ইসরায়েলের নির্বাচনে কে জিতল, তা জানার জন্য গোটা বিশ্ব অপেক্ষা করছে। কিন্তু এই নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হয়তো অন্য কোথাও- যে ফিলিস্তিনি শিশুটি ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে আছে, তার জীবনে এই ফল কী বদলাবে? যে পরিবারটি গাজার ভাঙা বাড়িতে ফিরে যাওয়ার মতো একটি বাড়িও আর খুঁজে পাচ্ছে না, তাদের জন্য নতুন প্রধানমন্ত্রী কী নিয়ে আসবেন? পশ্চিম তীরের যে কৃষক প্রতিদিন নিজের জমিতে যাওয়ার পথে নতুন চেকপোস্ট, বসতি কিংবা উচ্ছেদের আশঙ্কার মুখোমুখি হন, তার ভবিষ্যৎ কোন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে নিরাপদ হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কেবল বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিদায় কিংবা প্রত্যাবর্তনের মধ্যে আটকে নেই।
ইসরায়েলের ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে পারেনি। আংশিক ফলাফলে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে থাকলেও বিরোধী শিবিরও সরকার গঠনের মতো অবস্থানে পৌঁছায়নি। আরব দলগুলো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসন পাওয়ায় সরকার গঠনের সমীকরণ আরও জটিল হয়েছে।
ফলে প্রশ্নটি এখন শুধু কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো, ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় নীতি, ফিলিস্তিনের ভবিষ্যৎ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে আদৌ কতটা পরিবর্তন আসবে।
এই নির্বাচনে কে জিতল, তা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ- জয়ী পক্ষ কী বদলাতে চায়, আর কোন ব্যবস্থাকে অপরিবর্তিত রাখতে চায়।
নেতানিয়াহু হারলেও কি হারবে নেতানিয়াহুবাদ?
রাজনীতিতে একজন নেতার পতন আর তার রেখে যাওয়া ব্যবস্থার পতন এক বিষয় নয়। কখনো কখনো একজন নেতা চলে যান, কিন্তু তার তৈরি করা রাজনৈতিক বাস্তবতা আরও দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকে। ইসরায়েলের এই নির্বাচনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই।
নেতানিয়াহু ইসরায়েলের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা, সামরিক শক্তি এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি কঠোর অবস্থানকে রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রে রেখেছেন। তার সরকারের নীতিতে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা এবং গাজায় সামরিক অভিযানের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এসব নীতির সবকিছুকে কেবল একজন ব্যক্তির সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে ইসরায়েলের রাজনীতির গভীরতর বাস্তবতা আড়ালে থেকে যায়।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের বিশ্লেষণ বলছে, নেতানিয়াহুর বিরোধী অনেক ইসরায়েলি রাজনীতিক তার নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক আচরণের সমালোচনা করলেও তাদের বড় অংশ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সমর্থক নন। পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের বিরোধিতাও তাদের মধ্যে সর্বজনীন নয়। ফলে নেতানিয়াহুর বিদায় ঘটলেও ফিলিস্তিন প্রশ্নে মৌলিক নীতিগত পরিবর্তন নিশ্চিত নয়।
এখানেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির সীমাবদ্ধতা। নেতানিয়াহুকে সরিয়ে অন্য কাউকে প্রধানমন্ত্রী করা সম্ভব; কিন্তু কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা নিরাপত্তাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি, বসতি রাজনীতির প্রভাব এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি জনমতের কঠোরতা বদলানো অনেক দীর্ঘ ও কঠিন প্রক্রিয়া।
ধরা যাক, গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বে একটি সরকার গঠিত হলো। তাতে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কমতে পারে, সরকারের ভাষা নরম হতে পারে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের উত্তাপও কমতে পারে। কিন্তু সেই সরকার কি পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ করবে? ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্রের অধিকার মেনে নেবে? গাজার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু নেতানিয়াহুর বিরোধিতা থেকে পাওয়া যায় না।
একজন প্রধানমন্ত্রী বদলাতে পারেন রাষ্ট্রের মুখ, কিন্তু রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হলে বদলাতে হয় নীতি, প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতার সমীকরণ।
ফিলিস্তিনের জন্য আসল নির্বাচন কোথায়?
ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোটাররা নির্ধারণ করছেন নিজেদের পরবর্তী সরকার। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কতটা কার্যকর- সেটিই বড় প্রশ্ন।
গাজা ও পশ্চিম তীরের বাস্তবতা এক নয়, যদিও দুটি ভূখণ্ডই ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যুক্ত।
গাজায় যুদ্ধের ধ্বংস, বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সহায়তার প্রয়োজন এবং ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় দপ্তরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতেও গাজার মানবিক পরিস্থিতি এবং পশ্চিম তীরের নিরাপত্তা ও চলাচলসংক্রান্ত সংকটের চিত্র উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ, জমির ওপর নিয়ন্ত্রণ, চলাচলে বিধিনিষেধ এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের সংকটকে আরও জটিল করেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতির প্রভাব তাঁর বিদায়ের পরও বহাল থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
এখানে ফিলিস্তিনের সংকট শুধু যুদ্ধবিরতির নয়; এটি ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব ও রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সংকট।
যুদ্ধবিরতি থাকলেই কি গাজার মানুষ নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবেন? ধ্বংস হওয়া হাসপাতাল, বিদ্যালয় ও পানির অবকাঠামো পুনর্গঠনের নিশ্চয়তা কে দেবে? গাজার প্রশাসন কে পরিচালনা করবে? ফিলিস্তিনিদের সম্মতি ছাড়া বাইরের শক্তি যদি তাঁদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে, তবে সেই বন্দোবস্ত কতটা টেকসই হবে?
পশ্চিম তীরের ক্ষেত্রেও প্রশ্নগুলো একই রকম মৌলিক। নতুন সরকার কি বসতি সম্প্রসারণের গতি কমাবে? ফিলিস্তিনিদের জমি ও চলাচলের অধিকার রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নেবে? স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আলোচনাকে বাস্তব রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্বাচনী স্লোগানে নয়, ক্ষমতায় যাওয়ার পর সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তে পাওয়া যাবে।
ফিলিস্তিনিদের কাছে তাই ইসরায়েলের নির্বাচনের গুরুত্ব নেতানিয়াহু জিতলেন, না আইজেনকোট- শুধু এই হিসাব নয়। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নির্বাচনের পর তাঁদের জীবনের ওপর আরোপিত নিয়ন্ত্রণের বাস্তবতায় কোনো পরিবর্তন আসে কি না।
বিরোধী জোট কি সত্যিই ফিলিস্তিনের জন্য নতুন দরজা খুলবে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে, নেতানিয়াহুবিরোধী হওয়া আর ফিলিস্তিনপন্থী হওয়া এক কথা নয়। ইসরায়েলের বিরোধী রাজনীতিকদের একাংশ নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব, নিরাপত্তাব্যবস্থা পরিচালনায় ব্যর্থতা, রাজনৈতিক মেরুকরণ কিংবা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তারা সবাই ফিলিস্তিনিদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিকে সমর্থন করেন।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর বিরোধী অনেক রাজনীতিকও দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের বিরোধী। অর্থাৎ, ইসরায়েলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিকভাবে বহুল আলোচিত প্রস্তাবটি নতুন সরকার এলেই এগিয়ে যাবে- এমন নিশ্চয়তা নেই।
এই বাস্তবতা নির্বাচনের ফল নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদী হওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করে।
একটি নতুন সরকার হয়তো গাজার যুদ্ধ পরিচালনায় ভিন্ন পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে, পশ্চিম তীরে উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মতপার্থক্য কমাতে পারে। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের পূর্ণ রাজনৈতিক অধিকার, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তাদের অবস্থান কতটা বদলাবে, তা আলাদা করে বিচার করতে হবে।
এখানে মূল পার্থক্যটি হলো- ইসরায়েলি সরকারের পরিবর্তন ফিলিস্তিনিদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই সুযোগ নিজে থেকেই মুক্তি নিশ্চিত করে না।
আরব ভোটারদের উত্থান: পরিবর্তনের সম্ভাবনা, নাকি নতুন রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব?
এই নির্বাচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের ভোট এবং আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর আসনসংখ্যা বৃদ্ধি। আংশিক ফলাফলে আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৯টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। ১২০ আসনের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসন নিশ্চিত করতে নেতানিয়াহুর জোট কিংবা বিরোধী শিবির- উভয়কেই জটিল সমীকরণের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ফলে আরব দলগুলোর সমর্থন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু এখানেই ইসরায়েলের রাজনীতির একটি গভীর বৈপরীত্য প্রকাশ পেয়েছে।
বিরোধী জোট সরকার গঠন করতে চাইলে আরব দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন হতে পারে। অথচ নির্বাচনের আগে আইজেনকোট আরব দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছিলেন। আরব দলগুলোর নেতারাও গাজা ও লেবানন নিয়ে বিরোধী শিবিরের অবস্থানের সমালোচনা করেছেন।
অর্থাৎ, আরব নাগরিকদের ভোট রাজনৈতিক ভার বাড়াতে পারে, কিন্তু সেই ভোটকে সরকার গঠনের অংশীদারত্বে রূপান্তর করা কতটা সম্ভব, তা এখনো অনিশ্চিত।
এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি; ইসরায়েলের আরব নাগরিকেরা এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ফিলিস্তিনিরা একই আইনি ও রাজনৈতিক অবস্থানে নেই। ইসরায়েলের আরব নাগরিকেরা দেশটির নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন; গাজা ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক অধিকার, প্রশাসনিক বাস্তবতা ও চলাচলের স্বাধীনতা সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতির মধ্যে আবদ্ধ।
তবু আরব ভোটের এই উত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে; ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ফিলিস্তিনি পরিচয়, সমতা, নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের প্রশ্নকে উপেক্ষা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
এটি এখনো কাঠামোগত পরিবর্তনের নিশ্চয়তা নয়। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দর-কষাকষিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
ওয়াশিংটনের হিসাব: নেতানিয়াহু নয়, আসলে কী গুরুত্বপূর্ণ?
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ককে প্রায়ই দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠতা, তাদের প্রকাশ্য বক্তব্য কিংবা মতপার্থক্য সংবাদে গুরুত্ব পায়। কিন্তু এই সম্পর্কের ভিত্তি শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক রসায়ন নয়।
দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা, সামরিক সম্পর্ক, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, ইরানকে ঘিরে কৌশলগত উদ্বেগ এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বজায় রাখার হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেল আবিবের সম্পর্কের ভাষা বদলাতে পারে। কূটনৈতিক আলোচনায় উত্তেজনা কমতে পারে, আন্তর্জাতিক সমালোচনা মোকাবিলার পদ্ধতিও বদলাতে পারে। কিন্তু দুই দেশের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা অংশীদারত্ব রাতারাতি বিলুপ্ত হবে, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
একইভাবে, নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিটি বিষয়ে সংঘাত হবে, এমনও নয়। দুই দেশের স্বার্থ যেখানে মিলবে, সেখানে সহযোগিতা চলতে পারে; যেখানে অমিল থাকবে, সেখানে চাপ ও দর-কষাকষি চলবে।
মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ওয়াশিংটনের জন্য তাই আসল প্রশ্ন শুধু কে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হলেন, তা নয়। বরং নতুন সরকার গাজায় যুদ্ধবিরতি ও পুনর্গঠন নিয়ে কী অবস্থান নেয়, পশ্চিম তীরের বসতি নীতিতে কী পরিবর্তন আনে, ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নিয়ে কী করে এবং ইরানসহ আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সংঘাত কতটা বাড়ায় বা কমায়- এসবই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইরান, লেবানন ও উপসাগর: ইসরায়েলের নির্বাচন কেন আঞ্চলিক প্রশ্ন?
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর নিরাপত্তাব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ইরানকে ঘিরে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ, লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাত, সিরিয়ার পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক- সবই ইসরায়েলি সরকারের কৌশলগত সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত। একটি নতুন সরকার এসব ক্ষেত্রে কূটনৈতিক পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে পারে, কিন্তু নিরাপত্তা-সংক্রান্ত মৌলিক মতপার্থক্য সহজে দূর হবে না।
ইরানের প্রশ্নে ইসরায়েলের রাজনীতির বিভিন্ন শিবিরের মধ্যে কৌশলগত পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু ইরানের সামরিক ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ ইসরায়েলি রাজনীতিতে বিস্তৃত। লেবানন ও সিরিয়ার ক্ষেত্রেও সীমান্ত নিরাপত্তা, সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি এবং সামরিক প্রতিরোধের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
এদিকে সৌদি আরবসহ আরব দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনাও ফিলিস্তিন প্রশ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে নিরাপত্তা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নকে পুরোপুরি পাশ কাটিয়ে দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সমঝোতা গড়ে তোলা কঠিন।
অর্থাৎ, ইসরায়েলের সরকার পরিবর্তন আঞ্চলিক কূটনীতির জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মূল কারণগুলো অক্ষত থাকলে কেবল নতুন নেতৃত্ব দিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
নির্বাচনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা: নীতি বদলাবে, নাকি শুধু ভাষা?
একটি নির্বাচনের ফলকে বিচার করার সহজ উপায় হলো বিজয়ী দলের নাম জানা। কিন্তু ভূরাজনীতির জন্য সেটি যথেষ্ট নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো- বিজয়ী সরকার বাস্তবে কী করে। ইসরায়েলের নতুন সরকার গঠিত হলে কয়েকটি বিষয়ে তার অবস্থান বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
প্রথমত গাজা: যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা, মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ, পুনর্গঠন এবং ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কী ভূমিকা নেয়?
পশ্চিম তীর: বসতি সম্প্রসারণ, উচ্ছেদ ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার অভিযোগ মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা নেয়?
ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র: দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন বা বিরোধিতা কি বাস্তব নীতিতে প্রতিফলিত হয়?
আরব নাগরিকদের অধিকার: ইসরায়েলের আরব নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, নিরাপত্তা ও সমতার প্রশ্নে কী পরিবর্তন আসে?
আঞ্চলিক কূটনীতি: ইরান, লেবানন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সংঘাত কমানোর চেষ্টা হয়, নাকি সামরিক প্রতিযোগিতা আরও বাড়ে?
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা: ওয়াশিংটন কি শুধু ইসরায়েলের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করবে, নাকি নীতিগত মতপার্থক্যের জায়গাগুলোতেও বাস্তব চাপ প্রয়োগ করবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া গেলে বোঝা যাবে, ইসরায়েলের নির্বাচনে আসলে কতটা পরিবর্তন ঘটেছে।
নেতানিয়াহুর বিদায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বস্তির পরিবেশ তৈরি করতে পারে। নতুন সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কও সহজ হতে পারে। কিন্তু এসব পরিবর্তনকে ফিলিস্তিনিদের মুক্তির সমার্থক ভাবা হবে বড় ভুল।
কারণ, কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নতি এবং অধিকৃত ভূখণ্ডের মানুষের স্বাধীনতা- দুটি আলাদা বিষয়। একটি অন্যটির সহায়ক হতে পারে, কিন্তু বিকল্প নয়।
তাহলে নির্বাচনে কে জিতল, তা কেন গুরুত্বপূর্ণ নয়?
আসলে কথাটি আক্ষরিক অর্থে সত্য নয়। ইসরায়েলের নির্বাচনে কে জিতল, তা গুরুত্বপূর্ণ- কারণ প্রধানমন্ত্রী ও তার জোট সামরিক অভিযান, বসতি নীতি, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর প্রভাব ফেলা বহু সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখেন।
কিন্তু এই নির্বাচনের ফলকে যদি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের চূড়ান্ত উত্তর হিসেবে দেখা হয়, তাহলে আমরা বড় ছবিটি হারিয়ে ফেলব।
নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকলে ফিলিস্তিনিদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে- এমন আশঙ্কা আছে। তিনি বিদায় নিলে কিছু নীতিতে পরিবর্তনের সুযোগও তৈরি হতে পারে। কিন্তু ইসরায়েলের বিরোধী শিবিরের মধ্যেও ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র ও বসতি নীতি নিয়ে কঠোর অবস্থান রয়েছে। ফলে শুধু ক্ষমতার পালাবদল দিয়ে দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এই কারণেই শিরোনামের প্রশ্নটি জরুরি। নির্বাচনের বিজয়ী কে, সেটি প্রথম প্রশ্ন। কিন্তু শেষ প্রশ্ন নয়।
শেষ প্রশ্ন হলো, নতুন সরকার ফিলিস্তিনিদের অধিকারকে কতটা স্বীকার করবে; গাজাকে শুধু নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে দেখবে, নাকি মানুষের বসবাসযোগ্য ভূখণ্ড হিসেবে পুনর্গঠনের সুযোগ দেবে; পশ্চিম তীরে জমি ও বসতির বাস্তবতা বদলাবে কি না; আর স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে বাস্তব রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরিয়ে আনবে কি না।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি শুধু অস্ত্রের নীরবতা নয়। শান্তি মানে এমন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, যেখানে কোনো জনগোষ্ঠীকে অনির্দিষ্টকাল অন্যের নিরাপত্তা-হিসাবের মধ্যে বন্দী হয়ে থাকতে হয় না। যেখানে নিরাপত্তা এক পক্ষের একচেটিয়া অধিকার নয়, আর স্বাধীনতা অন্য পক্ষের জন্য অনন্ত প্রতীক্ষা নয়।
ইসরায়েলের নির্বাচন সেই বন্দোবস্তের দরজা খুলতে পারে। আবার দরজাটি আগের মতোই বন্ধ রেখেও দিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ইতিহাস মনে রাখবে না শুধু কে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিল। ইতিহাসের কঠিন প্রশ্ন হবে- ক্ষমতায় গিয়ে তিনি কী বদলেছিলেন, কার জীবন বদলেছিল, আর কার স্বাধীনতা আবারও পরবর্তী নির্বাচনের অপেক্ষায় থেকে গিয়েছিল।

