...|...|...

জাতীয়

বোয়িং থেকে নতুন করে বিমান কেনা লাভের নাকি চাপের?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সন্ধ্যা ৭:৪৩ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ভোর রাত ৪:৩৮
Shares
বোয়িং থেকে নতুন করে বিমান কেনা লাভের নাকি চাপের?

যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে আরও উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। এ সিদ্ধান্ত ঘিরে দেশে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, দেশের ক্রমবর্ধমান বিমানযাত্রীর চাহিদা মেটাতে প্রয়োজন বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, নাকি এর পেছনে বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক কোনো হিসাব রয়েছে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত ও ভারতে দেশটির রাষ্ট্রদূত সার্জিও গর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং থেকে আরও উড়োজাহাজ কিনতে যাচ্ছে। এ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মধ্যে আরেকটি ‘অসাধারন চুক্তি’ হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এর আগে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সঙ্গে বোয়িংয়ের একটি চুক্তি হয়। ওই চুক্তির আওতায় ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার কথা জানানো হয়েছিল। এর মধ্যে ১০টি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার এবং চারটি ৭৩৭ ম্যাক্স উড়োজাহাজ রয়েছে। এসব উড়োজাহাজের বাজারমূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা।

তবে নতুন করে আরও উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এত বড় ব্যয় কতটা যৌক্তিক।

বর্তমানে সরকার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের কথা বলছে। একই সময়ে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। নতুন ঋণের জন্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছেও আবেদন করেছে সরকার। অর্থের সংকটের কারণে বড় প্রকল্প গ্রহণে সতর্ক থাকার কথাও বলা হচ্ছে।

নতুন উড়োজাহাজ কেনার পেছনে কোনো চাপ নেই বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রয়োজন অনুযায়ীই যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশকে একটি এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায় সরকার। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে দেশের এভিয়েশন খাতে ৭০ থেকে ৮০টি কিংবা তারও বেশি বড় উড়োজাহাজের প্রয়োজন হতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী নীতিগতভাবে বোয়িংয়ের কাছ থেকে বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বহরের সক্ষমতা বাড়ানো না হলে নতুন রুট চালু করা সম্ভব হবে না এবং আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহনের বাজারে বাংলাদেশ ব্যবসা হারাতে পারে।

আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা (আইএটিএ) এর বিভিন্ন সময়ের তথ্য পর্যালোচনা করে এভিয়েশন খাতের বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত আন্তর্জাতিক রুটের মোট বাজারে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোর অংশ প্রায় ২৫ শতাংশ। বিপরীতে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর দখলে রয়েছে প্রায় ৭৫ শতাংশ বাজার।

বর্তমানে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। আরও ১০টি উড়োজাহাজ লিজ নেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন বিমানমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।

অন্যদিকে বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা ২০২৭ সালের মধ্যে তাদের বহরে আরও ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রুটে এসব বিমান ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।

এয়ারবাসও বাংলাদেশকে ১০টি উড়োজাহাজ সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি এ৩৫০-৯০০ ওয়াইডবডি এবং চারটি এ৩২১ নিও ন্যারোবডি উড়োজাহাজ রয়েছে।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি চাহিদা বিবেচনায় আগে থেকেই উড়োজাহাজের অর্ডার দেওয়া হলে তুলনামূলক কম দামে তা পাওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, আগামী ১০ বছরে দেশে বিমানযাত্রীর সংখ্যা বর্তমানের তুলনায় দুই থেকে আড়াই গুণ হতে পারে। তাই বহরের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বড় বহর পরিচালনার সক্ষমতা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের আছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি। যথাযথ বাণিজ্যিক সক্ষমতা তৈরি না হলে নতুন উড়োজাহাজগুলো একসময় প্রতিষ্ঠানের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

আরেক এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম বলেন, উড়োজাহাজ কেনার পেছনে বিমানের বাণিজ্যিক ও বিপণন কৌশল পরিষ্কার করা প্রয়োজন। যাত্রী চাহিদা, সম্ভাব্য রুট ও বাজার বিশ্লেষণের ভিত্তিতে কেনাকাটার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করা হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতো।

তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। ফলে উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তে বাণিজ্যিক চাহিদার পাশাপাশি রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক বিষয় কাজ করছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন উড়োজাহাজ কেনা বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের জন্য সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে এর সুফল পেতে হলে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

নতুন বহর পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত পাইলট, প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ান তৈরি, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক রুটের কার্যকর বাণিজ্যিক পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের এভিয়েশন খাত বর্তমানে বছরে প্রায় এক কোটি যাত্রী পরিবহন করছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যাত্রীসংখ্যা দ্রুত বাড়ার পূর্বাভাস রয়েছে। ফলে ভবিষ্যৎ চাহিদা বিবেচনায় বহর সম্প্রসারণের প্রয়োজন থাকলেও সেই বিনিয়োগ কতটা লাভজনক হবে, তা নির্ভর করবে পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্যিক সক্ষমতার ওপর।

অর্থাৎ, প্রশ্নটি শুধু কতগুলো বিমান কেনা হবে তা নয় বরং সেগুলো কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করে লাভজনক করা যাবে সেটিই এখন বড় বিষয়।