...|...|...

জাতীয়

থার্ড টার্মিনাল নির্মাণেও ‘বালিশ কাণ্ড’, কৃষ্ণচূড়ার চারার দাম লাখ টাকা!

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, দুপুর ১:২৭ | আপডেট: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৭:৫৩
Shares
থার্ড টার্মিনাল নির্মাণেও ‘বালিশ কাণ্ড’,  কৃষ্ণচূড়ার চারার দাম লাখ টাকা!

ছবি: সংগৃহীত

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্পে বড় ধরনের অনিয়ম এবং দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) বিশেষ অডিট রিপোর্টে এই জালিয়াতির চিত্র উঠে এসেছে।

প্রকল্পের সৌন্দর্যবর্ধন খাতে ব্যাপক হরিলুট চালানো হয়েছে। টার্মিনালে ঝাউ, কৃষ্ণচূড়া, কাঠগোলাপসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাধারণ চারাগাছের প্রতিটির দাম দেখানো হয়েছে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। অথচ বিমানবন্দরসংলগ্ন নার্সারিগুলোতে একই ধরনের চারা সর্বোচ্চ ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। এসব গাছ লাগানোর নামে প্রায় ২০ কোটি টাকা এবং পরিচর্যার জন্য আরও ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।

শোভাবর্ধনের নামে পুকুর খননেও পুকুরচুরি হয়েছে। থার্ড টার্মিনালে নতুন পুকুর নির্মাণ বাবদ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এডিসি’কে ১০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। তবে গুগল আর্থের চিত্রে দেখা যায়, সেখানে আগে থেকেই একটি প্রাকৃতিক জলাশয় ছিল, যেটিকে শুধু পুকুরে রূপান্তর করা হয়েছে।

মাটি অপসারণের কাজেও ঘটেছে বড় অনিয়ম। চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্প এলাকার মাটি সাড়ে ৬ কিলোমিটার দূরে নিয়ে ফেলার কথা থাকলেও, বাস্তবে তা মাত্র দুই কিলোমিটারের মধ্যে ফেলা হয়। কিন্তু বিল করা হয়েছে সাড়ে ৬ কিলোমিটার দূরে মাটি পরিবহনের হিসাব ধরে। এ খাতে ব্যয় দেখানো হয় ৮৩ কোটি টাকা, যার ফলে সরকারের প্রায় ৫২ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

অস্বাভাবিক খরচের তালিকায় আরও রয়েছে থার্ড টার্মিনালের আংশিক উদ্বোধনের ফিতা কাটা বাবদ ব্যয়, যা চুক্তিতে না থাকলেও ৪৪ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। এছাড়া ডিজেল পাম্প সরবরাহে প্রায় ১২ কোটি টাকা, ইউপিএস বাবদ সাড়ে ৪৮ কোটি টাকা এবং জ্বালানি তেল কিনতে আরও ৪১ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের হিসাব রয়েছে। এমনকি নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার কথা বলে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ২১৭ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিভিল এভিয়েশন)।

সব মিলিয়ে থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ ও সৌন্দর্যবর্ধনে ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ ও অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে অন্তত ৬০০ খাতে ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার কেনাকাটা ও বিল পরিশোধ করা হয়েছে কোনো ধরনের যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই। অতিরিক্ত কাজের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ খরচ করার নিয়ম থাকলেও, বিধি লঙ্ঘন করে সেখানে ২৩ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।

অনিয়মের সঙ্গে বুয়েটের শিক্ষক অধ্যাপক শামসুল হকের ভূমিকার কথা বলা হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে প্রকল্পের আরেক বিশেষজ্ঞ হারুন-অর-রশিদ অনিয়মের কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন যে, তিনি বারবার এগুলোকে অবৈধ বা ইলিগ্যাল ভেরিয়েশন হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন।

এসব অনিয়মের তথ্য জানাজানি হওয়ার পর বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিভিল এভিয়েশন) ডিসপিউট বোর্ড ও অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি গঠন করে। তবে যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তাদেরই কয়েকজনকে এই কমিটিতে রাখায় ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া নিয়মবহির্ভূতভাবে খরচ করা বিপুল অঙ্কের অর্থ পরবর্তীতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন যে, চিহ্নিত অনিয়মগুলো পোস্ট-ফ্যাক্টো (ঘটনাত্তোর অনুমোদন) বা সেটেলমেন্ট কমিটির মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তা আরেকটি দুর্নীতির শামিল হবে। এর মাধ্যমে জড়িতদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই মেগা প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় সাড়ে ১৩ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও, বিভিন্ন ধাপে তা বেড়ে বর্তমানে ২২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বর্তমান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভুয়া ও অনিয়মিত ব্যয়ের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সূত্র: স্টার নিউজ