মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সদ্য বদলি হওয়া সাবেক উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. সিনথিয়া তাসমিনের বিরুদ্ধে সরকারি হাসপাতালের নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার সংবাদ প্রকাশের জেরে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়েরের অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা হলেন- দৈনিক খোলা কাগজের মৌলভীবাজার জেলা স্টাফ রিপোর্টার ও শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের যুগ্ম সদস্য সচিব এহসান বিন মুজাহির (এহসানুল হক) এবং দৈনিক জনবাণীর জেলা প্রতিনিধি মনজু বিজয় চৌধুরী।
গত ২৫ অক্টোবর ডা. সিনথিয়া তাসমিন সিলেট সাইবার সিকিউরিটি আদালতে মামলাটি দায়ের করেন।
মামলাটিকে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিকসহ স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনগুলো। তারা অবিলম্বে এই হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
জানা গেছে, শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অব্যবস্থাপনা নিয়ে সাংবাদিক এহসান বিন মুজাহির ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। তার প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য প্রতিবেদনগুলো হলো- ‘শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মেয়াদহীন পাউরুটি ও নিম্নমানের কলা সরবরাহ’, ‘সরকারি হাসপাতালে রাতেও ওড়ে জাতীয় পতাকা’, ‘শ্রীমঙ্গল সরকারি হাসপাতালে নানা অব্যবস্থাপনার অভিযোগ, সচেতন মহলে ক্ষোভ’, ‘জেনারেটর-আইপিএস অচল, মোমবাতিই ভরসা শ্রীমঙ্গল সরকারি হাসপাতালে’ এবং ‘শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমএসআর সামগ্রী সরবরাহ নিয়ে বিতর্ক’।
এছাড়া হাসপাতালের প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বচ্ছতা যাচাইয়ের জন্য তিনি তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর আওতায় ১১টি বিষয়ে তথ্য চেয়ে আবেদন করেন। এর মধ্যে ছিল বহির্বিভাগ, অন্তর্বিভাগ, প্যাথলজি ও ভর্তি রোগীদের থেকে আদায়কৃত ফির সরকারি চালানের অনুলিপি, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় ও দরপত্র, জ্বালানি খরচ, রোগীর হিসাব, বাড়িভাড়া জমা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তালিকা এবং আইপিএস ও ব্যাটারি চুরির ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন।
সাংবাদিক এহসানের দাবি, এসব তথ্য চাওয়া ও ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের কারণেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওই কর্মকর্তা তার বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের বানোয়াট অভিযোগ এনে মামলা করেছেন।
এ বিষয়ে এহসান বিন মুজাহির বলেন, চাঁদা দাবি বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ সম্পূর্ণ হাস্যকর ও অবাস্তব। এর বিন্দুমাত্র সত্যতা নেই। হামলা, মামলা বা ভয়-ভীতি দেখিয়ে আমার বস্তুনিষ্ঠ কলম থামানো যাবে না। সিআইডি, পিবিআইসহ সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মানহানি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগে দায়েরকৃত এ সাইবার মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে দৈনিক জনবাণীর মৌলভীবাজার প্রতিনিধি মনজু বিজয় চৌধুরীকে। অন্য আসামিরা হলেন- বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিস নেতা মোজাহিদুল ইসলাম (২য় আসামি), মো. এহসানুল হক (৩য় আসামি), ‘জেন জেড শ্রীমঙ্গল’ (৪র্থ আসামি) এবং প্রবাসী আমির আলী (৫ম আসামি)।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে বিভিন্ন বেনামি ও মিথ্যা আইডি ব্যবহার করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কুৎসা রটিয়েছেন এবং পোস্ট ডিলিট করার নামে অর্থ দাবি করেছেন।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে মামলার প্রধান আসামি মনজু বিজয় চৌধুরী বলেন, হাসপাতালের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সংবাদ প্রকাশের কারণেই আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। মূলত নিজের প্রশাসনিক অনিয়ম ও দুর্নীতি ঢাকতেই এই হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে। আমরা তার পূর্ববর্তী ও শ্রীমঙ্গলের কর্মস্থলের অনিয়ম-দুর্নীতি, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা, সরকারি সম্পদের অপব্যবহার ও চাকরিবিধি লঙ্ঘনের সঠিক তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
এদিকে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলার ঘটনায় মৌলভীবাজারের স্থানীয় সাংবাদিকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে নিরপরাধ সাংবাদিকদের হয়রানি বন্ধের জোর দাবি জানিয়েছেন।


