বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু প্রেসিডেন্টের হাতে এককভাবে সব ক্ষমতা নেই। রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন, সামরিক ব্যয় এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে দেশটির আইনসভা কংগ্রেস।
আর সেই কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েই ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। নির্বাচনে নির্ধারিত হবে, কংগ্রেসের দুই কক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ ও সিনেটে রিপাবলিকানরা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারবে, নাকি ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেবে।
এ নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসন পরিবর্তনের বিষয় নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাকি দুই বছরের শাসন, তাঁর অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতি, এমনকি ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়েও এর ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন কেন হয়?
যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর। অন্যদিকে, কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের সদস্যদের মেয়াদ মাত্র দুই বছর। আর উচ্চকক্ষ সিনেটের সদস্যরা নির্বাচিত হন ছয় বছরের জন্য।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পর, অর্থাৎ তাঁর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে কংগ্রেসের আসনগুলোতে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেটিই মিডটার্ম ইলেকশন বা মধ্যবর্তী নির্বাচন। এ নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে ভোট হয় না। বরং জনগণ ভোট দিয়ে নির্ধারণ করেন, পরবর্তী দুই বছর আইনসভায় তাঁদের প্রতিনিধিত্ব কারা করবেন।
এর মূল উদ্দেশ্য শুধু প্রতিনিধি নির্বাচন নয়; বরং ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ও তাঁর দলের কর্মকাণ্ডের ওপর জনগণের সমর্থন কিংবা অসন্তোষের প্রতিফলন ঘটানো।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ভোটাররা পরবর্তী চার বছরের জন্য একজন প্রেসিডেন্ট বেছে নেন। আর মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁরা মূল্যায়ন করেন, প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর দল কতটা সফল হয়েছে। এ কারণে অনেক সময় মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক অবস্থানের পরীক্ষা হিসেবে দেখা হয়।
কংগ্রেস কী? দুই কক্ষের ক্ষমতা কতটা?
যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার নাম কংগ্রেস। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের মতো এটিও আইন প্রণয়নের প্রতিষ্ঠান। তবে বাংলাদেশের সংসদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস দুই কক্ষবিশিষ্ট। এর একটি নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং অন্যটি উচ্চকক্ষ বা সিনেট।
দুই কক্ষেরই আলাদা দায়িত্ব ও ক্ষমতা রয়েছে। কোনো সাধারণ ফেডারেল বিল আইনে পরিণত করতে সাধারণত দুই কক্ষেই সেটি পাস হতে হয়। এরপর প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ শুধু হাউজে বা শুধু সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই কোনো দল এককভাবে সব আইন পাস করাতে পারে না।
হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ কী এবং এর কাজ কী?
হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ। এখানে মোট ৪৩৫টি ভোটাধিকারসম্পন্ন আসন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের জনসংখ্যার অনুপাতে এসব আসন বণ্টন করা হয়। অর্থাৎ যে অঙ্গরাজ্যের জনসংখ্যা বেশি, সেখানে প্রতিনিধি আসনও বেশি। প্রতিটি প্রতিনিধি নিজ নিজ কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট বা নির্বাচনী এলাকার মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন।
হাউজের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর। তাই মধ্যবর্তী নির্বাচনসহ প্রতি দুই বছরেই ৪৩৫টি আসনে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। হাউজের প্রধান দায়িত্ব ফেডারেল আইন প্রণয়ন, বাজেট ও সরকারি ব্যয়সংক্রান্ত বিল নিয়ে কাজ করা, জনগণের প্রতিনিধিত্ব এবং সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের ওপর নজরদারি করা। বিশেষ করে কর আরোপ ও রাজস্ব আদায়সংক্রান্ত বিল প্রথমে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভে উত্থাপন করতে হয়। ফেডারেল সরকারের বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রেও এই কক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
এ ছাড়া প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট কিংবা অন্য কোনো ফেডারেল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে অভিশংসন বা ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু করার সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে হাউজের।
এবার প্রশ্ন, এখানে কোনো দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে তারা কী সুবিধা পায়?
যে দল হাউজে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, সাধারণত তারাই স্পিকার নির্বাচন করে। স্পিকার হলেন হাউজের প্রধান এবং আইনসভায় দলটির গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুখ।
সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হাউজের বিভিন্ন কমিটির চেয়ারম্যান নির্বাচন ও গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোর নেতৃত্বে প্রভাব বিস্তার করে। কোন বিল কখন আলোচনায় আসবে, কীভাবে ভোট হবে এবং কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সেখানেও তাদের বড় ভূমিকা থাকে।
এ ছাড়া কমিটির মাধ্যমে সরকারি ব্যয়, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, যুদ্ধ পরিচালনা এবং বিভিন্ন নীতির বিষয়ে তদন্ত ও শুনানি করতে পারে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল।
ফলে হাউজের নিয়ন্ত্রণ হাতে থাকলে প্রেসিডেন্টের দল নিজেদের নীতিমালা বাস্তবায়নে তুলনামূলক বেশি সুবিধা পায়। বিপরীতে বিরোধী দল নিয়ন্ত্রণ পেলে প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনের কার্যক্রমের ওপর কঠোর নজরদারি চালাতে পারে।
সিনেট কী এবং এর ক্ষমতা কতটা?
এবার আসা যাক কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে।
যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্যের প্রতিটি থেকে দুজন করে মোট ১০০ জন সিনেটর নির্বাচিত হন। এখানে অঙ্গরাজ্যের জনসংখ্যা বিবেচনা করা হয় না। জনসংখ্যা যতই হোক, প্রতিটি রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব সমান।
সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর। তবে প্রতি দুই বছর পরপর সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ জন্য সিনেটকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। ক্লাস ওয়ান, ক্লাস টু এবং ক্লাস থ্রি। এই পদ্ধতির কারণে প্রতি নির্বাচনে পুরো সিনেট পরিবর্তিত হয় না। বরং প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্য নতুন করে নির্বাচিত হন এবং বাকি দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য তাঁদের দায়িত্বে বহাল থাকেন।
সিনেটের কাজও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাউজের মতো সিনেটেও আইন প্রণয়ন, বাজেট, সরকারি ব্যয় এবং জাতীয় নীতিনির্ধারণী বিষয়ে ভোট হয়। তবে সিনেটের কিছু বিশেষ সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট যাঁদের মন্ত্রিসভার সদস্য, রাষ্ট্রদূত, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ফেডারেল পদে মনোনয়ন দেন, তাঁদের নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষমতা সিনেটের হাতে।
এ ছাড়া প্রেসিডেন্টের করা আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনের ক্ষেত্রেও সিনেটের ভূমিকা রয়েছে। এ ধরনের চুক্তি অনুমোদনে উপস্থিত সিনেটরদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন। এমনকি ইমপিচমেন্টের ক্ষেত্রেও হাউজ ও সিনেটের দায়িত্ব আলাদা। হাউজ কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিশংসনের অভিযোগ আনতে পারে। আর সেই অভিযোগের বিচার পরিচালনা করে সিনেট। প্রেসিডেন্টকে দোষী সাব্যস্ত করে পদ থেকে অপসারণ করতে উপস্থিত সিনেটরদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন।
সিনেটে যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা নির্বাচন করে এবং গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলোর নেতৃত্বে প্রভাব বিস্তার করে। বিচারপতি ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের নিয়োগ আটকে দেওয়া কিংবা অনুমোদনের ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ শুধু আইন প্রণয়নের বিষয় নয়, বরং প্রেসিডেন্টের প্রশাসন ও বিচার বিভাগে নিয়োগের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করে।
বর্তমানে কংগ্রেসে কোন দলের অবস্থান কেমন?
এবার দেখা যাক, ২০২৬ সালের নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের দুই কক্ষে কোন দলের কতজন প্রতিনিধি রয়েছেন।
প্রথমে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ। বর্তমানে ৪৩৫টি ভোটাধিকারসম্পন্ন আসনের মধ্যে রিপাবলিকানদের প্রতিনিধি ২১৮ জন। ডেমোক্র্যাটদের ২১৪ জন। একজন স্বতন্ত্র প্রতিনিধি রয়েছেন এবং দুটি আসন শূন্য। অর্থাৎ অল্প ব্যবধানেই হাউজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে রিপাবলিকান পার্টি। অন্যদিকে, সিনেটে মোট ১০০টি আসনের মধ্যে রিপাবলিকানদের ৫৩ জন, ডেমোক্র্যাটদের ৪৫ জন এবং স্বতন্ত্র দুইজন সিনেটর রয়েছেন। এই দুই স্বতন্ত্র সিনেটর সাংগঠনিকভাবে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করেন। ফলে সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ৫৩-এর বিপরীতে ডেমোক্র্যাটপন্থী অবস্থান ৪৭।
দুই কক্ষেই বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির হাতে। ফলে ৩ নভেম্বরের নির্বাচন তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৬ সালে সিনেটের কোন কোন আসনে নির্বাচন?
এবার আসা যাক নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসাব-নিকাশে।
সিনেটের ১০০টি আসনের সবগুলোতে একসঙ্গে নির্বাচন হয় না। প্রতি দুই বছর পরপর তিনটি শ্রেণির মধ্যে একটি শ্রেণির আসনে নির্বাচন হয়। ২০২৬ সালের নিয়মিত নির্বাচনে সিনেটের ক্লাস টু বা দ্বিতীয় শ্রেণির ৩৩টি আসনে ভোট হবে। এই ৩৩টি আসনের মধ্যে বর্তমানে ২০টি রিপাবলিকানদের দখলে এবং ১৩টি ডেমোক্র্যাটদের দখলে রয়েছে।
রিপাবলিকানদের দখলে থাকা ২০টি আসন হলো- আলাবামা, আলাস্কা, আরকানসাস, আইডাহো, আইওয়া, কানসাস, কেন্টাকি, লুইজিয়ানা, মেইন, মিসিসিপি, মন্টানা, নেব্রাস্কা, নর্থ ক্যারোলাইনা, ওকলাহোমা, সাউথ ক্যারোলাইনা, সাউথ ডাকোটা, টেনেসি, টেক্সাস, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া এবং ওয়াইয়োমিং। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের দখলে থাকা ১৩টি আসন হলো- কলোরাডো, ডেলাওয়ার, জর্জিয়া, ইলিনয়, ম্যাসাচুসেটস, মিশিগান, মিনেসোটা, নিউ হ্যাম্পশায়ার, নিউ জার্সি, নিউ মেক্সিকো, ওরেগন, রোড আইল্যান্ড এবং ভার্জিনিয়া।
তবে এখানেই শেষ নয়। ২০২৬ সালের নির্বাচনে ফ্লোরিডা ও ওহাইও অঙ্গরাজ্যেও সিনেটের দুটি বিশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই দুটি আসনই বর্তমানে রিপাবলিকানদের দখলে। ফলে নিয়মিত ৩৩টি আসনের সঙ্গে এই দুটি যোগ হয়ে মোট ৩৫টি সিনেট আসনে ভোট হবে। অর্থাৎ ৩ নভেম্বর সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে মোট ৩৫টির ভাগ্য নির্ধারণ করবেন ভোটাররা।
বাকি ৬৫ আসনের হিসাব
এখন প্রশ্ন, নির্বাচনে অংশ না নেওয়া বাকি ৬৫টি আসনে কোন দলের কতজন সিনেটর রয়েছেন?
বর্তমান দলীয় অবস্থান অনুযায়ী, নির্বাচনের বাইরে থাকা ৬৫টি আসনের মধ্যে ৩১টি রিপাবলিকানদের, ৩২টি ডেমোক্র্যাটদের এবং দুটি স্বতন্ত্র সিনেটরের দখলে রয়েছে। স্বতন্ত্র দুইজনই ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করেন। অর্থাৎ নির্বাচনের ফল যাই হোক, এই ৬৫টি আসনের দলীয় অবস্থান আপাতত অপরিবর্তিত থাকবে।
এবার মূল হিসাব। সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে কতটি আসনে জিততে হবে?
১০০ সদস্যের সিনেটে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৫১টি আসন
নির্বাচনের বাইরে থাকা ৬৫টি আসনের মধ্যে রিপাবলিকানদের রয়েছে ৩১টি। ফলে ৫১ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে নির্বাচনে থাকা ৩৫টি আসনের মধ্যে অন্তত ২০টিতে রিপাবলিকানদের জয় প্রয়োজন। অর্থাৎ কোনো ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত আসন দখল করতে না পারলে নিজেদের দখলে থাকা ২২টি রিপাবলিকান আসনের অন্তত ২০টি ধরে রাখতে হবে দলটিকে।
তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট সিনেটে ভোট সমান হলে টাই-ব্রেকিং ভোট দিতে পারেন। বর্তমানে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স রিপাবলিকান দলের। তাই নির্বাচনের পর সিনেটে দুই পক্ষের আসন ৫০-৫০ হলে ভ্যান্সের টাই-ব্রেকিং ভোটে রিপাবলিকানরা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনের ৩৫টি আসনের মধ্যে ১৯টি পেলেও দলটির হাতে মোট ৫০টি আসন থাকবে। তবে এই হিসাব নির্ভর করছে অন্য দলের সঙ্গে কোনো সিনেটরের অবস্থান পরিবর্তন কিংবা শূন্য আসনের মতো অপ্রত্যাশিত ঘটনা না ঘটার ওপর।
ইরান যুদ্ধ ও মধ্যবর্তী নির্বাচনের রাজনৈতিক প্রভাব
এবার আসা যাক এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত একটি ইস্যুতে ইরান যুদ্ধ।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় এর প্রভাব এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনীতি এবং আসন্ন নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়ছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে বেড়েছে জ্বালানির দাম। এর প্রভাব পড়েছে পরিবহন, পণ্য সরবরাহ ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের দাম দাঁড়িয়েছে ৪ ডলার ৩৩ সেন্টে, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ৪৫ শতাংশ বেশি। ডিজেলের দাম বেড়েছে ৬৮ শতাংশ। মুডিস অ্যানালিটিকসের হিসাব অনুযায়ী, জ্বালানি ব্যয়, সুদের হার ও সামরিক খরচের সম্মিলিত প্রভাবে একটি মার্কিন পরিবারের আর্থিক চাপ প্রায় দুই হাজার ডলার বেড়েছে।
অন্যদিকে, ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় দাঁড়িয়েছে আনুমানিক ৪৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার। পেন্টাগনের এই হিসাব সামনে আসার পর যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয়, যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনগণের মনোভাবেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের ৮ অক্টোবর প্রকাশিত জরিপে দেখা যায়, ইরানে সামরিক অভিযান পরিচালনায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভূমিকার প্রতি অসন্তুষ্ট ৬৫ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। বিপরীতে সমর্থন জানিয়েছেন ৩৩ শতাংশ। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৭ শতাংশ মনে করেন, যুদ্ধ আরও এক বছরের বেশি সময় চলতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে। কারণ, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের প্রতি অসন্তোষ থাকলে তার প্রভাব কংগ্রেস নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভোটেও পড়তে পারে।
তবে যুদ্ধের প্রভাব শুধু রিপাবলিকানদের জন্যই নয়, ডেমোক্র্যাটদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা যুদ্ধের ব্যয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে ভোটারদের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করতে পারেন।
এখানে কংগ্রেসের ক্ষমতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, যুদ্ধ ঘোষণা, সামরিক বাহিনীর অর্থায়ন এবং সরকারি ব্যয় অনুমোদনে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হলেও যুদ্ধের জন্য অর্থ বরাদ্দ ও প্রশাসনের জবাবদিহির ক্ষেত্রে আইনসভার ভূমিকা রয়েছে।
ফলে নির্বাচনের পর ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ইরান যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে তদন্ত, শুনানি এবং প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারবেন। এমনকি সামরিক অভিযানের অর্থায়ন নিয়ে নতুন শর্ত আরোপের উদ্যোগও নিতে পারেন। তবে কোনো উদ্যোগ আইনে পরিণত করতে দুই কক্ষের অনুমোদন এবং প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর প্রয়োজন হবে। প্রেসিডেন্ট ভেটো দিলে দুই কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থনে তা অতিক্রম করতে হবে। অর্থাৎ নির্বাচনের ফল ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ সরাসরি নির্ধারণ না করলেও ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক নীতির ওপর কংগ্রেসের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে এই নির্বাচনের ওপর।
সব মিলিয়ে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। হাউজ ও সিনেট, দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে পরবর্তী দুই বছর তাঁর প্রশাসনের আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন এবং গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগের ক্ষেত্রে সুবিধা থাকবে। কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসনকে আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে সামরিক ব্যয় ও পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন বিষয়ে বাড়তি রাজনৈতিক বাধার মুখে পড়তে হতে পারে।
বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা, সবকিছু মিলিয়ে এবারের নির্বাচন শুধু ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রিয়তার পরীক্ষা নয়, বরং আগামী দুই বছরে যুক্তরাষ্ট্র কোন পথে এগোবে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা।

