আজ ইসরায়েলে চলছে সাধারণ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। তবে ভোটের ফল প্রকাশের পরও দেশটিতে নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। জনমত জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কিংবা বিরোধী দলীয় নেতা গাদি আইজেনকোট—কেউই নিজ নিজ জোট নিয়ে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন পাবেন না বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে পরবর্তী সরকার গঠনে চারটি সম্ভাব্য সমীকরণের কথা জানিয়েছেন ইসরায়েলি রাজনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক ওয়াদি আবু নাসার।
সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নির্বাচনের পর জোট সরকার, সংখ্যালঘু সরকার, জাতীয় ঐক্য সরকার কিংবা নতুন নির্বাচন—এই চারটি পরিস্থিতির যেকোনো একটি সামনে আসতে পারে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের আসনসংখ্যা ১২০। দেশটিতে ভোটাররা দলীয় তালিকার ভিত্তিতে আইনপ্রণেতা নির্বাচন করেন। প্রধানমন্ত্রী সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন না; বরং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনপ্রণেতার সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করতে হয়। এ কারণে নির্বাচনের পর সরকার গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জোটের সমীকরণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
জোট সরকার গঠন
প্রথম সম্ভাবনা হলো, নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকোট নির্বাচনে আসন পাওয়া অন্যান্য দলের সমর্থন নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার গঠন করবেন।
তবে আবু নাসারের মতে, জনমত জরিপে কোনো পক্ষেরই ৬১টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা স্পষ্ট নয়। ফলে এ সমীকরণ বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে। তবে আইজেনকোট তাঁর নেতৃত্বে সরকার গঠনের জন্য অতি-অর্থোডক্স ইহুদি বা হারেদি দলগুলোর সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে খবর রয়েছে। এ ধরনের সমর্থন নিশ্চিত করা গেলে সরকার গঠনের হিসাব বদলে যেতে পারে।
আরব দলগুলোর সমর্থনে সংখ্যালঘু সরকার
দ্বিতীয় সম্ভাবনা হলো, আইজেনকোট আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সংখ্যালঘু সরকার গঠন করবেন। এ ক্ষেত্রে আরব দলগুলো সরকারে সরাসরি যোগ না দিলেও সংসদে সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
ইসরায়েলের আরব দলগুলো জানিয়েছে, আরব নাগরিকদের অধিকার নিশ্চিত করার শর্তে তারা আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন সরকারকে সংসদে সমর্থন দিতে পারে। তাদের দাবির মধ্যে রয়েছে বাড়িঘর ধ্বংস বন্ধ করা, আরব জনবসতিতে অপরাধ দমন এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে রাজনৈতিক আলোচনার পথ উন্মুক্ত করা।
ইউসেফ জাবারিনের নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট এবং মানসুর আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড আরব লিস্ট এ ধরনের সমর্থনের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে আরব দলগুলোকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আইজেনকোট এখনো চূড়ান্ত অবস্থান জানাননি। এর আগে তিনি তাঁর সরকারে কোনো আরব দলকে অন্তর্ভুক্ত না করার কথা বলেছিলেন।
জনমত জরিপ অনুযায়ী, আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৪ থেকে ১৫টি আসন পেতে পারে। ফলে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তাদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
জাতীয় ঐক্য সরকার
তৃতীয় সম্ভাবনা হলো, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি এবং আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টিসহ অন্যান্য দলকে নিয়ে একটি জাতীয় ঐক্য সরকার গঠন।
আবু নাসার জানান, নির্বাচনের পর কোনো পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটাতে এ ধরনের সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ নতুন নির্বাচন এড়াতে এই বিকল্পের পক্ষে জোর দিচ্ছেন বলে জানা গেছে। এ ছাড়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাও এ ধারণাকে সমর্থন করছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এ উদ্যোগের পথে বড় বাধা নেতানিয়াহুকে ঘিরে বিরোধী দলগুলোর আপত্তি। নেতানিয়াহু ঐক্য সরকার গঠনে আগ্রহী। এমন সরকারে তিনি ও আইজেনকোট পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারেন বলে আলোচনা রয়েছে। তবে শর্ত হলো, প্রথমে নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রী হবেন।
আবু নাসারের মতে, বিরোধী দলগুলোর আপত্তি মূলত লিকুদ পার্টির চেয়ে নেতানিয়াহুকে ঘিরেই বেশি। ইসরায়েলের কিছু মহলে আলোচনা রয়েছে, নেতানিয়াহু রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ালে ঐক্য সরকার গঠনের পথ সহজ হতে পারে। তবে নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, নির্বাচনে পরাজিত হলেও তিনি রাজনীতি ছাড়বেন না।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ঘুষ, প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে তিনটি পৃথক দুর্নীতির মামলা রয়েছে। এগুলো ‘কেস ১০০০’, ‘কেস ২০০০’ ও ‘কেস ৪০০০’ নামে পরিচিত।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনা
চতুর্থ সম্ভাবনা হলো, নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকোট—কেউই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন সংগ্রহ করতে পারবেন না। সে ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে এবং কয়েক মাস পর আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
আবু নাসারের মতে, সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে নেতানিয়াহু নতুন নির্বাচনের পথ বেছে নিতে পারেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগপর্যন্ত বর্তমান মন্ত্রিসভা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে কাজ করবে।
ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, সাধারণত প্রতি চার বছর পর নেসেট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে সরকার গঠনে ব্যর্থতা ও রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে আগাম নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও গুরুত্বপূর্ণ
এবারের নির্বাচন ৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। দুর্নীতির মামলায় বিচারের মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি গাজা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপও রয়েছে তাঁর ওপর।
২০২৪ সালের নভেম্বরে আইসিসির জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধে গাজায় ৭৪ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনের ফলের পাশাপাশি জোট গঠনের আলোচনা, আরব দলগুলোর অবস্থান এবং নেতানিয়াহুকে ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণই নির্ধারণ করতে পারে ইসরায়েলের পরবর্তী সরকারের ভবিষ্যৎ।


