশক্তির ব্লকে স্থায়ীভাবে ভিড়ে না যায়- নয়াদিল্লির নীতিনির্ধারকদের মনে এই বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ কাজ করছে। দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত ও নিরাপত্তা স্বার্থ অটুট রাখতে ভারত কোনোভাবেই চায় না ঢাকা অন্য কোনো পরাশক্তির প্রভাব বলয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ুক। বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বাংলাদেশকে নিজেদের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে ধরে রাখাই পরাগ জৈনের এই গোপন সফরের অন্যতম প্রধান সুদূরপ্রসারী ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য।

সম্পর্কের এই জমাট বাঁধা বরফ গলাতে এবং পারস্পরিক যোগাযোগের ধারা বজায় রাখতে এর আগে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও বৈঠক করেছেন। কূটনৈতিক মহলের মতে, এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও যোগাযোগ দুই দেশের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে এক ধরনের ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে কথার সুরের আড়ালে মাঠপর্যায়ের জটিল বাস্তবতাকে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই।

কূটনৈতিক সম্পর্কের এই টানাপোড়েনের মাঝেই আন্তর্জাতিক ফোরামেও দেখা গেছে নানা কৌশলগত দূরত্ব। সম্প্রতি নয়াদিল্লি তাদের স্বত্বাধিকার অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে নয়, বরং বিমসটেকের চেয়ারপারসন হিসেবেই ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মারপ্যাঁচ ও প্রটোকলভিত্তিক শীতলতা দুই দেশের দীর্ঘদিনের অংশীদারিত্বে নতুন এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিয়েছে, যা রাতারাতি অতিক্রম করা সহজ নয়।

সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ঢাকা তার অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট রেখেছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ভারতে অবস্থানরত দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য ভারতকে আনুষ্ঠানিক ও জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছে। একই সাথে আলোচিত ওসমান হাদির নৃশংস হত্যাকারীদের প্রত্যর্পণের বিষয়েও ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে বলে জানান তিনি। ঢাকার এই দ্ব্যর্থহীন বার্তা বুঝিয়ে দেয়, অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি না করে পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের মানুষের মনে ভারতীয় হস্তক্ষেপের ঐতিহাসিক ক্ষত এখনও গভীর। শেখ হাসিনার সেই সংবাদ সম্মেলনের তীব্র প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি বর্তমান বিএনপি সরকারও দিল্লির অতীতের বিভিন্ন অযাচিত হস্তক্ষেপকে কোনোভাবেই ভালোভাবে নেয়নি। বিশেষ করে, ২০০৭ সালের ওয়ান ইলেভেনে ভারতের সুনির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল বলে জোরালো ধারণা রয়েছে। আর সেই পরিবর্তনের জেরে পরবর্তী সময়ে দেশনায়ক তারেক রহমানসহ তার পুরো পরিবারের ওপর যে রাজনৈতিক খড়গ ও অমানবিক নিপীড়ন নেমে এসেছিল, তার পেছনেও তৎকালীন ভারতীয় নীতিনির্ধারকদের দীর্ঘমেয়াদী হাত ছিল বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এই ঐতিহাসিক ও মনস্তাত্ত্বিক আস্থাহীনতার পাহাড় ডিঙিয়েই দুই দেশকে এখন নতুন সম্পর্কের সমীকরণ মেলাতে হচ্ছে।

গত কয়েক বছর ধরে এবং বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন পর ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে নানামুখী টানাপোড়েন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সীমান্তে হত্যা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতা, বাণিজ্যে শুল্ক ও অ-শুল্ক বাধা এবং রাজনৈতিক আশ্রয় ও নিরাপত্তাজনিত নানা ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে একধরনের শীতলতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার জন্য বারবার তাগাদা দেওয়া হলেও নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি না হওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কে আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।

পরাগ জৈন বর্তমানে ‘র’-এর পাশাপাশি ভারতের মর্যাদাপূর্ণ স্পেশাল প্রোটেকশন গ্রুপের (এসপিজি) স্পেশাল সেক্রেটারির দায়িত্বও পালন করছেন। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যকার পারস্পরিক আস্থার সংকট দূর করা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বহুমাত্রিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেই এই সফরকে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এই প্রতিনিধি দলের বৈঠক ও আলোচনায় দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয় উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্লেষকদের অভিমত, এই আকস্মিক সফর দুদেশের মধ্যকার ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলাতে এবং অদৃশ্য দূরত্ব কমিয়ে আনতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত স্বার্থ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পর্দার আড়ালে চলা এই ধরনের উচ্চপর্যায়ের আলোচনা আগামী দিনে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। তবে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি কমিয়ে একটি স্থিতিশীল ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সম্পর্ক গড়ে তুলতে এই ধরনের সংলাপ অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন কূটনীতিবিদরা।

নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। টাইমস টুডের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, টাইমস টুডে কর্তৃপক্ষের নয়।