...|...|...

বিশ্ব

ইসরায়েলের নির্বাচনে বদলাবে কী গাজার ভাগ্য?

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৫৬ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, সন্ধ্যা ৬:৫৮
Shares
ইসরায়েলের নির্বাচনে বদলাবে কী গাজার ভাগ্য?

ছবি: সংগৃহীত

তিন বছরের যুদ্ধ, বারবার বাস্তুচ্যুতি, ধ্বংসস্তূপ আর অবরুদ্ধ জীবনের মধ্যে ইসরায়েলের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছেন গাজার ফিলিস্তিনিরা। তাদের মনে ভয়, অনিশ্চয়তা আর সামান্য আশার মিশ্র অনুভূতি। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্ষমতা হারালে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে—এমন প্রত্যাশা থাকলেও ইসরায়েলের নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে তাদের।

২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ থামেনি। প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েলি হামলার শিকার হচ্ছেন তারা। কঠোর অবরোধের কারণে দেখা দিয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট। এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকার গাজার মানুষের জীবন কতটা বদলাতে পারবে, তা নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ।

উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবির থেকে বাস্তুচ্যুত ৩৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ এলিয়ান এখন পাঁচ সন্তানকে নিয়ে দেইর আল-বালাহ এলাকায় থাকেন। তিনি আশা করছেন, নেতানিয়াহুর পরিবর্তে অন্য কেউ ক্ষমতায় এলে ফিলিস্তিনিরা কিছুটা স্বস্তি পেতে পারেন।

আল জাজিরাকে এলিয়ান বলেন, ‘আমরা ইসরায়েলের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছি—দেখতে চাই পরবর্তী পর্যায়ে কে জয়ী হয়। আমরা আশা করছি, ফিলিস্তিনিদের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে এবং আমাদের মতো যারা আবারও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, তারা হয়তো কিছুটা স্বস্তি পাবেন।’

তবে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ ও তার কট্টর ডানপন্থী মিত্ররা আবার ক্ষমতায় ফিরলে গাজায় যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। ইসরায়েলের সাবেক সামরিক কমান্ডার ও নেতানিয়াহুর প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটের জয়ের প্রত্যাশা করলেও এলিয়ানের মনে সংশয় রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘তারা এখনও আমাদের শত্রু, আর পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হবে বলে মনে হয় না। তবে আমরা আশা করি, নেতানিয়াহুর চেয়ে অন্য কেউ হয়তো কিছুটা কম কঠোর হতে পারেন।’

এলিয়ানের মতোই অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত ৪১ বছর বয়সী ইসলাম সালেমের। তিন মেয়েকে নিয়ে তার জীবন এখন অনিশ্চিত। তার মতে, ইসরায়েলের রাজনীতির সঙ্গে গাজার মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ গভীরভাবে জড়িত। কিন্তু নতুন মুখ ক্ষমতায় এলেও ইসরায়েলের নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে না বলে মনে করেন তিনি।

সালেম বলেন, ‘রাজনীতিই আমাদের জীবনধারণের মূল ভিত্তি। আমাদের জীবনের প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে এটি যুক্ত—আমাদের জীবনযাত্রার পরিস্থিতি, এমনকি আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎও।’

গাজার প্রায় ৬৫ শতাংশ ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত নিয়ন্ত্রণ এবং পুনর্গঠনের অনিশ্চয়তা নিয়েও উদ্বিগ্ন তিনি। তার ভাষ্য, গাজার ৮০ শতাংশেরও বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে পুনর্গঠন কঠিন হবে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

সালেমের কথায়, ‘আমাদের আর এমন কোনো ভবিষ্যৎ নেই, যা নিয়ে আমরা ভয় পাব। আমরা কেবল দিনাতিপাত করছি। এরপর কী ঘটবে, তা আমাদের জানা নেই; আর আমরা যা কিছু ভয় পেতাম, তার সবই তো ইতিমধ্যে ঘটে গেছে।’

৫৭ বছর বয়সী হানান আবু আল-মাযা যুদ্ধের সময় ১২ বারেরও বেশি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। নেতানিয়াহু পরাজিত হলে নিজের বাড়ি বেইত লাহিয়ায় ফেরার সম্ভাবনা বাড়বে বলে আশা করেন তিনি। তবে নতুন সরকার গাজাবাসীর দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিতে পারে—এমন আশঙ্কাও রয়েছে তার।

তিনি বলেন, ‘আমরা রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও নিরাপদ বোধ করি না—সব সময় ভাবি, এরপর তারা আমাদের ওপর কী করবে! সেই আতঙ্ক এখনো আমাদের মন ও মস্তিষ্কে গেঁথে আছে।’

যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞে ক্লান্ত আবু আল-মাযা চান, ইসরায়েলের পরবর্তী নেতা গাজায় মানুষের বেঁচে থাকার সুযোগ তৈরি করুন। তার ভাষায়, ‘আমরা যুদ্ধ ও ধ্বংসলীলায় ক্লান্ত। ধ্বংস করার মতো আর কিছুই বাকি নেই, তবুও দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে।’

২৩ বছর বয়সী মানার ওওয়াইদাও ইসরায়েলের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন। উত্তর গাজার বাসিন্দা এই তরুণী বর্তমানে গাজা শহরের তাল আল-হাওয়া এলাকায় বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন। তার আশা, গাদি আইজেনকোট ক্ষমতায় এলে অবরোধ ও হত্যাকাণ্ড কিছুটা কমতে পারে। তবে কয়েক দশক ধরে চলা ইসরায়েলি নীতিতে বড় পরিবর্তনের বিষয়ে আশাবাদী নন তিনি।

ওওয়াইদা বলেন, ‘ইসরায়েলের নীতি হলো অপরাধ, হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের নীতি। ১৯৪৮ সাল থেকে তাদের নীতি একই—সেই একই হত্যাকাণ্ড, সেই একই অবরোধ।’

তার প্রত্যাশা, নতুন সরকার গাজার ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করবে এবং ‘ইয়েলো লাইন’ বা হলুদ রেখা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে। এতে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে নির্বাচনের সময় অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ সামলাতে নেতানিয়াহু আরও বড় কোনো আঞ্চলিক সংঘাত শুরু করতে পারেন বলেও আশঙ্কা করছেন তিনি।

উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে চার সন্তানকে নিয়ে গাজা শহরে আশ্রয় নেওয়া ৩৩ বছর বয়সী মুসা আলির কাছেও নির্বাচনের গুরুত্ব অনেক। তিনি মনে করেন, নির্বাচনের ফলাফলের ওপর বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ নির্ভর করতে পারে। বিরোধী পক্ষ ক্ষমতায় এলে এবং আরব দলগুলো সরকার গঠনে ভূমিকা রাখতে পারলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে আশা করেন তিনি।

তবে আলিও বড় ধরনের পরিবর্তনের নিশ্চয়তা দেখছেন না। তার আশঙ্কা, নেতানিয়াহু আবারও ক্ষমতায় এলে বাস্তুচ্যুতির সময় দীর্ঘ হবে এবং গাজার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে।

তিনি বলেন, ‘গাজায় প্রতিদিন রক্তপাত ঘটছে, মানুষ নিহত হচ্ছে এবং সর্বত্র বোমা বর্ষণ চলছে। আমরা আশা করি, এই নীতির অবসান ঘটবে এবং নতুন কোনো প্রধানমন্ত্রী এই চলমান রক্তপাত বন্ধ করবেন।’

গাজার মানুষের প্রত্যাশা তাই কেবল ইসরায়েলের ক্ষমতার পালাবদল নয়; তারা চান যুদ্ধের অবসান, অবরোধ শিথিল, নিরাপদে বসবাস এবং নিজেদের ঘরে ফেরার সুযোগ। নেতানিয়াহুর পরাজয়ে সেই সুযোগ তৈরি হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও সামান্য স্বস্তির আশাটুকু এখনো ছাড়তে পারছেন না তারা।