আমন ধানের মৌসুমে জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে খুলনার কয়রা উপজেলায় ইউরিয়া ও টিএসপি সারের সংকট দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা। প্রয়োজনীয় সার পেতে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ঘুরতে হচ্ছে তাদের। কোথাও দোকান বন্ধ, কোথাও চাহিদার তুলনায় কম সার দেওয়া হচ্ছে। আবার কিছু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও তুলেছেন কৃষকরা।
তবে কৃষি বিভাগের দাবি, সারের বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। ফলে একদিকে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সার না পাওয়ার অভিযোগ, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট বিভাগের পরিদর্শনে অতিরিক্ত দামে বিক্রির প্রমাণ না পাওয়ার দাবি দুই বিপরীত বক্তব্যে কয়রায় আমন মৌসুমের সার ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি উপজেলার কয়রা বাজার, ফুলতলা, গিলাবাড়ি ও আহমদি বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষকদের সাথে কথা বলে সার সংকটের অভিযোগ পাওয়া যায়। কৃষকদের ভাষ্য, বিশেষ করে টিএসপি সারের সংকট বেশি। ইউরিয়া সারও প্রয়োজনীয় পরিমাণে পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের।
গিলাবাড়ি বাজারে সার কিনতে আসা কয়েকজন কৃষক জানান, চাহিদা অনুযায়ী ইউরিয়া পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও সার থাকলেও কৃষকের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমাণ দেওয়া হচ্ছে না। ফলে আমন ধানের জমিতে নির্ধারিত সময়ে সার প্রয়োগ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা।
খান সাহেব কোমরউদ্দীন ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক ও কৃষক আশরাফুল আলম বলেন, গত তিন দিন ধরে তিনি নিজে ইউরিয়া সারের জন্য ইউনিয়নের সার ডিলার ও ওয়ার্ডের সাব-ডিলারদের কাছে ঘুরছেন। শুধু তিনি নন, তার মতো অনেক কৃষককেও একইভাবে হয়রান হতে হচ্ছে।
আশরাফুল আলমের ভাষ্য, জায়গাভেদে বিভিন্ন শর্তে কৃষকদের জর্জরিত হতে হচ্ছে। কেউ বলছেন ১০ কেজি, কেউ ২০ কেজি, আবার কেউ ৩০ কেজির বেশি একজন কৃষককে ইউরিয়া সার দেওয়া যাবে না। যে কৃষক ১০-১৫ বিঘা জমিতে ধান রোপণ করেছেন, তার অবস্থা একবার ভাবুন।
কৃষকদের অভিযোগ, জমির পরিমাণ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ায় অনেকেই সময়মতো জমিতে ইউরিয়া ও টিএসপি প্রয়োগ করতে পারছেন না। আমন ধানের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সার প্রয়োগে বিলম্ব হলে ফলন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
কৃষকদের প্রশ্ন, যদি বাজারে পর্যাপ্ত সার সরবরাহ থাকে, তাহলে কেন তাদের একাধিক বাজারে ঘুরতে হচ্ছে? আর যদি সরবরাহে কোনো ঘাটতি না থাকে, তাহলে কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার মিলছে না কেন?
সারের দাম বেশি নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে কয়রা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তিলক ঘোষ গিলাবাড়ি বাজারে সরেজমিনে তদন্ত করেছেন। তিনি জানান, সেখানে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি।
তবে কৃষকদের দাবি, শুধু একটি বাজারের পরিস্থিতি দেখে সার সংকটের প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়। তাদের ভাষ্য, উপজেলার বিভিন্ন বাজারে সার খুঁজতে গিয়ে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার না পাওয়ার অভিজ্ঞতা হচ্ছে তাদের।
এ অবস্থায় কৃষকদের দাবি, উপজেলার প্রতিটি বাজারে ইউরিয়া ও টিএসপি সারের মজুত, ডিলার-সাবডিলারদের বরাদ্দ, বিক্রির পরিমাণ এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি হচ্ছে কি না এসব বিষয় নিয়মিত তদারক করা হোক।
কয়রার মাঠপর্যায়ের কৃষকদের বক্তব্য এবং কৃষি বিভাগের বক্তব্যের মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কৃষকের হাতে প্রয়োজনীয় সার পৌঁছাচ্ছে কি না, তা শুধু গুদাম বা ডিলারের মজুত দিয়ে নয়; কৃষক তার জমির প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত দামে সার পাচ্ছেন কি না সেটিই সরবরাহ ব্যবস্থার সফলতার মূল মাপকাঠি।
আমন মৌসুমে কৃষকের জমিতে সার প্রয়োগের সময় পেরিয়ে গেলে পরবর্তী সময়ে সরবরাহ বাড়ালেও তার সুফল কমে যেতে পারে। তাই কৃষকদের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে উপজেলার বিভিন্ন বাজারে সরেজমিনে তদারকি, ডিলারদের মজুত ও বরাদ্দের হিসাব যাচাই এবং বাজারে প্রকৃত সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের দাবি উঠেছে।
কৃষকদের আশঙ্কা, সময়মতো ইউরিয়া ও টিএসপি না পেলে শুধু তাদের বাড়তি ভোগান্তিই নয়, আমন ধানের উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে কয়রার সার বাজারে কাগজে সরবরাহ কত আর কৃষকের হাতে বাস্তবে কত এই হিসাবই এখন সামনে আনার দাবি কৃষকদের।


