...|...|...

মতামত

পেয়ারায় ভারী ধাতু: কৃষকের হাতে গেল কীভাবে, দায় নেবে কে?

মো. শহিদুল ইসলাম
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:২৩ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১:৩৬
Shares
পেয়ারায় ভারী ধাতু: কৃষকের হাতে গেল কীভাবে, দায় নেবে কে?

পেয়ারাতেও মিলছে ভারী ধাতু, হুমকির মুখে জনস্বাস্থ্য

রাজশাহী বিভাগের বাণিজ্যিক বাগানে উৎপাদিত পেয়ারায় অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি ভারী ধাতু পাওয়া গেছে- এই খবর নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। কিন্তু এই উদ্বেগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি শুধু পেয়ারা নয়; বরং এর চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো-ভারী ধাতু এলো কোথা থেকে, কীভাবে তা কৃষকের উৎপাদন ব্যবস্থায় ঢুকল এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে পৌঁছাল? আর যদি কৃষক নিজে জেনে-বুঝে কোনো ক্ষতিকর পদার্থ ব্যবহার না করে থাকেন, তাহলে এই দূষণের দায় কি আবারও তাঁর ঘাড়েই চাপানো হবে?

সম্প্রতি প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা আমাদের সামনে এই প্রশ্নগুলো নতুন করে হাজির করেছে। গবেষণাটি রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলার দশটি এলাকায় বাণিজ্যিক খামার ও বাড়ির বাগানে উৎপাদিত পেয়ারার মধ্যে আর্সেনিক, সীসা, ক্যাডমিয়াম ও তামার উপস্থিতি তুলনা করেছে। গবেষণাটি ২০২৫ সালে পরিচালিত হয় এবং ২০২৬ সালের আগস্টে Journal of Food Composition and Analysis-এ প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমেই গবেষকদের ধন্যবাদ দেওয়া দরকার। খাদ্যে ভারী ধাতুর মতো একটি অদৃশ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির বিষয় সামনে আনা সহজ কাজ নয়। এ ধরনের গবেষণা আতঙ্ক তৈরির জন্য নয়; বরং এমন একটি সমস্যা চিহ্নিত করার জন্য, যা চোখে দেখা যায় না, গন্ধে বোঝা যায় না, স্বাদেও ধরা পড়ে না। খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এই অদৃশ্য ঝুঁকিগুলোই অনেক সময় সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।

তবে গবেষণাটিকে বোঝার ক্ষেত্রেও যথেষ্ট সতর্কতা প্রয়োজন। এটি বাংলাদেশের সব পেয়ারা নিয়ে করা জাতীয় পর্যায়ের জরিপ নয়। গবেষণাটি রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও জয়পুরহাট-এই আট জেলার নির্বাচিত দশটি এলাকায় পরিচালিত হয়েছে। প্রতিটি এলাকায় একটি বাড়ির বাগান ও একটি বাণিজ্যিক বাগান থেকে পরিপক্ব পেয়ারা সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে এখান থেকে বাংলাদেশের সব পেয়ারা, এমনকি রাজশাহী বিভাগের সব বাণিজ্যিক পেয়ারা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বৈজ্ঞানিকভাবে সমীচীন হবে না। গবেষকদের বক্তৃতাও একই-এই ফলাফল দেশের সব বাণিজ্যিক পেয়ারা সম্পর্কে সাধারণীকরণ করা যাবে না। 
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি গবেষণা কোনো নির্দিষ্ট এলাকার নির্দিষ্ট নমুনায় ঝুঁকির সংকেত শনাক্ত করতে পারে; কিন্তু সেই সংকেতকে জাতীয় বাস্তবতার চূড়ান্ত ছবি হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। আবার উল্টো দিক থেকেও একই কথা সত্য-গবেষণার পরিধি সীমিত বলে ফলাফলকে হালকাভাবে নেওয়ারও সুযোগ নেই। বরং একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে এমন সংকেত পাওয়া গেলে সেটিই হওয়া উচিত আরও বড়, আরও বিস্তৃত এবং জাতীয়ভাবে সমন্বিত অনুসন্ধানের সূচনা।

গবেষণার ফলাফল অবশ্যই গুরুত্ব পাওয়ার মতো। বাণিজ্যিক খামারের পেয়ারায় আর্সেনিকের সর্বোচ্চ গড় ঘনত্ব পাওয়া গেছে ৩.৮৪ মিলিগ্রাম/কেজি, সীসা ২.০৫, ক্যাডমিয়াম ১.৮৮ এবং তামা ৯.০৪ মিলিগ্রাম/কেজি-শুষ্ক ওজনের ভিত্তিতে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাণিজ্যিক খামারের প্রায় ৩০ শতাংশ নমুনায় আর্সেনিক, প্রায় ৭০ শতাংশে সীসা এবং প্রায় ৯০ শতাংশে ক্যাডমিয়ামের মাত্রা সংশ্লিষ্ট অনুমোদিত সীমার ওপরে ছিল। তামার ক্ষেত্রেও প্রায় অর্ধেক বাণিজ্যিক নমুনায় সীমা অতিক্রম দেখা গেছে। 

কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রায়ই আলোচনার বাইরে চলে যাচ্ছে-গবেষণাটি শুধু বাণিজ্যিক বাগানের পেয়ারা পরীক্ষা করেনি; বাড়ির বাগানের পেয়ারাও একই গবেষণার অংশ ছিল। বাড়ির বাগানের কোনো নমুনায় আর্সেনিক বা সীসার অনুমোদিত সীমা অতিক্রম পাওয়া যায়নি। তবে ক্যাডমিয়ামের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ বাড়ির বাগানের নমুনায় সীমা অতিক্রম পাওয়া গেছে। তামার ক্ষেত্রে বাড়ির বাগানের নমুনাগুলো অনুমোদিত সীমার মধ্যে ছিল। অর্থাৎ বাড়ির বাগানের পেয়ারা তুলনামূলকভাবে কম দূষিত হলেও তাকে একেবারে ঝুঁকিমুক্ত বলা যাচ্ছে না।
এখানেই গবেষণাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি রয়েছে। শুধু বাণিজ্যিক পেয়ারা পরীক্ষা করলে হয়তো প্রশ্নটি দাঁড়াত-‘চাষের পেয়ারা কি নিরাপদ?’ কিন্তু বাড়ির বাগানের সঙ্গে তুলনা করার ফলে প্রশ্নটি আরও গভীর হয়েছে-‘উৎপাদন ব্যবস্থার পার্থক্য কি ভারী ধাতু জমার সঙ্গে সম্পর্কিত?’ এই তুলনা আমাদের অনুসন্ধানকে কৃষকের বিরুদ্ধে অভিযোগের জায়গা থেকে সরিয়ে কৃষি-উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যায়।

গবেষণায় মানুষের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকিও মূল্যায়ন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার নির্ধারিত পদ্ধতির ভিত্তিতে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসাব করা হয়েছে। ফলাফলে বাণিজ্যিক খামারের নমুনায় সম্ভাব্য non-carcinogenic risk-এর সংকেত এবং শিশুদের ক্ষেত্রে প্রায় সব নমুনায় ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে; বাণিজ্যিক নমুনার total target carcinogenic risk-ও গবেষণায় ব্যবহৃত নির্ধারিত benchmark-এর ওপরে ছিল। তবে এসব হলো exposure ও risk model-এর ভিত্তিতে করা সম্ভাব্য ঝুঁকির হিসাব-কোনো ব্যক্তির শরীরে ক্যানসার হয়েছে বা হবেই, এমন চিকিৎসাগত প্রমাণ নয়। এই পার্থক্যটি জনসাধারণের কাছে স্পষ্ট করা জরুরি। 

কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে-ভারী ধাতু এলো কোথা থেকে?
গবেষণাটি ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত করেছে, কিন্তু দূষণের নির্দিষ্ট উৎস চিহ্নিত করেনি। নমুনা সংগ্রহ করা জমির মাটি ও সেচের পানিতে ভারী ধাতুর মাত্রা সরাসরি পরীক্ষা করা হয়নি। গবেষকেরাও দূষণের প্রকৃত উৎস নির্ণয়ের জন্য ভবিষ্যৎ গবেষণায় মাটি, সেচের পানি, উদ্ভিদের বিভিন্ন অংশ, ধাতুর রাসায়নিক রূপ এবং source apportionment-এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। অর্থাৎ গবেষণাটি আমাদের বলছে-‘সমস্যার একটি সংকেত পাওয়া গেছে’; এখন পরবর্তী গবেষণার কাজ হলো-‘সমস্যাটি কোথা থেকে এসেছে’ তা অনুসন্ধান করা।

এই জায়গাটিই আমাদের কৃষিনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা যদি শুধু ফল পরীক্ষা করি এবং ফলাফলে ভারী ধাতু পাই, তারপর কৃষককে জিজ্ঞেস করি-‘আপনি কী ব্যবহার করেছেন?’-তাহলে অনুসন্ধানের অর্ধেক পথও আমরা হাঁটতে পারব না। কৃষক যে সার ব্যবহার করেছেন সেটি কোথা থেকে এসেছে? যে কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার করেছেন সেটি কে আমদানি করেছে, কে উৎপাদন করেছে, কে বাজারজাত করেছে? তার উপাদান কী ছিল? সেটি কি নিবন্ধিত ও অনুমোদিত ছিল? কৃষক কি জানতেন সেই উপকরণে ভারী ধাতু থাকার সম্ভাবনা আছে? বাজারে বিক্রি হওয়ার আগে এসব কৃষি উপকরণের গুণমান কে পরীক্ষা করেছে? এগুলো শুধু কৃষকের প্রশ্ন নয়; এগুলো রাষ্ট্রের প্রশ্ন।
বাংলাদেশে কৃষি উপকরণে ভারী ধাতুর উপস্থিতি নিয়ে আগেও গবেষণা হয়েছে। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া বিভিন্ন agrochemical পরীক্ষা করে ক্যাডমিয়াম, সীসা, ক্রোমিয়াম ও নিকেলের উপস্থিতি পাওয়া যায়। গবেষণাটি দেখিয়েছে যে বিভিন্ন ধরনের agrochemical থেকে কৃষিজমিতে ভারী ধাতুর একটি বোঝা তৈরি হতে পারে এবং বিশেষ করে phosphatic fertilizer ও fungicide-এর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য metal burden-এর কথা বলা হয়েছে। গবেষকেরা agrochemical উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য পণ্যের metal content-এর certification বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছেন। আরও সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া insecticide ও fungicide-এ arsenic, copper, iron ও manganese-এর উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়েছে। গবেষণাটিতে একই ধরনের pesticide-এর মধ্যেও metal concentration-এর পার্থক্য পাওয়া গেছে এবং fungicide-এর মাধ্যমে কৃষিজমিতে সম্ভাব্য heavy-metal burden-এর বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষকেরা pesticide manufacturing companies-এর পণ্যের গুণমান যাচাইয়ের জন্য certification-এর প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলা দরকার। এসব গবেষণা থেকে এমন সিদ্ধান্ত টানা যাবে না যে রাজশাহীর পেয়ারায় পাওয়া ভারী ধাতু অবশ্যই সার বা কীটনাশক থেকেই এসেছে। তা বলার জন্য সংশ্লিষ্ট বাগানের মাটি, সেচের পানি, ব্যবহৃত কৃষি উপকরণ এবং ফলের মধ্যে একই ধাতুর উৎসগত সম্পর্ক বা source attribution প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু এই গবেষণাগুলো অন্তত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে-কৃষকের হাতে পৌঁছানো কৃষি উপকরণগুলো আমরা কতটা পরীক্ষা করি?
ভারী ধাতু শুধু কোনো একটি ফল বা কোনো একটি জেলার সমস্যা নয়-এমন উদ্বেগের পেছনেও বাংলাদেশে গবেষণা রয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় কয়েকটি জেলার বাজার থেকে সংগৃহীত সবজি ও ফলে ভারী ধাতু ও কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা করা হয়েছিল। গবেষকেরা বড় পরিসরের গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। একই সময়ে ফলের pesticide residue নিয়েও আলাদা গবেষণা হয়েছে, যেখানে ঢাকা, রাজশাহী, পাবনা ও বগুড়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত ফল পরীক্ষা করা হয়েছিল। 
অর্থাৎ রাজশাহীর পেয়ারার ঘটনাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখারও কারণ নেই। আবার এটিকে ‘বাংলাদেশের সব পেয়ারা দূষিত’ বলারও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং এটি বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থা, মাটি, পানি ও কৃষি উপকরণের গুণমান নিয়ে একটি বড় প্রশ্নের দিকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে।
এই প্রশ্নের কেন্দ্রে কৃষককে দাঁড় করানো যাবে না।রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষক এমনিতেই খরা, অনিয়মিত বৃষ্টি, উচ্চ তাপমাত্রা, সেচনির্ভরতা, উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারের অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়ছেন। এমন অবস্থায় কোনো একটি গবেষণার ফল যদি অসতর্ক শিরোনামের মাধ্যমে ‘রাজশাহীর পেয়ারা’কে সামগ্রিকভাবে অনিরাপদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে, তাহলে তার অর্থনৈতিক অভিঘাত বহন করতে হতে পারে কৃষককেই। অথচ গবেষণাটি এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি যে রাজশাহীর সব পেয়ারা দূষিত। 

আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা নেওয়া দরকার। ২০১৪ সালে রাজশাহীর আমকে ঘিরে formalin ও carbide ব্যবহারের অভিযোগে অভিযান চালানো হয়েছিল। রাজশাহীর বাণেশ্বর ও বিরালদহ বাজারে মোবাইল কোর্ট ৪,২০০ কেজি আম ধ্বংস করে এবং কয়েকজন ব্যবসায়ীকে জরিমানা করে। ওই অভিযানকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাও সংবাদে প্রকাশিত হয়েছিল। 
সেই সময় ঢাকার বাজারেও আমের সরবরাহ কমে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল; রাজধানীতে formalin পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে সরকারি অভিযান শুরু হওয়ার আগে বাজারে আমের সরবরাহ কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছিল বিভিন্ন তথ্য। সেই অভিজ্ঞতার শিক্ষা হওয়া উচিত-খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষার নামে ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, সুনির্দিষ্ট দায় এবং যথাযথ পরীক্ষার ভিত্তিতে। আতঙ্ক যদি প্রমাণের চেয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তার অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হয় কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকেই।

তাই এবার আমাদের প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত ভিন্ন। রাজশীর পেয়ারা বন্ধ করে দেওয়া নয়; রাজশাহীর কৃষককে সন্দেহের চোখে দেখা নয়; গবেষকদের প্রশ্নবিদ্ধ করা তো নয়ই। বরং গবেষণার ফলাফলকে ভিত্তি করে একটি জাতীয় ও সমন্বিত অনুসন্ধান শুরু করা দরকার।
সেই অনুসন্ধানে শুধু ফল পরীক্ষা করলে হবে না। একই বাগানের পেয়ারা, মাটি, সেচের পানি, সার, কীটনাশক, ছত্রাকনাশক এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণ একই সঙ্গে পরীক্ষা করতে হবে। উৎপাদনের ইতিহাস জানতে হবে। ব্যবহৃত কৃষি উপকরণের প্রস্তুতকারক, আমদানিকারক ও সরবরাহব্যবস্থার তথ্য অনুসরণ করতে হবে। কোথায় ভারী ধাতু বেশি, কোথায় কম,তার ভৌগোলিক চিত্র তৈরি করতে হবে। বাড়ির বাগান ও বাণিজ্যিক বাগানের পার্থক্যও আরও বড় নমুনায় যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য প্রধান ফল উৎপাদনকারী অঞ্চলও গবেষণার আওতায় আনতে হবে।

এ ধরনের অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশের সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থার আলোচনাতেও উঠে এসেছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ১,৭১৩টি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করে ৫৭১টিতে adulteration, contamination বা quality deviation শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে। অবশ্য এই পরিসংখ্যানকে রাজশাহীর পেয়ারা বা ভারী ধাতুর সরাসরি প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না; এটি শুধু দেখায় যে খাদ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নিয়মিত surveillance ও data-based monitoring কতটা গুরুত্বপূর্ণ। 
আর যদি প্রমাণ পাওয়া যায় যে কোনো কৃষক অনুমোদিত ও নিরাপদ বলে বাজারজাত করা কৃষি উপকরণ ব্যবহার করে উৎপাদন করেছেন, কিন্তু সেই উপকরণে অননুমোদিত মাত্রায় ভারী ধাতু ছিল এবং তার ফলে কৃষিপণ্য দূষিত হয়েছে, তাহলে দায় কার? এই প্রশ্নের উত্তরও রাষ্ট্রকে দিতে হবে। কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত পণ্য নিয়ে একা বাজারে দাঁড় করিয়ে দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থায় কৃষকের সুরক্ষাও ভোক্তার সুরক্ষার অংশ।
কারণ নিরাপদ খাদ্য ও নিরাপদ কৃষি একে অপরের বিপরীত নয়। ভোক্তার অধিকার রক্ষা করতে গিয়ে কৃষকের অধিকার বিসর্জন দেওয়া যাবে না। আবার কৃষকের স্বার্থ রক্ষার নামে খাদ্যে দূষণের প্রশ্নও উপেক্ষা করা যাবে না। প্রকৃত সমাধান হলো এমন একটি কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে মাঠ থেকে বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের দায় ও জবাবদিহি স্পষ্ট থাকবে।
সবচেয়ে জরুরি হলো ভাষার সতর্কতা। ‘রাজশাহীর পেয়ারা বিষাক্ত’-এমন একটি বাক্য হয়তো দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে, কিন্তু এটি গবেষণার ফলাফলের চেয়ে অনেক বড় দাবি। বরং বলা উচিত-রাজশাহী বিভাগের নির্বাচিত এলাকায় বাণিজ্যিক পেয়ারার কিছু নমুনায় অনুমোদিত সীমার বেশি ভারী ধাতু পাওয়া গেছে এবং এর উৎস নির্ণয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। এই ভাষা আতঙ্ক কমায়, কিন্তু সমস্যাকে ছোট করে না। বরং বৈজ্ঞানিক সত্যকে যথাযথভাবে তুলে ধরে। 
আজকের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় প্রশ্ন তাই ‘রাজশাহীর পেয়ারা নিরাপদ কি না’-এখানেই থেমে থাকা নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত-কোন পরিস্থিতিতে, কোন এলাকায়, কোন উৎপাদন ব্যবস্থায়, কোন উপকরণের মাধ্যমে এবং কীভাবে ভারী ধাতু খাদ্যশৃঙ্খলে ঢুকছে?
গবেষকরা একটি দরজা খুলে দিয়েছেন। এখন সেই দরজা দিয়ে রাষ্ট্র, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, কৃষি বিভাগ এবং নীতিনির্ধারকদের এগিয়ে যেতে হবে। এই গবেষণাকে অস্বীকার করা যেমন ভুল হবে, তেমনি এর সীমিত পরিধিকে জাতীয় আতঙ্কে রূপ দেওয়াও ভুল হবে।
কৃষককে দোষী বানানো সবচেয়ে সহজ কাজ। কারণ তাঁর জমি দেখা যায়, তাঁর ফল দেখা যায়, তাঁর ওপর অভিযান চালানো যায়। কিন্তু কৃষকের হাতে যে সার, কীটনাশক বা অন্যান্য কৃষি উপকরণ পৌঁছায়, তার উৎপত্তি, মান, সরবরাহব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রণের জবাবদিহি খুঁজে বের করা অনেক কঠিন। অথচ খাদ্যনিরাপত্তার প্রকৃত পরীক্ষা সেখানেই।
রাজশাহীর পেয়ারার এই গবেষণা তাই আতঙ্কের ঘণ্টা নয়; এটি সতর্কতার ঘণ্টা। এই ঘণ্টার শব্দ শুনে কৃষকের দিকে আঙুল তোলার আগে আমাদের তাকাতে হবে পুরো কৃষি-সরবরাহব্যবস্থার দিকে। জানতে হবে-দূষণ যদি সত্যিই কৃষকের বাগানে পৌঁছে থাকে, তবে তা কৃষকের হাতে গেল কীভাবে? আর সেই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে পরের প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট হবে-কৃষকের হাতে দূষণ পৌঁছে দেওয়ার দায় নেবে কে?

তথ্যসূত্র :
১. মূল গবেষণা-Journal of Food Composition and Analysis (2026)
Md. Sakhawot Hossain et al. “Comparative assessment of heavy metal contamination and non-carcinogenic and carcinogenic health risks in guava (Psidium guajava L.) from home gardens and commercial farms in Rajshahi Division, Bangladesh.” Journal of Food Composition and Analysis, 158 (2026), 109433. DOI: 10.1016/j.jfca.2026.109433.
মূল গবেষণার পূর্ণাঙ্গ পৃষ্ঠা — ScienceDirect
২. রাজশাহীর পেয়ারা গবেষণা নিয়ে ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সংবাদ প্রতিবেদন
সময়-এর আলো -“বাণিজ্যিক পেয়ারায় মিলল অনুমোদিত মাত্রার বেশি ভারী ধাতু”
৩. Agrochemicals-এ heavy metals — Environmental Monitoring and Assessment (2024)
M. Aktaruzzaman et al. “Toxic heavy metals content in different agrochemicals available in markets of Bangladesh and their loads to the agricultural lands.” Environmental Monitoring and Assessment, 196 (2024), 1053.PubMed - গবেষণার পূর্ণ তথ্য ও abstract
৪. Insecticides ও fungicides-এ potentially toxic metals - Environmental Advances (2026)
“Potentially toxic metal contents in common insecticides and fungicides sold in Bangladeshi marketplaces and their burden to farm soils.”
ScienceDirect - মূল গবেষণা
৫. বাংলাদেশে ফল ও সবজিতে heavy metals ও pesticide residues — The Daily Star (2024) The Daily Star-“Health hazards lurking in veggies, fruits”
৬. বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তা ও contamination surveillance - The Daily Star (2026)
The Daily Star-“33% food samples tested unsafe in FY 2024-25”
৭. রাজশাহীর আমে formalin/carbide নিয়ে ২০১৪ সালের অভিযান - Prothom Alo
Prothom Alo- “4200-kg formalin-laced mango destroyed in Rajshahi”
৮. ২০১৪ সালে formalin drive ও আমের বাজারে প্রভাব-The Daily Star
The Daily Star- “Supply falls as govt set to start drive”

নিবন্ধ, সাক্ষাৎকার, প্রতিক্রিয়া প্রভৃতিতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। টাইমস টুডের সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে নিবন্ধ ও সাক্ষাৎকারে প্রকাশিত মত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। প্রকাশিত লেখাটির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ, তথ্য-উপাত্ত, রাজনৈতিক, আইনগতসহ যাবতীয় বিষয়ের দায়ভার লেখকের, টাইমস টুডে কর্তৃপক্ষের নয়।