...|...|...

বিশ্ব

‘অপারেশন ল্যাংড়া’: গরু পাচারের অভিযোগে উত্তর প্রদেশে মুসলিমদের পঙ্গু করছে পুলিশ

টাইমস টুুডে ডেস্ক
প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৪:৪৫ | আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৪:৪৯
Shares
‘অপারেশন ল্যাংড়া’: গরু পাচারের অভিযোগে উত্তর প্রদেশে মুসলিমদের পঙ্গু করছে পুলিশ

ছবি: সংগৃহীত

ভারতের উত্তর প্রদেশে অপরাধ দমনের নামে পুলিশের গুলিতে শত শত সন্দেহভাজন আহত হয়েছেন। তাদের বড় একটি অংশ মুসলিম। গরু পাচারের অভিযোগে আটক বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পায়ে গুলি করার এই চর্চা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকারকর্মী, বিরোধী রাজনীতিক ও বিচারকেরা। তাদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে এবং সংখ্যালঘু মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে।

বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে উত্তর প্রদেশে গরু পাচারের অভিযোগে প্রায় ৬৫০ জন সন্দেহভাজন পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছেন। এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান দ্য সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট। এপি প্রায় ২০০টি ঘটনার নমুনা আলাদাভাবে যাচাই করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ঘটনায় আহত ব্যক্তিদের শরীরের একই ধরনের জায়গায় গুলি লাগার প্রবণতা দেখা গেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গুলি লেগেছে হাঁটুর নিচে। স্থানীয়ভাবে পুলিশের এই কৌশল ‘অপারেশন ল্যাংড়া’ নামে পরিচিত। গরু পাচারের অভিযোগের বাইরেও চুরি ও ধর্ষণের মতো অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একই কৌশল প্রয়োগের অভিযোগ রয়েছে।

উত্তর প্রদেশ পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তা অমিতাভ যশের দাবি, পুলিশকে কেবল আত্মরক্ষার প্রয়োজনে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সন্দেহভাজনদের পায়ে গুলি করার কোনো নির্দেশ নেই বলেও জানান তিনি। এ ধরনের ঘটনায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

তার ভাষ্য, পুলিশের প্রতিটি অভিযান ও বলপ্রয়োগ জবাবদিহির আওতায় থাকা উচিত। তবে গত এক বছরে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের জন্য কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে শাস্তি দেওয়ার প্রয়োজন হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না।

অন্যদিকে মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, সন্দেহভাজনদের হত্যা না করে আহত করার মাধ্যমে পুলিশের গুলির কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। তাদের ভাষ্য, এসব ঘটনায় প্রকৃত আত্মরক্ষার প্রয়োজন ছিল কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

উত্তর প্রদেশের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ কালিম খানও একই জায়গায় গুলি লাগার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, দূরে পালিয়ে যাওয়া বা সংঘর্ষে লিপ্ত ব্যক্তির পায়ের পেছনের মাংসপেশিতে হাড় এড়িয়ে এভাবে গুলি লাগার সম্ভাবনা কম। তিনি এসব ঘটনাকে আত্মরক্ষার পরিবর্তে পরিকল্পিতভাবে গুলি করার উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

গরু পাচারসংক্রান্ত এসব ঘটনায় ধর্মীয় পরিচয়ের বিষয়টিও সামনে এসেছে। দ্য সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেটের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে এমন ৬২৭টি ঘটনার মধ্যে আহত সন্দেহভাজনদের প্রায় ৯৩ শতাংশ মুসলিম।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের মার্চে যোগী আদিত্যনাথ উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত পুলিশের তথ্যে অন্তত ৩১৬ জন সন্দেহভাজন ‘এনকাউন্টারে’ নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১০ জন মুসলিম। একই সময়ে পুলিশের অভিযানে ১২ হাজার ৮৯০ জন সন্দেহভাজন আহত হয়েছেন। তবে আহত ব্যক্তিদের ধর্মীয় পরিচয়ের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধী নেতাদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপির কঠোর অপরাধ দমন নীতি উত্তর প্রদেশে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর বৈষম্যমূলক প্রভাব ফেলছে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের সরকার অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলে আসছে। রাজ্য পুলিশও দাবি করে, এ নীতি অপরাধীদের মধ্যে ভীতি তৈরি করেছে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ বাড়িয়েছে।

তবে পুলিশ বলছে, গবাদিপশুর ব্যবসায় মুসলিমদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণের কারণে এসব ঘটনায় তাদের সংখ্যা বেশি হতে পারে। নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে তারা।

পুলিশের গুলির ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এলাহাবাদ হাইকোর্টও। চলতি বছরের জানুয়ারিতে আদালত সতর্ক করে বলেন, পুলিশ বিচারব্যবস্থার বিকল্প হতে পারে না। এ ধরনের ঘটনায় আইন অনুযায়ী তদন্ত ও প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন দাখিলের বাধ্যবাধকতা যথাযথভাবে অনুসরণ না করায় পুলিশের সমালোচনা করেন আদালত।

একটি জামিন আবেদনের শুনানিতে আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, অভিযুক্তদের পায়ে গুলি করার প্রবণতা যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আইনের শাসনের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন বিচারক। জুনে আরেকটি মামলায় হাইকোর্ট উত্তর প্রদেশে ‘প্রাতিষ্ঠানিক বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ নিয়ে সাংবিধানিক উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তবে এসব সমালোচনার পরও পুলিশের গুলির ঘটনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া ধীরগতিতে চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৮ সালে মানবাধিকার সংগঠন পিপলস ইউনিয়ন ফর সিভিল লিবার্টিজ উত্তর প্রদেশে পুলিশের এনকাউন্টার হত্যার অভিযোগ তদন্তে স্বাধীন সংস্থার হস্তক্ষেপ চেয়ে আদালতে আবেদন করেছিল। সেই মামলাও এখনো বিচারাধীন।

এপি পুলিশের গুলিতে পায়ে আহত ছয় মুসলিম ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে। নিরাপত্তার আশঙ্কায় তারা নাম প্রকাশ করতে চাননি। তাদের কেউ কারাগারে ছিলেন, আবার কেউ আত্মগোপনে দিন কাটাচ্ছিলেন।

এক নারী জানান, তার ছেলে মহিষের ব্যবসা করে পরিবারের ভরণপোষণ করতেন। পুলিশের গুলিতে পায়ে গুরুতর আঘাত পাওয়ার পর তিনি আর স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারছেন না। এখন অন্যের সহায়তায় তাদের সংসার চলছে।

আরেক নারী জানান, তার ছেলের দুই হাঁটুতে গুলি করা হয়েছে। চিকিৎসার পরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে না পারায় পরিবারটি ঋণ করে দিন কাটাচ্ছে। হাসপাতালে ছেলের রক্তাক্ত ক্ষত দেখে পুরো পরিবার ভেঙে পড়েছিল বলে জানান তিনি।

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এসব ঘটনার প্রভাব শুধু আহত ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; দীর্ঘমেয়াদে পুরো পরিবার আর্থিক সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।

অধিকারকর্মীদের দাবি, পুলিশের এ ধরনের অভিযান উত্তর প্রদেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে। বিজেপিশাসিত হরিয়ানা, বিহার ও উত্তরাখণ্ডসহ বিভিন্ন অঞ্চলে একই ধরনের কৌশল ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

সমালোচকদের মতে, অপরাধের অভিযোগ থাকলেও কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার আদালতের; পুলিশের দায়িত্ব আইন অনুযায়ী তদন্ত ও গ্রেফতার করা। তাদের আশঙ্কা, যথাযথ তদন্ত ও জবাবদিহি ছাড়া এ ধরনের গুলির ঘটনা চলতে থাকলে আইনের শাসন এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা আরও সংকটের মুখে পড়বে।