ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওমরপুর ইউনিয়নের বাউল সড়ক। একসময় আর দশটি গ্রামের সড়কের মতোই ছিল এটি। এখন দুই পাশে সারি সারি তালগাছ, সাথে নানা জাতের ফলজ ও ঔষধি গাছ। সবুজে ঘেরা এই সড়কটির পেছনে রয়েছে একজন মানুষের দীর্ঘ তিন দশকের শ্রম। তিনি স্থানীয় কালাপানিয়া বাজার বাইতুল মামুর জামে মসজিদের ইমাম মো. রেজাউল কিবরিয়া বাবুল।
ইমামতির পাশাপাশি গাছ লাগানোকে জীবনের অন্যতম কাজ হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। নিজের অর্থ ও উদ্যোগে ১৯৯৩-৯৪ সালের দিকে শুরু করা এ কার্যক্রম এখনো চালিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন সড়কের পাশে চারা রোপণের পাশাপাশি সেগুলোর পরিচর্যাও করেন তিনি।
প্রায় ৩০ বছর আগে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ভুঁইয়ারহাট এলাকায় একটি নার্সারি গড়ে তোলেন রেজাউল কিবরিয়া। সেখানে উৎপাদিত ও বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করা চারা দিয়ে এলাকার সড়কের পাশে বৃক্ষরোপণ শুরু করেন। স্থানীয়দের উৎসাহিত করতে মাইকিংও করতেন।
সময়ের সাথে তার লাগানো গাছগুলো বড় হয়েছে। বিশেষ করে ওমরপুর গ্রামের বাউল সড়কের দুই পাশে প্রায় দুই দশক আগে লাগানো তালগাছগুলো এখন সড়কের দুই পাশে ছায়া ও সবুজের আবরণ তৈরি করেছে। দূর থেকে সড়কটি দেখলে মনে হয়, গাছের সারির মধ্য দিয়ে চলে গেছে একটি সবুজ পথ।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, গাছের ছায়ায় পথচারী ও কৃষকেরা স্বস্তি পান। বিকেল ও সন্ধ্যায় অনেকে এই সড়কে সময় কাটান। এমনকি আশপাশের এলাকার বাইরের মানুষও সড়কটির সৌন্দর্য দেখতে সেখানে আসেন।
বাউল সড়কেই তার বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম সীমাবদ্ধ নয়। ওমরপুর ইউনিয়নের আরও কয়েকটি সড়কের পাশে তিনি বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগিয়েছেন। চারা লাগানোর পর নিয়মিত সেগুলোর দেখভালও করেছেন। নানা কারণে অনেক গাছ নষ্ট হয়ে গেলেও এতে তার উদ্যোগ থেমে থাকেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান, লিটন, আলমগীর ও যুবক তুহিন জানান, বাউল সড়কের দুই পাশে এখন শত শত তালগাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় হয়ে ওঠার পর সড়কটির সৌন্দর্য অনেক বেড়েছে। বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানীয়রা সেখানে সময় কাটান। দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এই সড়কের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। রেজাউল কিবরিয়ার উদ্যোগ দেখে তারাও নিজেদের জায়গায় বেশি করে গাছ লাগাতে উৎসাহিত হয়েছেন।
রেজাউল কিবরিয়া বাবুল বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় আমি প্রায় তিন দশক ধরে গাছ লাগিয়ে আসছি। ১৯৯৩-৯৪ সালে এ কাজ শুরু করি। এ পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার গাছের চারা লাগিয়েছি। এর মধ্যে তালগাছের বীজ ও চারা রয়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার।
তিনি বলেন, সব গাছ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তবে গাছ লাগানোর কাজ থেকে কখনো সরে আসেননি। বর্তমানে নিজে নার্সারিতে চারা উৎপাদনের সময় না পাওয়ায় ঝালকাঠির স্বরূপকাঠি থেকে বিভিন্ন ধরনের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন।
তালগাছ লাগানোর বিষয়ে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাতের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় তালগাছ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। পাশাপাশি বন বিভাগের পরামর্শও নিয়ে থাকেন।
রেজাউল কিবরিয়া আরও বলেন, আমি গাছ লাগানোকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে দেখি। একটি গাছ শুধু বর্তমান প্রজন্মের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও ছায়া, সৌন্দর্য ও উপকারের উৎস। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিনই গাছ লাগানোর এই কাজ চালিয়ে যেতে চাই।
গ্রামের সড়ক ও আশপাশের এলাকা আরও সবুজ করে তোলাই তার লক্ষ্য। তরুণদের খারাপ অভ্যাস থেকে দূরে রাখতে তাদের ফল ও ফুলের বাগান করার আহ্বানও জানান তিনি।
রেজাউল কিবরিয়ার দীর্ঘদিনের বৃক্ষরোপণ উদ্যোগের বিষয়ে চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, গাছ লাগানো অবশ্যই একটি ভালো উদ্যোগ। রেজাউল কিবরিয়া সাহেবের দীর্ঘদিনের এ কাজের বিষয়টি আমার জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে এ বিষয়ে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।
একজন মসজিদের ইমামের তিন দশকের এই উদ্যোগে ওমরপুরের কয়েকটি সড়কের চেহারা বদলে গেছে। বিশেষ করে বাউল সড়কের সারি সারি তালগাছ এখন স্থানীয়দের কাছে শুধু ছায়ার উৎস নয়, এলাকার আলাদা পরিচয়েরও অংশ হয়ে উঠেছে।



