...|...|...

খুলনা

চিরকুট পাঠিয়ে ৩০ পরিবারে চাঁদা দাবি, না দিলে হত্যার হুমকি

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৫:১২ | আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৫:২৪
Shares
চিরকুট পাঠিয়ে ৩০ পরিবারে চাঁদা দাবি, না দিলে হত্যার হুমকি

চিরকুট পাঠিয়ে ৩০ পরিবারে চাঁদা দাবি। প্রতীকী ছবি

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ‘পূর্ব বাংলা’ পরিচয়ে চিরকুট পাঠিয়ে অন্তত ৩০টি পরিবারের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছে। চিরকুটে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি এমনকি হত্যার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ও রহস্য সৃষ্টি হয়েছে।

চাঁদা দাবির ঘটনায় কয়েকটি পরিবার মিরপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পাশাপাশি এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে। তবে এসব চিরকুট কারা দিচ্ছে এবং এর সাথে কোনো চরমপন্থি সংগঠনের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সরেজমিনে জানা যায়, গত দুই মাসে উপজেলার কুর্শা, ইশেলমারী, পুটিমারী ও ভেদামারী গ্রামের অন্তত ৩০টি পরিবারের কাছে চিরকুট পৌঁছেছে। চিরকুটে পরিবারের সদস্যদের নাম উল্লেখ করে ভিন্ন ভিন্ন অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়েছে। কোথাও টাকা দেওয়ার স্থান, আবার কোথাও নির্দিষ্ট বিকাশ নম্বর বা এজেন্টের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, চিরকুট পাওয়ার পর অনেক পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। কেউ কেউ বাড়িতে থাকা ছেড়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। পুটিমারা গ্রামের একটি পরিবার প্রায় দুই মাস ধরে বাড়িতে নেই। ওই পরিবারের বাড়ির দরজায় দেওয়া চিরকুটে দুই লাখ টাকা দাবি করা হয়েছিল। টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হয়।

চিরকুট পাঠিয়ে ৩০ পরিবারে চাঁদা দাবি। ছবি: টাইমস টুডে

চিরকুট পাওয়া এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চিঠি পাওয়ার পর থেকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছি না। পরিবার নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে আছি। কারা এসব চিঠি দিচ্ছে, দ্রুত তাদের শনাক্ত করা দরকার।

আরেকজন বলেন, টাকা দেওয়ার জন্য সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে বাড়িতে থাকতেও ভয় লাগছে।

ভুক্তভোগীদের পাওয়া কয়েকটি চিরকুটে ‘পূর্ব বাংলা পার্টি’র নাম ব্যবহার করা হয়েছে। একটি চিরকুটে বলা হয়েছে, কুষ্টিয়ার কোথায় কে থাকে, সে সম্পর্কে তাদের সব তথ্য জানা আছে। এরপর নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম, চাঁদার পরিমাণ, বিকাশ নম্বর ও টাকা দেওয়ার স্থান উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্য একটি চিরকুটে ‘পূর্ব বাংলা পার্টির পক্ষ থেকে’ ১২ জনের নাম উল্লেখ করে প্রত্যেকের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা করে দাবি করা হয়। দুই দিনের মধ্যে আনোয়ার নামে এক ব্যক্তির কাছে টাকা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠির শেষে ‘জীবন/জাহান’ নামে স্বাক্ষর রয়েছে।

আরেকটি চিরকুটে পুটিমারা বাজারের এক বিকাশ দোকানদারের নাম উল্লেখ করে তার কাছে টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেখানে লেখা হয়েছে, ‘পার্টি যোগাযোগ করে নেবে।’ চিঠির শেষে ‘পূর্ব বাংলা, চুয়াডাঙ্গা’ লেখা রয়েছে।

অন্য একটি চিঠিতে এক ব্যক্তির কাছে ৪০ হাজার টাকা দাবি করে বলা হয়েছে, এক বছর আগে মারধর ও মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে এক তরুণের কাছ থেকে জরিমানা হিসেবে নেওয়া টাকা ফেরত দিতে হবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে টাকা না দিলে পরিবারের সদস্যদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। চিঠির শেষে ‘পূর্ব বাংলার পক্ষ থেকে, আল মামুন রাজ, চুয়াডাঙ্গা অঞ্চল’ লেখা রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের কয়েকজন জানান, চিরকুটে পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা ও ব্যক্তিগত তথ্য উল্লেখ থাকায় তারা আরও বেশি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। এসব তথ্য কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, তা নিয়েও তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

চিরকুটের মাধ্যমে চাঁদা দাবি ও হুমকির ঘটনায় নিরাপত্তা চেয়ে গত ৪ জুলাই মিরপুর থানায় জিডি করেন মো. মিজানুর রহমান। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, জগলুর করিমের মাধ্যমে তিনি দুই পাতার একটি চিরকুটের বিষয়ে জানতে পারেন। সেখানে ‘পূর্ববাংলা পার্টি’র নাম ব্যবহার করে রহিমা খাতুনের কাছে দুই লাখ টাকা দাবি এবং টাকা না দিলে হুমকি দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

এ ছাড়া ইব্রাহিম নামের আরেক ব্যক্তির কাছে ৪০ হাজার টাকা দাবি এবং হুমকি দেওয়ার বিষয়টিও জিডিতে উল্লেখ করেন তিনি।

মিজানুর রহমান বলেন, গ্রামের অনেক লোককে হুমকি দেওয়া হয়েছে। আমি একটি জিডি করেছি। গ্রামের প্রধানদের নিয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তদন্ত করা হচ্ছে।

‘পূর্ব বাংলা’ নামে কোনো সংগঠন বর্তমানে সক্রিয় আছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাদের জানা নেই। একসময় ‘পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট’ নামে সংগঠনের কথা শোনা গেলেও বর্তমানে এর কার্যক্রম সম্পর্কে তারা অবগত নন।

স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র জানায়, আশির দশকে কুষ্টিয়ায় ‘পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি’ (লাল পতাকা) নামে একটি চরমপন্থি সংগঠনের তৎপরতা ছিল। বর্তমানে সংগঠনটি নিষিদ্ধ। তবে সাম্প্রতিক চিরকুটের সাথে ওই সংগঠনের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, পুরোনো কোনো চরমপন্থি সংগঠনের নাম ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ কোনো চক্র চাঁদাবাজির চেষ্টা করতে পারে। কারণ, চিরকুটগুলোতে ব্যক্তির নাম-ঠিকানা, চাঁদার পরিমাণ এবং টাকা দেওয়ার স্থান বা বিকাশ নম্বর পর্যন্ত উল্লেখ রয়েছে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘পূর্ব বাংলা’ নামে একটি উপদলের কথা তিনি শুনেছেন। তবে বর্তমানে এর অস্তিত্ব আছে কি না, তা নিশ্চিত নন। নব্বইয়ের দশকের দিকে এ ধরনের সংগঠনের কথা শোনা গেলেও এখন নানা নামে বিভিন্নভাবে চাঁদাবাজি হয়ে থাকে।

মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, চাঁদা দাবির ঘটনায় থানায় বেশ কয়েকটি সাধারণ ডায়েরি হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থলগুলো পরিদর্শন করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তা ও আতঙ্ক কমাতে এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় অভিযান চালানো হয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িতদের শনাক্ত এবং পুরো বিষয়টি উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।

এদিকে, একের পর এক চিরকুটে চাঁদা দাবি এবং পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা উল্লেখ করে হুমকির ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। ‘পূর্ব বাংলা’ পরিচয়ের আড়ালে কারা সক্রিয়, সেটিই এখন তদন্তের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।