এবারের ব্যালন ডি’অর জয়ের অন্যতম দাবিদার বায়ার্ন মিউনিখের ইংলিশ স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন। গত মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ৭৩টি গোল করেছেন ৩৩ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার(২৬ অক্টোবর) নিজের শহর লন্ডনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানে বিশেষ একটি রাতের প্রত্যাশা করছেন তিনি। তবে লামিনে ইয়ামাল, কিলিয়ান এমবাপ্পে ও অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের কারণে পুরস্কার জয়ের লড়াইটা মোটেও সহজ হবে না।
বুধবার চ্যাম্পিয়নস লিগে আর্সেনালের বিপক্ষে ২-২ গোলে ড্র করা ম্যাচে গোল করার পাশাপাশি দলের আক্রমণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কেইন। ম্যাচ শেষে ব্যালন ডি’অর জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “আমি এটা নিয়ে ভাবার চেষ্টা করি না। অবশ্যই, এটা কঠিন।
“অনেক গুঞ্জন চলছে, তাই সেগুলো থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি। সোমবারের রাতটা যতটা সম্ভব উপভোগ করতে চাই। এটা বড় একটি উপলক্ষ এবং বড় আয়োজন।”
গত মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ৭৩ গোল করে ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলসংখ্যার রেকর্ড গড়েছেন কেইন। এক মৌসুমে তার চেয়ে বেশি গোলের কীর্তি রয়েছে শুধু লিওনেল মেসির। ২০১০-১১ মৌসুমে ৮২ গোল করেছিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
বুধবার আর্সেনালের বিপক্ষেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন কেইন। একসময় টটেনহ্যামের হয়ে খেলা এই স্ট্রাইকার জার্মানিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে আরও পরিপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন। ম্যাচে একদিকে যেমন আক্রমণ গড়ে তুলতে পেছনে নেমে গোলকিক নেওয়ার দায়িত্ব পালন করেছেন, অন্যদিকে নিখুঁত লম্বা পাসে আলফোনসো ডেভিসের গোলের পথ তৈরি করে দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ার্ধে পেনাল্টি আদায় করে নিজেই সেটি থেকে গোল করেন কেইন। তাতে এগিয়ে যায় বায়ার্ন। তবে শেষ দিকে ইংল্যান্ড সতীর্থ ডেকলান রাইস গোল করলে ২-২ সমতায় শেষ হয় ম্যাচ।
ব্যালন ডি’অরের লড়াইয়ে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা
এবারের ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে কেইনকে এগিয়ে রাখছেন অনেকেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইগুলোর একটিতে তার সামনে রয়েছেন স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী দুই তারকা লামিনে ইয়ামাল ও রদ্রি। এ ছাড়া আছেন ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং বায়ার্নে কেইনের সতীর্থ মাইকেল অলিসে।
ইয়ামাল ও এমবাপ্পে নিজেদের যোগ্যতার পক্ষে প্রকাশ্যে কথা বললেও কেইন বরাবরের মতোই সংযত। পুরস্কার নিয়ে সংবাদমাধ্যমের একের পর এক প্রশ্নের মুখেও নিজের সম্ভাবনা নিয়ে বেশি কিছু বলতে চাননি তিনি।
ব্যালন ডি’অর প্রদানের ক্ষেত্রে সাধারণত তিনটি বিষয় বিবেচনা করা হয়। এগুলো হলো ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ও খেলোয়াড়ের চরিত্র, দলীয় সাফল্য এবং খেলোয়াড়সুলভ আচরণ ও ফেয়ার প্লে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চ্যাম্পিয়নস লিগ কিংবা বিশ্বকাপজয়ী খেলোয়াড়েরা যেমন এই পুরস্কার জিতেছেন, তেমনি অসাধারণ ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের ভিত্তিতেও অনেকে সেরার স্বীকৃতি পেয়েছেন। গোলের হিসাবে কেইন এবার শক্ত অবস্থানে রয়েছেন।
টটেনহ্যামে থাকার সময় দলীয় শিরোপা না জেতার কারণে প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়তেন কেইন। বায়ার্নে যোগ দেওয়ার পর সেই আক্ষেপ অনেকটাই ঘুচেছে। গত বছর লিগ ও কাপ জয়ের পর তার দলীয় ট্রফির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচে। তবে জার্মান ফুটবলে বায়ার্নের একচ্ছত্র আধিপত্য ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে তার জন্য বাড়তি সুবিধা নাও হতে পারে।
গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে উঠেছিল বায়ার্ন। সেখানে শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হওয়া প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের কাছে অল্প ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয় তারা। অন্যদিকে বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড তৃতীয় স্থান অর্জন করে। দলটির অধিনায়ক হিসেবে কেইন ছয়টি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থকে দিয়ে একটি গোল করিয়েছেন।
আর্সেনালের বিপক্ষে গোল করার মধ্য দিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে টানা ১০ ম্যাচে গোল করার কীর্তি গড়েছেন কেইন। এ ক্ষেত্রে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর রেকর্ড থেকে মাত্র এক ম্যাচ দূরে তিনি। এই প্রতিযোগিতায় টানা ১১ ম্যাচে গোল করার রেকর্ড রয়েছে পর্তুগিজ তারকার।
এ বিষয়ে কেইন বলেন, “যখনই আপনি রোনালদোর সাথে কোনো আলোচনায় থাকেন, তখনই বুঝতে হবে আপনি বিশেষ কিছু করছেন, বিশেষ করে এই প্রতিযোগিতায়।”
বায়ার্ন কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানিও কেইনের দলকেন্দ্রিক মানসিকতার প্রশংসা করেছেন। তার মতে, দলীয় শিরোপা জেতার মধ্য দিয়ে কেইন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছেন।
কোম্পানি বলেন, “সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হ্যারিকে সবচেয়ে বেশি খুশি করেছে এখানে এসে অবশেষে প্রথম দলীয় ট্রফিগুলো জেতা।
“এখন যদি সে ব্যালন ডি’অর জিতে নিজের ক্যারিয়ার বা মৌসুমকে আরও মহিমান্বিত করতে পারে, তাহলে যেভাবে সে দলের জন্য খেলে, তাতে সেটি প্রাপ্য হবে।”
আর্সেনালের বিপক্ষে ম্যাচের পর কেইনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন ইংল্যান্ড জাতীয় দলের অধিনায়কের সতীর্থ ডেকলান রাইসও। তার মতে, এবারের ব্যালন ডি’অর জয়ের ক্ষেত্রে কেইনই স্পষ্ট দাবিদার।
রাইস বলেন, “হ্যারি ব্যালন ডি’অরের স্পষ্ট বিজয়ী। তার পরিসংখ্যানই সব বলে দিচ্ছে। সে যে বছর কাটিয়েছে, তা অসাধারণ।
“একজন স্ট্রাইকার হিসেবে প্রথম গোলের জন্য এমন পাস দেওয়া, এরপর যেভাবে পেনাল্টি নেওয়া সে অবিশ্বাস্য। সে অসাধারণ একজন খেলোয়াড়।”
আর্সেনালের বিপক্ষে কেইনের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ইংল্যান্ডের সাবেক মিডফিল্ডার স্টিভেন জেরার্ডও তাকে নিয়ে প্রশংসা করেছেন। জুড বেলিংহামের সাথে একমত হয়ে কেইনকে ইংল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ইংল্যান্ডের হয়ে সর্বশেষ ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন মাইকেল ওয়েন, ২০০১ সালে। অন্যদিকে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে সর্বশেষ এই পুরস্কার জিতেছিলেন কার্ল-হাইনৎস রুমেনিগে, ১৯৮১ সালে।
সব মিলিয়ে সোমবারের অনুষ্ঠান নিয়ে আশাবাদী কেইন। তবে পুরস্কার নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করে আপাতত দলের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলোর দিকেই মনোযোগ দিতে চান তিনি।
কেইন বলেন, “সোমবার একটি বিশেষ রাত হতে পারে। আমাদের অপেক্ষা করে দেখতে হবে।
“আমি এটা নিয়ে খুব বেশি ভাবার চেষ্টা করছি না, কারণ আমাদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ রয়েছে এবং রবিবারও আরেকটি ম্যাচ আছে।
“আমি জানি, এটি বিশাল একটি আয়োজন। আমি অবশ্যই এটির অপেক্ষায় আছি। আশা করি, রাতটি বিশেষ হবে।”




