...|...|...

সারাদেশ

তিস্তার বুকে জেগে ওঠা নতুন দৃশ্যপট: সূর্যাস্তের আলোয় শুভ্রতার মায়া

রিপন ইসলাম শেখ, নীলফামারী
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ২:০২
Shares
তিস্তার বুকে জেগে ওঠা নতুন দৃশ্যপট: সূর্যাস্তের আলোয় শুভ্রতার মায়া

ছবি: সংগৃহীত

শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। দিগন্তজোড়া বালুচরের বুক চিরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে ধবধবে সাদা কাশফুল। বাতাসের মৃদু দোলায় ফুলগুলো যেন নদীর বুকে এঁকে চলেছে শুভ্রতার ঢেউ। কোথাও ঘন কাশবন, কোথাও বালুর বিস্তার, আবার মাঝখানে স্বচ্ছ পানির সরু জলধারা। সব মিলিয়ে তিস্তার চর যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস।

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার সীমান্তবর্তী তিস্তার বাঘের চর ও জুয়ার চরে এখন এমনই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। কাশফুলের এই অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিন বিকেলেই সেখানে ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ। কেউ পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসছেন, কেউ বন্ধুদের সাথে কাটাচ্ছেন অবসর, আবার কেউ মুঠোফোনের ক্যামেরায় বন্দি করছেন শরতের স্মৃতি।

জেলার ডিমলা উপজেলার টেপাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের বার্নির ঘাট বিজিবি ক্যাম্প-সংলগ্ন তিস্তার চরে গেলেই চোখে পড়ে কাশফুলের বিস্তৃত রাজ্য। প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ফুটে থাকা সাদা কাশফুল দূর থেকে মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির বিছিয়ে রাখা সাদা চাদর।

সবুজ পাতার ফাঁকে ফুটে থাকা কাশফুলে বিকেলের আলো পড়তেই বদলে যায় চারপাশের দৃশ্য। বাতাসের সাথে দুলতে থাকা ফুলের সারি আর নদীর বিস্তীর্ণ বালুচর মিলে তৈরি করে এক অন্য রকম পরিবেশ। ছোট্ট একটি জলাধার পেরিয়ে দর্শনার্থীরা পৌঁছে যান কাশবনে ঘেরা চরে।

কাশফুলের পাশের স্বচ্ছ জলধারায় ছোট ডিঙি নৌকায় ঘুরে বেড়ান কেউ কেউ। শিশুরা মেতে ওঠে ছোটাছুটিতে, আর তরুণ-তরুণীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন ছবি তোলায়। শহরের কোলাহল থেকে দূরে এই নির্জন চর অনেকের কাছেই হয়ে উঠেছে বিকেল কাটানোর প্রিয় জায়গা।

কাশফুল দেখতে আসা মানুষের চোখেমুখে থাকে মুগ্ধতার ছাপ। পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটানো, শিশুদের আনন্দ কিংবা প্রিয় মুহূর্তগুলো ছবিতে ধরে রাখার মধ্য দিয়েই যেন নতুন করে আবিষ্কৃত হচ্ছে তিস্তার চর।

উত্তরা বাজার এলাকার বাসিন্দা মজনু মিয়াসহ তার সহপাঠিরা এসেছিলেন কাশফুল দেখতে। তার কাছে চারদিকে ছড়িয়ে থাকা সাদা ফুল আর মাঝখানের স্বচ্ছ জলধারা মিলে তৈরি করেছে ব্যতিক্রমী এক দৃশ্য। বিকেলে মেয়েকে নিয়ে এলেও সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার পরও তার বাড়ি ফেরার আগ্রহ ছিল না।

পশ্চিম খড়িবাড়ী এলাকা আরমান ইসলাম থেকে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ঘুরতে এসেছিলেন। তার মতে, অবসর কাটানোর মতো জায়গার অভাব থাকায় তিস্তার এই চর স্থানীয় মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। প্রকৃতির কাছাকাছি কিছুটা সময় কাটাতেই পরিবার নিয়ে এখানে আসা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, এক-দুই বছর ধরে এ এলাকায় কাশফুলের বিস্তার লক্ষ করা যাচ্ছে। বিকেল ও ছুটির দিনে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বাড়ে। শরতের এই সৌন্দর্য দেখতে ডিমলা ছাড়াও আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসছেন।

কাশফুলের এই বিস্তার শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করছে না, সামনে আনছে তিস্তার পরিবর্তিত ভূপ্রকৃতির চিত্রও। স্থানীয়দের ভাষ্য, নদীতে আগের মতো পানিপ্রবাহ না থাকায় বিভিন্ন স্থানে বিস্তীর্ণ বালুচর জেগে উঠেছে। সেই বালুচরের কোনো কোনো অংশে জন্মেছে কাশবন।

ভাদ্র মাসের শেষদিকে কাশফুল ফুটতে শুরু করে এবং কার্তিক মাস পর্যন্ত এর সৌন্দর্য দেখা যায় বলে জানান স্থানীয়রা। ঋতু বদলের সাথে সাথে তিস্তার চরও যেন বদলে নেয় তার রূপ। বর্ষায় যে নদী প্রবল স্রোত আর বিস্তৃত জলরাশির পরিচয় দেয়, পানি কমে গেলে সেই নদীর বুকেই দেখা মেলে বালুচর ও কাশফুলের।

তবে কাশফুলের সৌন্দর্য দেখে নদীর সামগ্রিক বাস্তবতা ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। তিস্তা নদীর চরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকা, নদীভাঙন, বন্যা এবং পানিপ্রবাহের পরিবর্তনও এই ভূপ্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি নদী ও চরাঞ্চলের পরিবেশগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণও জরুরি।

তিস্তার এই কাশবনকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে ছোট পরিসরে পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে প্রকৃতিনির্ভর ভ্রমণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জন্য কিছু অর্থনৈতিক সুযোগও সৃষ্টি হতে পারে। তবে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন জায়গাটির পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণ।

স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণে পরিকল্পিতভাবে দর্শনার্থীদের জন্য কিছু মৌলিক সুবিধা গড়ে তোলা গেলে তিস্তার এই চর হতে পারে শরৎকালীন ভ্রমণের আকর্ষণীয় গন্তব্য। তবে সে উদ্যোগের ভিত্তি হতে হবে পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানুষের নিরাপত্তা।

বিকেল গড়িয়ে যখন সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে, তখন তিস্তার বালুচরে কাশফুলের সৌন্দর্য যেন আরও গভীর হয়ে ওঠে। নরম আলোয় সাদা ফুল, সোনালি বালু আর স্বচ্ছ জলধারা মিলে তৈরি করে মায়াবী এক দৃশ্য।

দিনভর ব্যস্ততার পর এই নির্জন চরে এসে মানুষ খুঁজে পান কিছুটা স্বস্তি। কেউ স্মৃতি জমা করেন ছবিতে, কেউ পরিবারের সাথে কাটান আনন্দঘন সময়, আবার কেউ নীরবে উপভোগ করেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য।

তিস্তার এই চর তাই কেবল কাশফুলের সমারোহ নয়; এটি শরতের সৌন্দর্য অনুভব করার এক খোলা প্রান্তর। নদীর বুকে জেগে ওঠা বালুচর আর তার ওপর দুলতে থাকা সাদা ফুল যেন মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মে বারবার নতুন রূপে ফিরে আসে।

আর সেই রূপের টানেই মানুষ ছুটে যান তিস্তার চরে, একমুঠো প্রশান্তি আর শরতের কিছু স্মৃতি সাথে নিয়ে ফিরতে।