...|...|...

বিশ্ব

গাজায় ফুরিয়ে আসছে কবরের জায়গা

টাইমস টুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৬, বিকেল ৩:০৬ | আপডেট: ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ১:৩৩
Shares
গাজায় ফুরিয়ে আসছে কবরের জায়গা

গাজায় ফুরিয়ে আসছে কবরের জায়গা। ছবি: আল জাজিরা

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে প্রতিদিনই প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ। কিন্তু মৃত্যুর পরও যেন মিলছে না শেষ আশ্রয়ের জায়গা। কবরস্থানগুলোতে জায়গা সংকুচিত হয়ে আসায় স্বজনদের মরদেহ দাফন করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছে পরিবারগুলো। খবর আল জাজিরা।

অনেক ক্ষেত্রে নতুন কবরের জায়গা না পেয়ে পুরোনো কবরেই স্বজনদের দাফন করতে হচ্ছে। ইসরায়েলের নির্মম আগ্রাসনে ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস হওয়া এবং বহু মানুষকে অস্থায়ী জায়গায় দাফন করায় এখন গাজায় কবরের সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০ বছর বয়সী ওমর আল-সাওহির এখন তার বাবা ৪০ বছর বয়সী মোহাম্মদকে কবর দেওয়ার জায়গা খুঁজতে হচ্ছে। গাজার ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত সামরিক এলাকা ‘ইয়েলো লাইন’-এর কাছে গুলিতে নিহত হন মোহাম্মদ। গাজা সিটির জেইতুন এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ একটি সড়কের পাশে ছোট দোকানে চা-কফি বিক্রি করতেন। গত ১০ জুন কাজ করার সময় তার ঘাড়ে গুলি লাগে। এতে প্রায় ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।

বাবাকে দাফন করতে জেইতুন কবরস্থানে যান ওমর। সেখানে গিয়ে দেখেন, কবরগুলো একটির সাথে আরেকটি ঠাসাঠাসি করে তৈরি করা হয়েছে। এসব কবরের অনেকগুলোতেই ইসরায়েলের চলমান হামলায় নিহত ফিলিস্তিনিদের দাফন করা হয়েছে। জায়গার সংকট ও যুদ্ধের কঠিন পরিস্থিতির কারণে অনেক কবরের ওপর শুধু একটি পাথর ও মৃত ব্যক্তির নাম লেখা একটি কাগজ রাখা হয়েছে। যুদ্ধের আগের মতো কবর তৈরি বা যথাযথভাবে প্রস্তুত করার সুযোগ নেই।

ওমর আল জাজিরাকে বলেন, আমি কবরস্থানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বহু কবর দেখেছি। সেখানে বালুর স্তূপের মতো উঁচু জায়গা রয়েছে, আর তার নিচে মানুষকে কবর দেওয়া হয়েছে। একটি কবরের ওপর শুধু একটি পাথর ও শহীদের নাম লেখা কাগজ ছিল। যুদ্ধের আগের মতো কবরটি তৈরি বা ঠিকভাবে প্রস্তুত করা হয়নি।

বর্তমানে সেখানে একটি কবরের জন্য প্রায় ৫০০ শেকেল (১৬৭ ডলার) খরচ হয়। কিন্তু ওমরের পরিবারের পক্ষে এই অর্থ দেয়া সম্ভব ছিল না। তাই তাদের অন্য ব্যবস্থা করতে হয়। ওমর বলেন, ‘নতুন কবরের জন্য কোনও জায়গাই নেই। তাই আমাদের দাদার কবরে তাকে দাফন করতে হয়েছে।’

আল জাজিরা বলছে, গাজায় সেবা ও অবকাঠামো ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়া এবং ইসরায়েলি হামলার ঝুঁকির কারণে যুদ্ধের সময় হাজার হাজার নিহত ফিলিস্তিনিকে ‘নিখোঁজ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তাদের অনেককে বাগান, তাঁবু, বাস্তুচ্যুতদের শিবির, স্কুল কিংবা হাসপাতালের চত্বরে দাফন করা হয়েছে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর গাজায় ইসরায়েলি হামলা কিছুটা কমে আসে। এরপর ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপ কিংবা অস্থায়ী কবরস্থান থেকে স্বজনদের মরদেহ উদ্ধার করতে শুরু করে পরিবারগুলো।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে অন্তত ১ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের প্রত্যেকের জন্যই এখন কবরের জায়গা প্রয়োজন। গাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাসপাতালের চত্বরে থাকা সাতটি গণকবর থেকে ৫২৯ ফিলিস্তিনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

ইসরায়েলি হামলা কিছুটা কমে আসার সুযোগে ওমরের পরিবারও মোহাম্মদের মরদেহ কবর থেকে তুলে নিয়ে চূড়ান্তভাবে দাফনের জন্য একটি কবরস্থানে নিয়ে যায়। তবে কবরের সংকট শুধু ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর নিহত ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনির কারণে তৈরি হয়নি। ইসরায়েলি হামলায় কবরস্থান ধ্বংস হওয়াও এর অন্যতম কারণ।

গাজার ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর কবরস্থানে প্রবেশের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ফলে পরিবারগুলোর জন্য দাফনের জায়গা আরও কমে গেছে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের গণমাধ্যম কর্মকর্তা ইকরামি আল-মাদালাল বলেন, যুদ্ধ শুরুর আগেই গাজার ৬০টি কবরস্থানের অনেকগুলো প্রায় পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘দাফনের জায়গার সংকটের কারণে আমাদের নতুন কবরস্থান তৈরি করতে হবে।’

মন্ত্রণালয় নতুন কবরস্থানের জন্য জায়গা খুঁজছে। পাশাপাশি অস্থায়ীভাবে দাফন করা মরদেহগুলো কবরস্থানে স্থানান্তর করাও কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আল-মাদালাল বলেন, ‘মরদেহ স্থানান্তর ইচ্ছেমতো করা যাবে না। এ জন্য ধর্ম মন্ত্রণালয়, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।’

৫০ বছর বয়সী তাফেশ আবু হাতাব ১৯ বছরের বেশি সময় ধরে কবর খোঁড়ার কাজ করছেন। তিনি বলেন, গাজার যুদ্ধ তার কর্মজীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়। তিনি যে খান ইউনিস কবরস্থানে কাজ করেন, যুদ্ধ শুরুর সময় সেখানে প্রায় ৬০টি কবর ছিল। এখন সেখানে কবরের সংখ্যা ৬ হাজার। যুদ্ধের একপর্যায়ে তাফেশকে প্রতিদিন প্রায় ৩৫টি কবর খুঁড়তে হয়েছে।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘এত ভয়াবহ রক্তপাতের সময় আমরা কখনও দেখিনি। এমন কোনও দিন যায় না, যেদিন কয়েক ডজন শহিদকে দাফন করা হয় না।’